Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

ব্যাংকিং খাতে  সংকট,  উত্তরণে যা করণীয়

ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
প্রকাশ : সোমবার, ৬ জুলাই,২০২৬, ০৯:০০ এ এম
আপডেট : সোমবার, ৬ জুলাই,২০২৬, ১১:৪৬ এ এম
ব্যাংকিং খাতে  সংকট,  উত্তরণে যা করণীয়

​একটি দেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড হলো তার ব্যাংকিং খাত। হৃৎপিণ্ড অচল হলে যেমন শরীর স্তব্ধ হয়ে যায়, তেমনি ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয় পুরো অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়। আজ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের দিকে তাকালে এক চরম উদ্বেগ ও নৈরাজ্যের চিত্র ফুটে ওঠে। বিগত কয়েক দশকের পুঞ্জীভূত অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, ঋণ জালিয়াতি এবং সুশাসনের অভাব আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে এমন এক খাদের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে ।এই খাদের গভীরতা কেবল ব্যাংকগুলোর দেউলিয়া হওয়ার আশঙ্কাই বাড়ায়নি, বরং পুরো সামষ্টিক অর্থনীতিকে এক মহাবিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এখনই যথাযথ ও কার্যত ব্যবস্থা না নিতে পারলে, জাতির জন্য এক ভয়াবহ সংকট অপেক্ষা করছে !

পরিসংখ্যান কী বলছে

​বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ (২০২৬ সালের মাঝামাঝি) ডাটার দিকে তাকালে সংকটের গভীরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ব্যাংকিং খাতের বর্তমান প্রধান ক্ষতগুলো হলো-

​বিশাল ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ :

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ লক্ষ কোটি টাকা, যা দেশের মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৬০%। এই বিশাল পরিমাণ ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের আকার আমাদের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের চেয়েও বেশি।

​খেলাপি ঋণের পাহাড় :

মোট ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের মধ্যে সরাসরি খেলাপি ঋণ (NPL) ২০২৬ সালের মার্চ নাগাদ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৫.৮৮ লাখ কোটি টাকা। এটি মোট ঋণের ৩২.২৬%, যা দক্ষিণ এশিয়ার গড় খেলাপি ঋণের (৭.৯%) চেয়ে প্রায় ৪ গুণ বেশি। শুধু ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা।

​পুনঃতফসিল ও অবলোপন :

খেলাপি ঋণের বাইরে আইনি ফাঁকফোকর ও কৃত্রিমভাবে ভালো দেখানোর জন্য ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪.৪৬ লাখ কোটি টাকা ঋণ পুনঃতফসিল (Rescheduled) করা হয়েছে এবং আরও প্রায় ৮৩ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা ঋণ অবলোপন (Write-off) বা খাতা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে আরও ১.৮২ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণকে খাতায় 'ভালো ঋণ' হিসেবে দেখাতে হচ্ছে।

​মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি :

বিশাল খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১.৯১ লাখ কোটি টাকা। এর ফলে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের ক্যাপিটাল অ্যাডেকুয়েসি বা মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত নেতিবাচক সীমায় (-২.৬%) নেমে গেছে।

সংকটের মৌলিক কারণ গুলো কী কী 

​প্রথমত, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দখলদারিত্ব 

গত দেড় দশকে দেশের বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক সুনির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর (যেমন বিতর্কিত এস আলম গ্রুপ এবং অন্যান্য) একক নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। বেনামে, ভুয়া নথিপত্র এবং রাজনৈতিক প্রভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, ​সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ 

সরকারের রাজস্ব আদায়ে বিশাল ঘাটতি (২০২৫-২৬ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা কম আদায়) থাকার কারণে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক খাত থেকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩৩ হাজার কোটি টাকা বেশি ঋণ নিয়ে মোট ১.৩৭ লাখ কোটি টাকার নিট ঋণ নিয়েছে। এর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হয়েছে, যার প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৬.১০ শতাংশে।

তৃতীয়ত, ​নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা 

 অতীতে বাংলাদেশ ব্যাংক স্বায়ত্তশাসিত ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। নীতিমালার বারবার পরিবর্তন, যেমন ঋণখেলাপিদের বারবার ঢালাও সুবিধা দেওয়া এবং রাজনৈতিক চাপের মুখে নতি স্বীকার করা ব্যাংকিং খাতকে নিয়মহীনতার অভয়ারণ্যে পরিণত করে।

