ধ্রুব নিউজ
স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকা এক জোড়া চোখ, আঙুলের দ্রুত স্ক্রোলিং, আর চারপাশের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক তরুণ—আজকের বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত পরিবারের চেনা ছবি এটি। ফেসবুকের নিউজফিড আর টিকটকের ১৫ সেকেন্ডের ভিডিওর গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের নতুন প্রজন্ম। প্রযুক্তি যেখানে হওয়ার কথা ছিল জ্ঞানার্জনের উন্মুক্ত আকাশ, সেখানে এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে এক ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক আসক্তি। এই ‘ডিজিটাল ড্রাগ’ তরুণ সমাজের সৃজনশীলতা, মেধা এবং মানসিক স্বাস্থ্যকে গ্রাস করছে। দেশ ও জাতির টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এই আসক্তির কারণ অনুসন্ধান এবং এর কার্যকর প্রতিকার নিয়ে ভাবার সময় এখনই।
আসক্তির নেপথ্যে
তরুণ প্রজন্মের এই মাত্রাতিরিক্ত ফেসবুক ও টিকটক আসক্তির পেছনে একক কোনো কারণ নেই; বরং সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও প্রযুক্তিগত বেশ কিছু কারণ একসঙ্গে কাজ করছে।
সহজে সস্তা বিনোদন ও ডোপামিন রাশ
টিকটক বা ফেসবুক রিলসের অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি, যা ব্যবহারকারীর মনস্তত্ত্বকে নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিটি নতুন ভিডিও বা লাইক-কমেন্ট মস্তিষ্কে 'ডোপামিন' নামক হরমোন নিঃসরণ করে, যা সাময়িক আনন্দের অনুভূতি দেয়। এই ক্ষণস্থায়ী সুখের খোঁজে তরুণরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনে আঙুল ঘষতে থাকে।
২.খেলার মাঠ ও সুস্থ বিনোদনের অভাব : নগরায়ণের আগ্রাসনে আজ আমাদের শহর কিংবা মফস্বল থেকে খেলার মাঠগুলো হারিয়ে গেছে। বিকেল বেলা বন্ধুদের সাথে মাঠে ছুটে বেড়ানোর যে আনন্দ, তা থেকে আজকের কিশোর-কিশোরীরা বঞ্চিত। সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা, যেমন—পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরি, বিতর্ক ক্লাব বা নাট্যচর্চার অভাব তাদেরকে বাধ্য করছে চার দেয়ালে বন্দি হয়ে ভার্চুয়াল বিনোদন বেছে নিতে।
পারিবারিক নিঃসঙ্গতা ও প্যারেন্টিং-এর ঘাটতি
অনেক পরিবারেই বাবা-মা দুজনেই কর্মব্যস্ত। সন্তানকে গুণগত সময় দেওয়ার ফুসরত তাদের কম। অনেক সময় ছোটবেলা থেকেই কান্নাকাটি থামানো বা ভাত খাওয়ানোর সহজ উপায় হিসেবে সন্তানের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া হয়। এই পারিবারিক একাকীত্ব কাটাতে একসময় ফেসবুক বা টিকটকই হয়ে ওঠে তাদের একমাত্র সঙ্গী।
৪.সস্তা জনপ্রিয়তা ও ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ হওয়ার মোহ : টিকটক বা ফেসবুকে রাতারাতি তারকা বনে যাওয়ার এক ধরনের অন্ধ মোহ কাজ করছে নতুন প্রজন্মের মধ্যে। কোনো রকম প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা ছাড়াই কেবল কিছু চটকদার বা অদ্ভুত ভিডিও বানিয়ে লাখ লাখ ভিউ এবং ‘লাইক’ পাওয়ার এই সংস্কৃতি তরুণদের বিভ্রান্ত করছে।
তরুণ সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের নেতিবাচক প্রভাব
বাংলাদেশের তরুণ সমাজের ওপর ফেসবুক ও টিকটক আসক্তির ক্ষতিকর প্রভাব আজ আর কেবল সামান্য সময়ের অপচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি আমাদের তরুণদের মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক, শারীরিক এবং অর্থনৈতিক কাঠামোকে ভেতর থেকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিচ্ছে। নিচে এর সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত প্রভাবগুলো আলোচনা করা হলো-
মানসিক স্বাস্থ্যের বিপর্যয় ও "ভার্চুয়াল ট্র্যাপ"
সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক, কমেন্ট আর শেয়ারের সংখ্যা দিয়ে আজ তরুণরা নিজেদের যোগ্যতার মূল্যায়ন করছে। এর ফলে এক ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক সংকট তৈরি হচ্ছে:
হীনম্মন্যতা ও ডিপ্রেশন : ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে অন্যরা তাদের জীবনের শুধু চমৎকার মুহূর্তগুলো (ভ্রমণ, দামি খাবার, সাফল্য) শেয়ার করে। বাস্তব জীবনের সাধারণ তরুণরা যখন নিজেদের জীবনের সাথে এই কৃত্রিমভাবে সাজানো ‘পারফেক্ট’ জীবনের তুলনা করে, তখন তাদের মধ্যে তীব্র হীনম্মন্যতা ও হতাশা জন্ম নেয়।
ফিয়ার অফ মিসিং আউট : সবসময় একটি অদৃশ্য তাড়না কাজ করে—"সবাই হয়তো অনেক মজায় আছে, আমি একা পড়ে গেলাম।" এই ভয় থেকে তরুণরা এক মুহূর্তের জন্যও ফোন থেকে চোখ সরাতে পারে না, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদী দুশ্চিন্তা বা ক্রনিক এনজাইটির দিকে ঠেলে দেয়।
সহনশীলতা ও মনোযোগের ক্ষমতা হ্রাস : টিকটক বা রিলসের ১৫ সেকেন্ডের ভিডিও দেখতে দেখতে তরুণ মস্তিষ্কের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। এর ফলে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো বই পড়া, পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া বা গভীর কোনো বিষয় চিন্তা করার ধৈর্য তারা হারিয়ে ফেলছে। তারা সবকিছুতেই এখন 'ইনস্ট্যান্ট' বা তাৎক্ষণিক ফলাফল চায়, যা বাস্তব জীবনে সম্ভব নয়।
সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও পারিবারিক দূরত্ব
অনলাইনে হাজার হাজার ‘ফ্রেন্ড’ বা ‘ফলোয়ার’ থাকলেও বাস্তব জীবনে এই তরুণরা চরম একাকী।
সামাজিক দক্ষতার অভাব (Social Awkwardness) : ভার্চুয়াল জগতে চ্যাট করতে পারলেও, বাস্তব জীবনে মানুষের সামনে গিয়ে কথা বলা, চোখের দিকে তাকিয়ে ভাব বিনিময় করা বা কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে স্বাভাবিক আচরণ করার আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে অনেকে।
পারিবারিক বন্ধনে ফাটল : একই ছাদের নিচে, একই সোফায় বসে থেকেও পরিবারের সদস্যরা আজ একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন। বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে সুস্থ সংলাপের জায়গাটি দখল করে নিয়েছে ফোনের স্ক্রিন। এর ফলে পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে এবং তরুণরা যেকোনো সংকটে পরিবারের কাছে না গিয়ে ইন্টারনেটের ভুল গোলকধাঁধায় সমাধান খুঁজছে।
নৈতিক অবক্ষয় ও অপরাধের বিস্তার
চটকদার জনপ্রিয়তা এবং রাতারাতি অর্থ উপার্জনের মোহ তরুণদের অন্ধকার পথে ধাবিত করছে।
কিশোর গ্যাং ও সাইবার বুলিং : টিকটক বা ফেসবুক গ্রুপকে কেন্দ্র করে পাড়ায় পাড়ায় ‘কিশোর গ্যাং’ কালচার গড়ে উঠছে। টিকটক স্টারদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার, গ্রুপে লাইভ এসে একে অপরকে গালিগালাজ বা হুমকি দেওয়া—একসময় মাঠের মারামারি ও খুনাখুনিতে রূপ নিচ্ছে।
অশ্লীলতা ও বিকৃত সংস্কৃতির চর্চা : ভিউ এবং ফলোয়ার বাড়ানোর জন্য কিশোর-কিশোরীরা অত্যন্ত নিম্নমানের, সস্তা এবং অনেক সময় সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ পরিপন্থী কনটেন্ট তৈরি করছে। ‘চ্যালেঞ্জ’ বা ‘প্র্যাঙ্ক’ (Prank) ভিডিওর নামে সাধারণ মানুষকে রাস্তায় হেনস্তা করার মতো অপরাধকেও তারা বিনোদন মনে করছে।
শারীরিক ও চিকিৎসাগত জটিলতা
দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার শারীরিক খেসারত দিতে হচ্ছে অত্যন্ত চড়া মূল্যে।
ডিজিটাল ইনসোমনিয়া (অনিদ্রা) : ফোনের স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো আমাদের মস্তিষ্কে ‘মেলাটোনিন’ নামক ঘুমের হরমোন উৎপাদনে বাধা দেয়। রাত জেগে স্ক্রোল করার ফলে তরুণ প্রজন্মের সিংহভাগই মারাত্মক অনিদ্রা, মাথাব্যথা এবং চোখের দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের সমস্যায় ভুগছে।
