❒ রিজার্ভ চুরি
ধ্রুব ডেস্ক
এক দশকের দীর্ঘ অপেক্ষা আর ৯৩ বার সময় পেছানোর পর অবশেষে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির তদন্ত। ইতিহাসের এই বৃহত্তম ডিজিটাল লুণ্ঠনের নেপথ্যে থাকা ছয় দেশের অন্তত ৭০ জনের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এই অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ অন্তত ১০ জন প্রভাবশালী কর্মকর্তা।
আন্তঃরাষ্ট্রীয় এই অপরাধের জট খুলতে সম্প্রতি 'গেম চেঞ্জার' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো ৪০০ পৃষ্ঠার একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন। মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্টের (এমএলএআর) আওতায় পাঠানো এই নথিতে লুণ্ঠিত অর্থের প্রতিটি ডলারের গতিপথ এবং অপরাধীদের ডিজিটাল পায়ের ছাপ নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সিআইডি বলছে, এই প্রতিবেদনটি পাওয়ার ফলে এখন বিদেশি অপরাধীদের কাঠগড়ায় তোলা এবং আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পথ সুগম হলো।
সিআইডির তদন্ত ও মার্কিন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এই চুরির মূল মাস্টারমাইন্ড ছিল উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত সাইবার গ্রুপ ‘লেজারাস’ (APT38)। হ্যাকার গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন পার্ক জিন ইউক। বিদেশিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযুক্ত ফিলিপাইনের—সংখ্যায় তারা ৪০ জন। এছাড়া চীন, জাপান, শ্রীলঙ্কা ও ভারতের নাগরিকদেরও এই চক্রে সরাসরি যুক্ত থাকার প্রমাণ মিলেছে। তাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং, আইসিটি অ্যাক্ট ও দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় মামলা চূড়ান্ত করা হচ্ছে।
তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি এখন পর্যন্ত ৩০ জন কর্মকর্তাকে জেরা করেছে। এর মধ্যে ড. আতিউর রহমানসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে তিনটি সুনির্দিষ্ট ‘অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের’ প্রমাণ মিলেছে:
অত্যন্ত সংবেদনশীল সুইফট সার্ভারকে কোনো প্রকার নিরাপত্তা ঝুঁকি ছাড়াই কেন সরাসরি আরটিজিএস (RTGS) সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল? সিআইডি একে নিছক ভুল নয়, বরং পরিকল্পিত গাফিলতি হিসেবে দেখছে।
তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমান কেন এই ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগের অনুমোদন দিয়েছিলেন এবং হ্যাকিংয়ের তথ্য জানার পরও তা কেন বেশ কয়েক দিন চেপে রাখা হলো—এই দুটি বিষয়ে তাকে প্রধান অভিযুক্ত করা হচ্ছে।
হ্যাকারদের পাঠানো মেলওয়্যার ডাউনলোড করা এবং পরবর্তীতে জানাজানি হওয়ার ভয়ে কিছু কারিগরি ক্লু বা ডিজিটাল আলামত মুছে ফেলার প্রমাণ মিলেছে আইটি ও ট্রেজারি বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
ক্যাসিনোর সেই গোলকধাঁধা
মার্কিন প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে কীভাবে ফেডারেল রিজার্ভ থেকে চুরি হওয়া অর্থ ফিলিপাইনের চারটি ক্যাসিনো—ফিলরেম, ইস্টার্ন হাওয়াই, মিডাস ও সোলাইয়ার-এ পাচার করা হয়। ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু অ্যাকাউন্টে এই অর্থ জমা হয়, যা পরবর্তীতে জুয়ার আসরে ‘ক্লিন মানি’ হিসেবে সরিয়ে নেওয়া হয়।
২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত এই ঘটনার ৩৯ দিন পর মতিঝিল থানায় মামলা হলেও দীর্ঘ ১০ বছরে তা আলোর মুখ দেখেনি। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত পর্যালোচনা কমিটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে চলমান মামলার রায় আসার পরপরই ঢাকার আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে। সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আল মামুন সাংবাদিকদের কাছে নিশ্চিত করেছেন যে, তদন্ত এখন ‘বুলস আই’ বা চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছেছে।
লুট হওয়া ৮১০ কোটি টাকার মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৩৪.৬৬ মিলিয়ন ডলার উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাকি বিশাল অংকের টাকা ফেরত আনতে এবং মূল হোতাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে এই নতুন মার্কিন প্রতিবেদনটিই এখন বাংলাদেশের প্রধান অস্ত্র।