অতীতে বিভিন্ন সময়ে ব্যাংকডাকাতি 

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত দেড় দশকে এস আলম গ্রুপ ছাড়াও বেশ কয়েকটি বড় বড় গ্রুপ, ভুয়া প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারি ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।

​বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত, শ্বেতপত্র এবং আদালতের বিভিন্ন মামলার ভিত্তিতে দেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে আলোচিত ও বড় বড় লুটপাটের ঘটনাগুলো নিচে তুলে ধরা হলো :

​১. বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি (প্রায় ৪,৫০০ কোটি টাকা) :

​বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসের অন্যতম বড় ও ধ্বংসাত্মক কেলেঙ্কারি এটি। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে জাতীয় পার্টির সাবেক নেতা শেখ আবদুল হাই বাচ্চু বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকাকালীন এই লুটপাট হয়।

 কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়া, ভুয়া নাম-ঠিকানা ও জামানতবিহীন হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। একসময়ের দেশের সবচেয়ে লাভজনক ও শক্তিশালী ব্যাংকটি এই লুটপাটের কারণে পুরোপুরি ধসে পড়ে।

​২. সোনালী ব্যাংকের হল-মার্ক কেলেঙ্কারি (সাড়ে ৩,৫০০ কোটি টাকা) :

​২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা হোটেল (সাবেক শেরাটন) শাখা থেকে এই অর্থ লুট করা হয়, যা তৎকালীন সময়ে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল।

 হল-মার্ক গ্রুপ এবং আরও কয়েকটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের ভেতরের কর্মকর্তাদের সহায়তায় ভুয়া 'অ্যাকসেপ্টেন্স বিল' বা নথিপত্র তৈরি করে কোনো ফান্ড ছাড়াই ৩,৫০০ কোটি টাকারও বেশি ঋণ তুলে নিয়ে আত্মসাৎ করে।

​৩. বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণ ও খেলাপি (বিপুল অঙ্কের অর্থ) :

​বিগত সরকারের অন্যতম প্রভাবশালী উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো গ্রুপ ব্যাংকিং খাতের একটি বড় অংশকে ঝুঁকিতে ফেলেছে।

 রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জনতা ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়া হয়। পরবর্তীতে বিশেষ সুবিধা (রি-শিডিউলিং) ব্যবহার করে বছরের পর বছর এগুলোকে খেলাপি হওয়া থেকে ঠেকিয়ে রাখা হয়েছিল। তদন্তে এই গ্রুপের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগও এসেছে।

​৪. জনতা ব্যাংকের অ্যাননটেক্স ও ক্রিসেন্ট গ্রুপ কেলেঙ্কারি (প্রায় ১৫,০০০ কোটি টাকা) :

​রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংককে এককভাবে দুটি বড় গ্রুপ প্রায় পঙ্গু করে দিয়েছে।

​অ্যাননটেক্স গ্রুপ : একক ব্যক্তি বা গ্রুপকে ব্যাংকের মূলধনের ২৫%-এর বেশি ঋণ দেওয়ার নিয়ম নেই (যাকে সিঙ্গেল বরোয়ার এক্সপোজার লিমিট বলে)। কিন্তু নিয়ম ভেঙে অ্যাননটেক্স নামের একটি পোশাক শিল্প গ্রুপকে ব্যাংকের মোট মূলধনের চেয়েও বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১০,০০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়।

​ক্রিসেন্ট গ্রুপ : চামড়া রপ্তানির ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে এবং সরকারের নগদ সহায়তার (ক্যাশ ইনসেনটিভ) অপব্যবহার করে জনতা ব্যাংক থেকে প্রায় ৫,০০০ কোটি টাকা তুলে নেয় এই গ্রুপটি।

​৫. সিকদার পরিবারের 'ন্যাশনাল ব্যাংক' দখল ও অনিয়ম :

​বেসরকারি খাতের অন্যতম পুরোনো এবং একসময়ের অত্যন্ত সফল ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড (NBL) সিকদার গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর চরম সংকটে পড়ে।

 পরিচালনা পর্ষদ দখল করে নামে-বেনামে এবং নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থায় হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ দেওয়া হয়, যার বেশিরভাগই পরবর্তীতে খেলাপি হয়ে পড়ে। ব্যাংকটির বর্তমান খেলাপি ঋণের হার মোট ঋণের ৭৫% ছাড়িয়ে গেছে।