স্থূলতা ও অলসতা : শারীরিক কসরত বা খেলাধুলার অভাব এবং স্ক্রিনে মগ্ন থেকে জাঙ্ক ফুড খাওয়ার অভ্যাসের কারণে অল্প বয়সেই তরুণরা ওবেসিটি বা স্থূলতা, পিঠ-ঘাড়ের ব্যথা এবং হৃদরোগের ঝুঁকিতে পড়ছে।
মেধার অপচয় ও দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ক্ষতি
যে বয়সটি ক্যারিয়ার গড়ার, নতুন দক্ষতা অর্জন করার—সেই সোনালী সময় রাষ্ট্র ও তরুণরা হারাচ্ছে এই ডিজিটাল গোলকধাঁধায়।
শিক্ষাজীবনে ধস : পরীক্ষার আগের রাতেও ফেসবুক স্ক্রোলিং বা গেম খেলায় মগ্ন থাকার কারণে পরীক্ষার ফলাফল বিপর্যয় ঘটছে। সৃজনশীল চিন্তা করার ক্ষমতা হারিয়ে তরুণরা কেবল শর্টকাট খুঁজছে, যা তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও কর্মমুখী যোগ্যতাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
বেকারত্ব ও অদক্ষ জনশক্তি : চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে যখন কোডিং, ডেটা অ্যানালাইসিস বা জটিল কোনো সফটওয়্যার শেখা প্রয়োজন, তখন আমাদের তরুণদের একটা বড় অংশ ব্যস্ত থাকছে টিকটকের ট্রেন্ড ফলো করতে। এর ফলে তারা বৈশ্বিক শ্রমবাজারের অনুপযোগী এক অদক্ষ জনশক্তিতে পরিণত হচ্ছে, যা দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এক বিশাল বড় ধাক্কা।
উন্নত বিশ্বে নৈতিক অবক্ষয়ের নেতিবাচক প্রভাব
উন্নত বিশ্বের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট আমাদের চেয়ে ভিন্ন হলেও, ফেসবুক, টিকটক বা ইনস্টাগ্রাম আসক্তির সামাজিক ক্ষতি সেখানে আরও প্রকট এবং সুনির্দিষ্ট রূপ নিয়েছে। উন্নত বিশ্বে এই আসক্তিকে এখন একটি "জনস্বাস্থ্য সংকট" (Public Health Crisis) হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সেখানকার সমাজব্যবস্থায় প্রযুক্তির এই আগ্রাসন যে বিশেষ সামাজিক ক্ষতিগুলো ডেকে আনছে, তা নিচে তুলে ধরা হলো-
চরম একাকীত্ব ও "সোশ্যাল আইসোলেশন" (Social Isolation)
উন্নত বিশ্বের পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামো এমনিতেই কিছুটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি একে আরও চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
মার্কিন সার্জন জেনারেলের (Surgeon General) সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, আমেরিকায় একাকীত্ব (Loneliness) এখন একটি মহামারী।
তরুণরা সশরীরে বন্ধুদের সাথে দেখা করার চেয়ে রুমে একা বসে টিকটক বা স্ন্যাপচ্যাটে সময় কাটাতে বেশি পছন্দ করছে। এর ফলে বাস্তব জীবনের সামাজিক দক্ষতা (Social skills), যেমন—কারও সাথে চোখে চোখ রেখে কথা বলা বা মানুষের আবেগ বোঝার ক্ষমতা নতুন প্রজন্ম হারিয়ে ফেলছে।
বডি ডিসমরফিয়া (Body Dysmorphia) এবং আত্মহনন
টিকটক এবং ইনস্টাগ্রামের ফিল্টার সংস্কৃতির কারণে উন্নত বিশ্বের কিশোরী ও তরুণীদের মধ্যে নিজস্ব চেহারা ও শরীর নিয়ে চরম হীনম্মন্যতা তৈরি হচ্ছে। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘বডি ডিসমরফিয়া’ বলা হয়।
কৃত্রিমভাবে নিখুঁত করা ছবি বা ভিডিও দেখে তরুণীরা ভাবছে তাদের বাস্তব শরীর সুন্দর নয়। এর ফলে সেখানে ইটিং ডিসঅর্ডার (খাবার না খাওয়ার রোগ), প্লাস্টিক সার্জারির প্রতি অন্ধ ঝোঁক এবং আত্মহত্যার প্রবণতা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। ইউকে ও ইউএসএ-তে কিশোরীদের আত্মহত্যার হার বৃদ্ধির পেছনে ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের অ্যালগরিদমকে সরাসরি দায়ী করা হচ্ছে ।
স্ন্যাপচ্যাট ডিসমরফিয়া ও প্লাস্টিক সার্জারির মহামারী
