ফাহিম ফারহাদ
আর্জেন্টিনার ৩৬ বছরের অধরা শিরোপা-টি এনে দিয়েছিলেন লিওনেল স্কালোনি ছবি: গেটি ইমেজ স্পোর্ট
"স্কালোনির ভাগ্যে জুটবে প্রশংসা, আর মেসি হবেন পূজনীয়"—২০২২ সালের কাতার ফুটবল বিশ্বকাপের সেই শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনালের মহেন্দ্রক্ষণে ধারাভাষ্যকারের কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসা এই একটি বাক্য কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে চিরতরে গেঁথে গেছে। লাতিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনার ৩৬ বছরের বিশ্বজয়ের আক্ষেপ ঘুচিয়ে দেওয়ার মুহূর্তে এই একটি লাইন যেন পুরো চিত্রনাট্যের সারসংক্ষেপ ছিল। আলবিসেলেস্তেদের প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনির পথচলাটা ছিল ঠিক এমনই—উপহাস ও অবহেলা থেকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছানোর এক অবিশ্বাস্য, ধৈর্যশীল এবং বাস্তবসম্মত মহাকাব্য।
২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের পর আর্জেন্টিনা দল যখন এক চরম বিপর্যয় আর হতাশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন অন্তর্বর্তীকালীন কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেন লিওনেল স্কালোনি। সেই সময় ফুটবল দুনিয়া তার যোগ্যতা নিয়ে প্রকাশ করেছিল চরম অবিশ্বাস ও সংশয়। এমনকি আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনাও স্কালোনির অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রকাশ্যেই কড়া সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু মাঠের বাইরে শান্ত, প্রচারবিমুখ আর মৃদুভাষী এই মানুষটিই যে আর্জেন্টিনার ফুটবলের চেহারা আমূল বদলে দেবেন, তা তখন অতি বড় আলবিসেলেস্তে সমর্থকের পক্ষেও অনুমান করা সম্ভব ছিল না।
স্কালোনি খুব দ্রুতই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, শুধু মহাতারকা লিওনেল মেসিকে ঘিরে বড় বড় নামের মেলা বসালেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসবে না। ফুটবল একটা দলীয় খেলা, আর তাই এখানে প্রয়োজন একতাবদ্ধ, সুশৃঙ্খল ও লড়াকু একটি বাহিনী। সেখান থেকেই শুরু হয় তার অপরাজেয় যাত্রার গল্প।
২০২১: মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের আসর কোপা আমেরিকায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে হারিয়ে খরা কাটানো।
২০২২: কাতার বিশ্বকাপে ডেসিমাল বা টাইব্রেকারের স্নায়ুযুদ্ধ জিতে বিশ্বজয়।
২০২৪: আবারও মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখা।
টানা এই ত্রিমুকুট জয় প্রমাণ করে স্কালোনির সাফল্য কোনো আকস্মিক ঘটনা বা ভাগ্যের জোর ছিল না, বরং তা ছিল নিখুঁত ও সুনিপুণ রণকৌশলের ফসল।
প্রতিপক্ষের চালভেদে জাদুকরী রণকৌশল
স্কালোনির সবচেয়ে বড় সক্ষমতা হলো প্রতিপক্ষের শক্তি ও দুর্বলতা মেপে নিজের ছক বা ফর্মেশন সাজানো। তিনি কোনো নির্দিষ্ট কৌশলে বন্দী থাকেননি।
কোয়ার্টার ফাইনাল (নেদারল্যান্ডস): প্রতিপক্ষের আক্রমণাত্মক রক্ষণভাগকে রুখে দিতে তিনি প্রথাগত ছক ভেঙে বেছে নিয়েছিলেন ৫-৩-২ বিন্যাস।
সেমিফাইনাল (ক্রোয়েশিয়া): ক্রোয়েশিয়ার শক্তিশালী মধ্যমাঠ বা মিডফিল্ডকে নিষ্ক্রিয় করতে চারজন মধ্যমাঠের খেলোয়াড় নামানোর মাস্টারস্ট্রোক খেলেন তিনি।
ফাইনাল (ফ্রান্স): চূড়ান্ত লড়াইয়ে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে আনহেল ডি মারিয়াকে প্রথাগত ডানপ্রান্তের পরিবর্তে বামপ্রান্তে খেলানোর যে জাদুকরী চাল তিনি দিয়েছিলেন, তা প্রতিপক্ষ দলের কোচের সমস্ত পরিকল্পনাকে পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল।
তারুণ্য ও অভিজ্ঞতার মেলবন্ধন
স্কালোনির দলে ছিল প্রবীণ ও নবীনের এক অপূর্ব রসায়ন। লিওনেল মেসি এবং আনহেল ডি মারিয়ার মতো অভিজ্ঞ তারকাদের তিনি যেমন সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছেন, তেমনি এনজো ফার্নান্দেজ কিংবা হুলিয়ান আলভারেজের মতো তরুণ প্রতিভাদের সঠিক সময়ে চিনে নিয়ে মাঠে নামাতে ভুল করেননি। দলের মূল নায়ক লিওনেল মেসিকে তিনি মাঠের ভেতরে ও বাইরে সর্বোচ্চ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন, যার ফলে মেসিও মুক্ত মনে নিজের ক্যারিয়ারের সেরা রূপটি মেলে ধরতে পেরেছিলেন।
নেপথ্যের শান্ত এক ফুটবল দার্শনিক
এই মহাকাব্যিক গল্পটা আর্জেন্টিনার সান্তা ফে প্রদেশের পুজাতো শহরের এক কৃষক পরিবার থেকে উঠে আসা এক সাধারণ মানুষের, যার ধমনীতে শুধুই খেলাধুলার প্রতি নিখাদ ভালোবাসা। গল্পটা ৩৬ বছরের দীর্ঘ আক্ষেপ আর ট্রফি খরা মোচন করার এক মহান ফুটবল দার্শনিকের।
যখন বিশ্বজয়ের পর পুরো স্টেডিয়াম এবং কোটি কোটি আর্জেন্টাইন উল্লাসে মেতে উঠেছিল, তখন মাঠের প্রান্তে একদম শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে চোখের জল মুছছিলেন স্কালোনি। এমনকি ফাইনালের টাইব্রেকারের সেই চরম স্নায়ুচাপের মুহূর্তেও যখন কোটি মানুষের হৃদস্পন্দন বন্ধ হওয়ার উপক্রম, তখনও ডাগআউটে মাথা ঠান্ডা রেখে জলপান করছিলেন তিনি। এই অবিশ্বাস্য মানসিক দৃঢ়তাই তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে।
মাঠের প্রান্তের এই অবিচল, দূরদর্শী মানুষটির আজ শুভ জন্মদিন। ৩৬ বছরের জমে থাকা দুঃখ ভুলে আনন্দাশ্রু ভাসানো কোটি সমর্থক আজ তার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ।
শুভ জন্মদিন লিওনেল সেবাস্তিয়ান স্কালোনি—আর্জেন্টাইন ফুটবল রূপকথার অবিনশ্বর মহানায়ক!