​৬. ফারমার্স ব্যাংক (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) কেলেঙ্কারি :

​আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর এই ব্যাংকটির চেয়ারম্যান থাকাকালীন ব্যাপক অনিয়ম ও ঋণ জালিয়াতি হয়।

 লাইসেন্স পাওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ব্যাংকের উদ্যোক্তারা আমানতকারীদের টাকা ঋণের নামে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেন। ব্যাংকটি দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হলে সরকার বাধ্য হয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর টাকা দিয়ে এটিকে উদ্ধার করে এবং নাম পরিবর্তন করে 'পদ্মা ব্যাংক' রাখা হয়।

​৭. বিসমিল্লাহ গ্রুপ কেলেঙ্কারি (প্রায় ১,২০০ কোটি টাকা) :

​২০১৩ সালের দিকে এই গ্রুপটি ফান্ডেড ও নন-ফান্ডেড সুবিধার আওতায় ৫টি ব্যাংক থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়।

ভুয়া বিদেশি ক্রেতা এবং ভুয়া রপ্তানি আদেশ দেখিয়ে প্রাইম ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক থেকে প্রায় ১,২০০ কোটি টাকা তুলে নিয়ে গ্রুপের মালিক সপরিবারে বিদেশে পালিয়ে যান।

 অন্যান্য ডিজিটাল ও আন্তর্জাতিক কেলেঙ্কারি 

​বাংলাদেশ ব্যাংক হ্যাকিং (২০১৬) : যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে হ্যাকাররা সুইফট (SWIFT) সিস্টেম হ্যাক করে প্রায় ৮১ মিলিয়ন ডলার (১০১ কোটি টাকা) ফিলিপাইনে পাচার করে দেয়।

​নগদ লিমিটেডের ডিজিটাল জালিয়াতি : কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে দেখা গেছে, বিগত সরকারের আমলে মোবাইল ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম 'নগদ'-এর মাধ্যমে অনুমোদনবিহীন প্রায় ১,৭১১ কোটি টাকা তুলে নেওয়ার ও ডিজিটাল ই-মানি জালিয়াতির ঘটনা ঘটে।

এস.আলম কর্তৃক ব্যাংকিং খাতে লুটপাট 

​বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে এস আলমের আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ লুটের সার্বিক চিত্র  :

​পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (PRI)-এর নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর এবং বিভিন্ন জাতীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বেনামে ও ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা (অথবা প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার) ঋণ বা অর্থ বের করে নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশে পাচার করার অভিযোগও রয়েছে।

​এস আলম গ্রুপ মূলত ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই অর্থ সরিয়েছিল। কয়েকটি প্রধান ব্যাংকের চিত্র নিচে দেওয়া হলো:

​ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি 

এই ব্যাংকটি থেকে সবচেয়ে বড় অঙ্কের অর্থ সরানো হয়েছে। এস আলম গ্রুপ ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৭৩,০০০ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে বের করে নিয়েছে, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৫০%। কোনো কোনো রিপোর্টে এই পরিমাণ সুদাসলে ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত স্পর্শ করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

​জনতা ব্যাংক পিএলসি 

দুদকের তদন্ত ও দায়েরকৃত মামলা অনুযায়ী, জনতা ব্যাংকের চট্টগ্রাম আগ্রাবাদ করপোরেট শাখা এবং প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় ভুয়া নথিপত্র ব্যবহার করে এস আলমের ৫টি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান প্রায় ৯,৪২৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচার করেছে।

​অন্যান্য ইসলামী ব্যাংক-

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (SIBL), গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক থেকেও এস আলম গ্রুপ ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বেনামি প্রতিষ্ঠানগুলো হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট ৪টি ব্যাংক থেকেই প্রায় ১ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা লোপাটের তথ্য দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

​দুদক এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকের সফটওয়্যার ম্যানিপুলেশন এবং এলসি (LC)-র অপব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

​উদাহরণস্বরূপ, চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের (SS Power) ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানির নামে ভুয়া এলসি ব্যবহার করে প্রায় ১০,০০০ কোটি টাকা ($815.78 মিলিয়ন) সিঙ্গাপুরে পাচার করার অভিযোগে মামলা রয়েছে।

​সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়ায় এস আলম গ্রুপ বিপুল পরিমাণ রিয়েল এস্টেট সম্পত্তি ও হোটেল ব্যবসা গড়ে তুলেছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

​ব্যাঙ্কিং খাতের সংকট ও সামাজিক নেতিবাচক প্রভাব 

​ব্যাংকিং সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার দেশের সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ। ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট চরমে পৌঁছানোয় সাধারণ আমানতকারীরা তাদের নিজেদের কষ্টার্জিত টাকা তুলতে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। যদিও সাম্প্রতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে শরীয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় তাৎক্ষণিক ২ লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলনের সীমা দেওয়া হয়েছে, তবুও বাজারে এক ধরনের চরম অস্থার পরিবেশ বিরাজ করছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির (যা বর্তমানে প্রায় ৮.৫%) এই সময়ে মানুষ ব্যাংকে টাকা রেখে মুনাফা তো দূরের কথা, মূল টাকা ফেরত পাওয়া নিয়েই শঙ্কিত।

​সংকট উত্তোরোনে করণীয় 

বাংলাদেশের ভঙ্গুর ব্যাংক খাতের এই মহাসংকট রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়, তবে একটি সুনির্দিষ্ট, কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপের মাধ্যমে একে আবার সচল করা সম্ভব। অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পরামর্শ অনুযায়ী, এই সংকট সমাধানে জরুরি ভিত্তিতে নিচে দেওয়া পদক্ষেপগুলো নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন:

​১. রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক

​ব্যাংক খাতের সিংহভাগ অনিয়মের মূল কারণ রাজনৈতিক প্রভাব।

​স্বাধীন সিদ্ধান্ত: বাংলাদেশ ব্যাংককে কোনো অদৃশ্য সুতোর টান বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর চাপ ছাড়া সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নীতি নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়নের আইনি ক্ষমতা দিতে হবে।

​সমঅধিকার নিশ্চিতকরণ: রাষ্ট্রমালিকানাধীন কিংবা প্রভাবশালী বেসরকারি ব্যাংক—আইন সবার জন্য সমান হতে হবে। নিয়মের বাইরে গিয়ে কোনো ব্যাংককে বিশেষ সুবিধা বা ছাড় দেওয়া বন্ধ করতে হবে।

​বাংলাদেশের অর্থনীতি যদি ২০৩০ সালের মধ্যে  ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপ নিতে চায়, তবে ব্যাংকিং খাতকে সুস্থ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই। বর্তমান সংস্কারগুলো আশাব্যাঞ্জক, তবে তার বাস্তবায়নই আসল পরীক্ষা।

​২. ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও সামাজিক একশন

​আইনি দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে খেলাপিরা পার পেয়ে যাচ্ছে।

​বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন: খেলাপি ঋণ আদায়ের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ দেউলিয়া আদালত বা ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে।

​সুযোগ-সুবিধা বাতিল: ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের সিআইবি (CIB) ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে নতুন ঋণ পাওয়ার অযোগ্য ঘোষণা, পাসপোর্ট জব্দ, নতুন ব্যবসা নিবন্ধনে নিষেধাজ্ঞা এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বাতিল করতে হবে।

​সম্পদ বাজেয়াপ্ত: ঋণের বিপরীতে থাকা বন্ধকি সম্পত্তি দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ায় বিক্রি করে ব্যাংকের টাকা উদ্ধারের ব্যবস্থা করতে হবে।

​৩. ‘টোটকা চিকিৎসা’ বা বারবার বিশেষ ছাড় বন্ধ করা

​বারবার রি-শিডিউলিং (ঋণ পুনর্গঠন), সুদ মওকুফ কিংবা ‘ওয়ান-টাইম এক্সিট’ সুবিধা দেওয়া বন্ধ করতে হবে। এগুলো ভালো ঋণগ্রহীতাদের নিরুৎসাহিত করে এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের আরও উৎসাহিত করে। হিসাবের খাতা পরিষ্কার দেখানোর জন্য কৃত্রিম মেকআপ না দিয়ে প্রকৃত আর্থিক চিত্র আড়াল করা বন্ধ করতে হবে।

​৪. দুর্বল ও দেউলিয়া ব্যাংকগুলোর আমূল পুনর্গঠন

​যেসব ব্যাংক সম্পূর্ণ মূলধন হারিয়ে দেউলিয়া হওয়ার পথে, সেগুলোকে জোড়াতালি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।

