ধ্রুব ডেস্ক
যশোরের মাইকপট্টিস্থ রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি-র প্রধান শাখায় সাধারণ মানুষের গচ্ছিত কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের এক নজিরবিহীন জালিয়াতি প্রকাশ্যে এসেছে। তিলে তিলে জমানো আমানত হারিয়ে এখন নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন শত শত গ্রাহক। গৃহপরিচারিকা থেকে শুরু করে চিকিৎসক, ব্যবসায়ী কেউই বাদ যাননি এই প্রতারণার জাল থেকে। ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রকাশ্য দিবালোকে এই জালিয়াতি চললেও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে ‘কর্মচারীর একক অপরাধ’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
ভুক্তভোগীদের তথ্যমতে, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে ব্যাংকের যশোর শাখায় জসিম উদ্দিন নামে এক কর্মচারী (বর্তমানে পলাতক) ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। গ্রাহকদের অভিযোগ, ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সামনেই জসিম উদ্দিন কাউন্টারে বসে টাকা গ্রহণ করতেন এবং ব্যাংকের সিলসহ পাস বই বা জমা রশিদ দিতেন। কিন্তু এই টাকার সিংহভাগই তিনি ব্যাংকের মূল সার্ভারে না তুলে নিজের পকেটে ভরতেন।
গ্রাহকদের দাবি, একজন সাধারণ কর্মচারীর পক্ষে কর্মকর্তাদের সায় ছাড়া বছরের পর বছর ব্যাংকের ভেতরে বসে এই জালিয়াতি করা অসম্ভব। কর্মকর্তাদের অনেকের বদলি হয়ে যাওয়ার সুযোগে বর্তমানে যারা দায়িত্ব নিয়েছেন, তারা এখন গ্রাহকদের বলছেন, ‘আপনার এই পাস বই এখন আর চলে না, সিস্টেমের বাইরে লেনদেন করেছেন।’ অথচ গ্রাহকরা ব্যাংকের কাউন্টারেই কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এই লেনদেন করেছেন।
শনিবার ব্যাংকের সামনে জড়ো হওয়া ভুক্তভোগীদের মধ্যে সবচেয়ে করুণ অবস্থা শহরের সিভিল কোর্ট মোড় এলাকার গৃহপরিচারিকা মরিয়ম বেগমের। অন্যের বাড়িতে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে তিনি ৩ লাখ টাকা জমিয়েছিলেন। ব্যাংকে এসে জানতে পারেন তার পুরো হিসাবটিই ‘শূন্য’। দিশেহারা মরিয়ম কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘আমি ব্যাংকের লোকের হাতে টাকা দিছি, এখন তারা কয় চিনি না। আমি বিচার কার কাছে চাইব?’
অন্যান্য ভুক্তভোগীদের মধ্যে রাজারহাটের আনোয়ারা বেগমের ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা, উপশহরের জেসমিন আহমেদের ১১ লাখ টাকা, চাঁচড়ার নাজমুল হক রনির ১২ লাখ টাকার এফডিআর, আশিকুর রহমানের ৬ লাখ টাকা, বকচরের আমিনুলের ১১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, হুশতলার সেলিনা বেগমের ৬ লাখ টাকা, ডা. আবু সাঈদ ও ডা. মো. সাইমের বড় অঙ্কের এফডিআর এবং সঞ্চয়।
শনিবার ব্যাংকের বার্ষিক অনুষ্ঠানে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) যশোর শাখায় আসছেন, এমন খবরে ভুক্তভোগীরা দুপুরেই ব্যাংকে ভিড় জমান। তারা নিজেদের টাকা ফেরত পেতে এমডির মুখোমুখি হওয়ার চেষ্টা করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এমডিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পেছনের দরজা দিয়ে তড়িঘড়ি করে বের হয়ে যান। গ্রাহকরা তাদের গাড়ির সামনে দাঁড়ালে চাপা পড়ার মতো উপক্রম হয়। এমনকি ব্যাংকের দরজা খোলা রেখে কর্মকর্তারা সটকে পড়লে ব্যাংকে কেবল নিরাপত্তাকর্মী আনসার সদস্যদের দেখা যায়।
অভিযুক্ত কর্মচারী জসিম উদ্দিন পলাতক থাকলেও এলাকাবাসীর অভিযোগ, ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করে তিনি ইতোমধ্যে শহরে আলিশান অট্টালিকা ও বিপুল স্থাবর সম্পদ গড়ে তুলেছেন।
এই বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংক যশোর শাখার ম্যানেজারের সাথে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ছুটির দিনে ব্যাংকে কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে না পাওয়ায় গ্রাহকদের উদ্বেগ আরও বাড়ছে।
ভুক্তভোগী গ্রাহকরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, আগামীকাল থেকে তারা ব্যাংকের সামনে লাগাতার অবস্থান ধর্মঘট পালন করবেন। প্রয়োজনে তারা আদালতের দ্বারস্থ হবেন এবং ব্যাংক ঘেরাও কর্মসূচি পালন করবেন।