পশ্চিমা দেশগুলোতে প্লাস্টিক সার্জনদের কাছে যাওয়া তরুণদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। তারা সার্জনদের কাছে গিয়ে নিজেদের বাস্তব চেহারা পরিবর্তন করে টিকটক বা স্ন্যাপচ্যাটের ফিল্টারের মতো করার দাবি জানায়। বাস্তব জীবনকে বর্জন করে পুরোপুরি একটি অবাস্তব ‘ভার্চুয়াল রূপ’ ধারণ করার এই সামাজিক ব্যাধি উন্নত বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছে।
ক্যান্সেল কালচার ও মেরুকরণ
উন্নত বিশ্বে সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে সমাজ চরমভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। টিকটক ও ফেসবুকের অ্যালগরিদম মানুষকে শুধু তার পছন্দের মতাদর্শের ভিডিও দেখায়। এর ফলে ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা একদম কমে গেছে। সামান্য ভিন্নমতের কারণে কাউকে সমাজ বা কর্মক্ষেত্র থেকে বয়কট করার যে ‘ক্যান্সেল কালচার’, তা পশ্চিমা তরুণদের মধ্যে তীব্র অসহনশীলতা ও সামাজিক সহিংসতা তৈরি করছে।
স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা ও টিকটক চ্যালেঞ্জ
আমেরিকা ও ইউরোপের স্কুলগুলোতে টিকটকের বিভিন্ন ‘ট্রেন্ড’ বা ‘চ্যালেঞ্জ’ সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন—"Devious Licks" নামক একটি টিকটক চ্যালেঞ্জের কারণে আমেরিকার হাজার হাজার স্কুলের বাথরুমের জিনিসপত্র ভাঙচুর ও চুরি করে ভিডিও আপলোড করেছিল শিক্ষার্থীরা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের হেনস্তা করা বা স্কুলের সম্পত্তি নষ্ট করার এই সংস্কৃতি উন্নত বিশ্বের আইনশৃঙ্খলার জন্য মাথা ব্যথার কারণ।
টেক জায়ান্টদের বিরুদ্ধে আইনি যুদ্ধ
উন্নত বিশ্বের সামাজিক ক্ষতি এতটাই দৃশ্যমান যে, আমেরিকার শত শত স্কুল ডিস্ট্রিক্ট এবং মেটা (Meta), টিকটক (TikTok)-এর মতো টেক জায়ান্টদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছে। তাদের অভিযোগ—এই কোম্পানিগুলো জেনেশুনে এমন অ্যালগরিদম তৈরি করেছে যা শিশুদের আসক্ত করে তাদের মানসিক ক্ষতি করছে এবং সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনছে।
সামাজিক ও মানসিক অবক্ষয়ের কিছু পরিসংখ্যান :
বাংলাদেশের তরুণ ও শিক্ষার্থীদের ওপর করা সাম্প্রতিক কিছু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণায় (যেমন—আইসিডিডিআর,বি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নাল) এই আসক্তির যে চিত্র উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক-
ফেসবুক ও টিকটক আসক্তি থেকে বের হবার পথ
এই সংকট থেকে তরুণ প্রজন্মকে মুক্ত করতে হলে রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবারকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু স্মার্টফোন কেড়ে নেওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, বরং এর বিকল্প ও সুস্থ পরিবেশ তৈরি করাই আসল চ্যালেঞ্জ।
মূলকথা হলো-প্রযুক্তি অভিশাপ নয়, যদি তার লাগাম আমাদের হাতে থাকে। কিন্তু যখন প্রযুক্তি মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন তা বিপর্যয় ডেকে আনে। আমাদের নতুন প্রজন্ম অত্যন্ত মেধাবী এবং সম্ভাবনাময়। এই মেধাকে ফেসবুকের সস্তা স্ক্রোলিং আর টিকটকের সস্তা বিনোদনের অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। আজকের তরুণরাই আগামী দিনের বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে। তাই তাদের এই নীরব আসক্তি থেকে রক্ষা করা কোনো একক ব্যক্তি বা পরিবারের দায়িত্ব নয়, এটি আজ আমাদের জাতীয় কর্তব্য। আসুন, ভার্চুয়াল জগতের মোহ ভেঙে আমাদের সন্তানদের আবার বাস্তব পৃথিবীর আলো-বাতাস, সবুজ মাঠ আর বইয়ের পাতায় ফিরিয়ে আনি।"প্রযুক্তি আমাদের চালিত করবে না, বরং আমরাই প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করব—এই হোক আমাদের নতুন প্রজন্মের মূলমন্ত্র।"
লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা