❒ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঘাটতি ৪৭৩১ কোটি, নেপথ্যে শুল্ক ফাঁকি ও ওজনস্কেলের কারসাজি
বেনাপোল প্রতিনিধি
দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল কাস্টম হাউসে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ধস নেমেছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরটিতে সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। কাস্টমসের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের ধারাবাহিক কারসাজির কারণেই সরকারের এই বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বেনাপোল কাস্টম হাউসের চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। যা শুধু লক্ষ্যমাত্রার চেয়েই কম নয়, বরং আগের অর্থবছরের তুলনায়ও প্রায় ৪৭০ কোটি টাকা কম।
কাস্টমস কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধীরগতি এবং শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তনকে রাজস্ব কমার অজুহাত হিসেবে দাঁড় করালেও, বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের অভিযোগ, গত তিন অর্থবছরে সাফটা (SAFTA) সুবিধার আওতায় শুল্কহার ৭ শতাংশ থেকে একলাফে ৩৫ শতাংশে উন্নীত হওয়ার পর থেকেই বেনাপোলে জালিয়াতির প্রবণতা মারাত্মক রূপ নিয়েছে। কম শুল্কের পণ্য আমদানির ঘোষণা দিয়ে উচ্চ শুল্কের দামি পণ্য খালাস করা এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
বন্দরের ভেতরে অনিয়মের এই ভয়াবহ চিত্র স্পষ্ট হয় কাস্টমসের নিজস্ব নথিতেই। গত ১৪ জুন ৫ নম্বর ডিজিটাল ওজনযন্ত্রে ভারতীয়িএকটি খালি ট্রাকের একই সময়ে দুই ধরনের ওজন রেকর্ড হওয়ার ঘটনা হাতেনাতে ধরেন কাস্টমসের সহকারী কমিশনার অটল গোস্বামী। সাইকেলের যন্ত্রাংশের ওই চালানটি নিয়ে তিন কার্যদিবসের মধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও সুনির্দিষ্ট কোনো জবাব মেলেনি। এর আগে ১২ মার্চ ৩৭ নম্বর শেডে বেকিং পাউডার ঘোষণার আড়ালে আনা প্রায় ৬ কোটি টাকার ভারতীয় শাড়ি ও থ্রি-পিস বন্দর থেকেই গায়েব করে দেওয়া হয়, যার তদন্ত শেষে গত জুন মাসে ১৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করতে বাধ্য হয় কাস্টমস।
এছাড়াও ২৬ নম্বর শেডে ইরেজার ও পেন্সিলের আড়ালে দেড় কোটি টাকার পণ্য জালিয়াতি, রোকেয়া ট্রেডার্সের আঙুরবোঝাই ট্রাকের ওজনে গরমিল, এবং বিজিবির অভিযানে আড়াই কোটি টাকার শাড়িসহ কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী আটক হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, এই চক্রের শিকড় কাস্টমসের ভেতরেই প্রোথিত। এমনকি গত ২৫ জুন কেমিক্যাল জোনে সিসিটিভি ফুটেজে ভারতীয় ট্রাক থেকে বাংলাদেশি ট্রাকে পণ্য স্থানান্তরের মাধ্যমে ২ হাজার ৭৮৪ কেজি কেমিক্যাল চুরির ঘটনায় ভুয়া এন্ট্রি পাস ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে।
গত মার্চ থেকে জুন—এই চার মাসেই শুল্ক ফাঁকি ও পণ্য চুরির অভিযোগে ৪টি পৃথক ফৌজদারি মামলা হয়েছে, যেখানে ৫৪ জনকে আসামি করার পাশাপাশি ৯টি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে। তবে আলোচিত এই মামলাগুলোর তদন্ত থমকে থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় আমদানিকারকেরা।
বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সভাপতি মতিয়ার রহমান ও সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান জানান, শেডের ভেতর থেকে পণ্য উধাও হওয়া বা ওজনস্কেলে কারসাজি কখনোই ভেতরের কর্মকর্তাদের সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব নয়। প্রকৃত দায়ীদের আড়াল করে শুধু চুনোপুঁটিদের ধরলে এই জালিয়াতি বন্ধ হবে না। ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান হবি পুরো ওজনব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর ও সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় আনার দাবি জানান।
সার্বিক বিষয়ে বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক শামীম হোসেন তদন্ত কমিটি গঠনের কথা উল্লেখ করে বিভাগীয় ব্যবস্থার আশ্বাস দিয়েছেন। অন্যদিকে, বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার মো. ফাইজুর রহমান দাবি করেছেন, রাজস্ব সুরক্ষায় কাস্টমস সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বেনাপোলের মতো গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি এবং জালিয়াতির সাথে জড়িত কাস্টমস ও বন্দর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে, আগামীতে রাজস্ব ঘাটতির এই খতিয়ান আরও দীর্ঘ হবে।