​একীভূতকরণ (Merger): বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর গাইডলাইন মেনে অত্যন্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সবল ব্যাংকের সাথে একীভূত করতে হবে।

​বোর্ড পুনর্গঠন: লুণ্ঠনের শিকার হওয়া ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ (Board of Directors) ভেঙে দিয়ে সেখানে পেশাদার ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ দিতে হবে।

​৫. করপোরেট গভর্ন্যান্স ও ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা

​কঠোর যাচাই-বাছাই: রাজনৈতিক বিবেচনায় বা বেনামি সংস্থাকে ঋণ দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। ঋণের উপযোগিতা এবং গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কঠোরভাবে যাচাই করতে হবে।

​পরিচালকতন্ত্রের অবসান: একই পরিবারের একাধিক সদস্য বছরের পর বছর ব্যাংকের পরিচালক পদে থাকার নিয়ম বাতিল বা আরও সীমিত করতে হবে, যাতে ব্যাংকগুলো পারিবারিক সম্পত্তিতে পরিণত না হয়।

​৬. তারল্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধি

​বর্তমানে ব্যাংকগুলোর বিপুল অর্থ ট্রেজারি বিলে অলস বসে আছে (ক্রেডিট ক্রাউডিং আউট)।

​উৎপাদনশীল খাত, এসএমই (SME) এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের কাছে ঋণ পৌঁছানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিশেষ প্রণোদনা ও নীতিগত সহায়তা দিতে হবে।

​অনুৎপাদনশীল খাত বা বিলাসবহুল প্রকল্পে ঋণ দেওয়া সাময়িকভাবে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

​৭. ‘অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’ (AMC) গঠন

​আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে একটি সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত 'অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি' গঠন করা যেতে পারে। এই কোম্পানি ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে মন্দ বা খেলাপি ঋণগুলো কিনে নেবে এবং নিজস্ব আইনি ক্ষমতাবলে সেগুলো আদায়ের চেষ্টা করবে। এতে ব্যাংকের ব্যালেন্স শিট বা হিসাবের খাতা হালকা হবে এবং ব্যাংকগুলো আবার স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে পারবে।

সংকট নিরসনের সাম্প্রতিক কিছু উদ্যোগ 

​সংকট উত্তরণে বর্তমান সময়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, যা ইতিবাচক।

​১. ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট, ২০২৬ : ব্যাংকের ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার করতে সরকার 'ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ইউনিট' নামের একটি স্বাধীন সংবিধিবদ্ধ সংস্থা গঠনের জন্য আইন চূড়ান্ত করেছে। এটি খেলাপি ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ আদায়ের জন্য সম্পদ ক্রোক ও বিশেষ আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবে।

২. ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন, ২০২৬ ও বিতর্কিত ধারা বিলোপ : ব্যাংকিং সংস্কারের উদ্দেশ্যে গঠিত এই আইনের বিতর্কিত '১৮(ক)' ধারাটি (যা পুরোনো ও বিতর্কিত মালিকদের ব্যাংকে ফেরার সুযোগ করে দিচ্ছিল বলে সমালোচনা উঠেছিল) ২০২৬ সালের জুনের শেষ সপ্তাহে জাতীয় সংসদে বিলোপের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এটি সরকারের সুশাসন প্রতিষ্ঠার সদিচ্ছার একটি প্রমাণ।

৩. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা : বিশ্বব্যাংক অতি সম্প্রতি (জুন ২০২৬) বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সুরক্ষা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়াতে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার (৪.৫ বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক প্যাকেজের অংশ) ঋণ অনুমোদন করেছে।

​বাংলাদেশের অর্থনীতি যদি ২০৩০ সালের মধ্যে একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপ নিতে চায়, তবে ব্যাংকিং খাতকে সুস্থ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই। বর্তমান সংস্কারগুলো আশাব্যাঞ্জক, তবে তার বাস্তবায়নই আসল পরীক্ষা। সময় ফুরিয়ে আসছে; খাদের কিনার থেকে ব্যাংকিং খাতকে টেনে তুলতে হলে এখনই চূড়ান্ত এবং আপোসিন দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে হহবে। নতুবা বাংলাদেশের পুরো ব্যাংকিং খাত ও অর্থনীতি ধসে পড়ার ঝুঁকি এড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।

লেখক: গবেষক ও একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)