ক্রীড়া ডেস্ক
দুই তরুন প্রতিভা কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং লামিন ইয়ামালের দিকে চোখ থাকবে পুরো ফুটবল বিশ্বের ছবি: এ আই প্রণীত
ফুটবল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে স্পেন ও ফ্রান্সের লড়াই মানেই স্রেফ একটি ম্যাচ নয়, বরং ইউরোপীয় ফুটবলের দুই পরাশক্তির আধিপত্য বিস্তারের এক রাজকীয় মহড়া। একদিকে দুই বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স, অন্যদিকে ২০১০ সালের শিরোপাধারী স্পেন—সব মিলিয়ে এই ম্যাচটি পরিণত হয়েছে দুই ভিন্ন ফুটবলীয় দর্শনের এক ধ্রুপদী দ্বৈরথে। ইতিহাস, আভিজাত্য আর প্রতিশোধের আগুনে ঘেরা এই লড়াইটিকে অনেকেই আখ্যা দিচ্ছেন ‘ফাইনালের আগের ফাইনাল’ হিসেবে। বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১টায় ডালাসে গড়াতে যাওয়া হাইভোল্টেজ এই ম্যাচটি যে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য রোমাঞ্চের পসরা সাজিয়ে বসেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে এই দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতিহাস প্রায় এক শতাব্দীর পুরনো। ১৯২২ সালে প্রথমবার একে অপরের মোকাবিলা করার পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৩৮ বার মুখোমুখি হয়েছে তারা। পরিসংখ্যানে ফরাসিদের আধিপত্য বেশ স্পষ্ট; তাদের ১৭টি জয়ের বিপরীতে স্প্যানিশরা জিতেছে ১৩টিতে, আর ড্র হয়েছে ৮টি ম্যাচ। গোলের খতিয়ানেও ৬৭-৪০ ব্যবধানে বেশ দাপটের সঙ্গেই এগিয়ে আছে ফ্রান্স। তবে বিশ্বমঞ্চে এই দুই দলের দেখা হওয়ার ঘটনা বেশ বিরল। এর আগে বিশ্বকাপে মাত্র একবারই মুখোমুখি হয়েছিল তারা। ২০০৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর সেই লড়াইয়ে জিনেদিন জিদানের জাদুকরী পারফরম্যান্সে স্পেনকে ৩-১ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল ফরাসিরা, যে ক্ষত স্প্যানিশ সমর্থকদের হৃদয়ে আজও রয়ে গেছে।
বিশ্বকাপে ফরাসিরা আধিপত্য দেখালেও ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় স্পেনের পাল্লাটাই আবার ভারী। ২০১২ ইউরোর কোয়ার্টার ফাইনালে ফরাসিদের কাঁদিয়ে শিরোপার পথে এগিয়ে গিয়েছিল লা রোহারা। যদিও ২০২১ সালের উয়েফা নেশন্স লিগ ফাইনালে ২-১ গোলের জয়ে মধুর প্রতিশোধ নিয়েছিল ফ্রান্স, তবে ২০২৪ ইউরোর সেমিফাইনালে লামিন ইয়ামালের জাদুকরী গোলে ঠিকই ২-১ ব্যবধানের জয় তুলে নিয়ে ফাইনালে পা রাখে স্প্যানিশরা। অতীত পরিসংখ্যান আর সাম্প্রতিক ফর্ম—সব মিলিয়ে তাই দুই দলই একে অপরের শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে সম্যক অবগত।
কৌশলগত দিক থেকে এই সেমিফাইনাল মূলত নান্দনিকতা বনাম শক্তির এক অসাধারণ লড়াই। একদিকে স্পেনের বল-পজেশন ভিত্তিক শৈল্পিক ফুটবল, অন্যদিকে ফ্রান্সের গতি, শারীরিক সামর্থ্য ও ভয়ংকর প্রতি-আক্রমণ—ফুটবল মাঠে এর চেয়ে চমৎকার ট্যাকটিকাল লড়াই আর কী হতে পারে! চলতি আসরে দু’দলের পরিসংখ্যানও চমকে দেওয়ার মতো। টুর্নামেন্টের সেরা রক্ষণভাগ নিয়ে খেলা স্পেন ৬ ম্যাচে হজম করেছে মাত্র ১টি গোল। বিপরীতে, ১৬ গোল করে আসরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা দল হিসেবে নিজেদের আক্রমণাত্মক রূপ দেখিয়েছে ফ্রান্স। অর্থাৎ, ডালাসে স্পেনের জমাট রক্ষণের সামনে কড়া পরীক্ষা দিতে হবে ফ্রান্সের বিস্ফোরক ফরোয়ার্ডদের।
একদিকে টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার হাতছানি ফ্রান্সের সামনে, অন্যদিকে টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থাকার দুর্ধর্ষ রেকর্ড নিয়ে শিরোপা পুনরুদ্ধারে মরিয়া স্পেন। সব মিলিয়ে, ইতিহাসের পাতায় ফ্রান্স কিছুটা এগিয়ে থাকলেও সাম্প্রতিক ছন্দে স্প্যানিশরা সমপরিমাণ ভয়ংকর। বড় মঞ্চের এই স্নায়ুচাপ যারা ভালোভাবে সামলাতে পারবে, ডালাসের মাঠে শেষ হাসি ফুটবে তাদেরই। একটি জাদুকরী ব্যক্তিগত নৈপুণ্য কিংবা সামান্য একটি ভুলই গড়ে দিতে পারে মহাগুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচের ভাগ্য। আপাতত পুরো ফুটবল বিশ্ব প্রহর গুনছে পরতে পরতে উত্তেজনা ছড়ানো এমনই এক ক্লাসিক ফুটবলীয় লড়াই উপভোগ করার।