ক্রীড়া ডেস্ক
নিজ দলের এই ভরাডুবিতে তীব্র হতাশ হতে দেখা যায় মোহাম্মদ সালাহ কে ছবি: গেটি ইমেজেস স্পোর্ট
লিভারপুলের চলতি মৌসুমের গল্পটাকে এক লাইনে এভাবে বলাই যায়— 'যদি ভালো খেলতে না পারো, তবে ভাগ্যের সহায়তা চাও।' কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, অলরেডদের এই দুঃস্বপ্নের মৌসুমে তারা না পেয়েছে ভালো খেলার রসদ, না পেয়েছে ভাগ্যের ছোঁয়া।
চলতি মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে অলরেডদের ১৯টি পরাজয়ের মধ্যে কোনটি সবচেয়ে বড় বিপর্যয়, তা বলা মুশকিল। তবে নিশ্চিতভাবেই, অ্যাস্টন ভিলার বিপক্ষে ৪-২ গোলের ভুলে ভরা এই পরাজয়টি সেই তালিকার একদম ওপরের দিকেই থাকবে। আর্নে স্লটের দলের জন্য এই দৃশ্য এখন বেশ পরিচিত। চলতি মৌসুমে ফুটবলারদের মাথায় হাত দিয়ে হতাশা প্রকাশ করা কিংবা ম্যাচ শেষে নিজেদের মধ্যকার তিক্ত সমালোচনা খুব সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। মাঠের লড়াইয়ে প্রতিপক্ষের তুলনায় লিভারপুলকে অধিকাংশ সময়ই বড্ড অসহায় লেগেছে।
শুক্রবার রাতের ম্যাচটিতে লিভারপুলের সমীকরণ কাগজে-কলমে বেশ সহজ ছিল। জয় পেলেই ইউরোপের সেরা ক্লাব প্রতিযোগিতায় খেলার যোগ্যতা নিশ্চিত হতো তাদের। একই সাথে সমর্থক ও ফুটবলারদের ভুলে যেতে চাওয়া এই দুঃসহ মৌসুম থেকে অন্তত কিছুটা সান্ত্বনা মিলত। কিন্তু তারা সেটি করতে ব্যর্থ হওয়ায় ইউরোপের শীর্ষ মঞ্চে জায়গা পাওয়ার স্বপ্ন এখন সুতোয় ঝুলছে। আগামী সপ্তাহে অ্যানফিল্ডে ব্রেন্টফোর্ডের বিপক্ষে মৌসুমের শেষ ম্যাচেই এখন নির্ধারিত হবে তাদের ভাগ্য।
আসলে খেলার দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ভিলা পার্কের দেওয়ালে লিভারপুলের পরাজয়ের লিখন স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। লিভারপুল যখন ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে, তখন মাঝমাঠে ইউরি তিলেমান্সের শারীরিক শক্তির কাছে পরাস্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন রায়ান গ্রাভেনবার্চ। এই একটি দৃশ্যই স্লটের দলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাকে ফুটিয়ে তোলে। পুরো মৌসুম জুড়েই এই দলকে মানসিক ও শারীরিকভাবে অত্যন্ত ভঙ্গুর দেখিয়েছে।
ম্যাচের প্রথমার্ধে অবশ্য লিভারপুলের খেলাই তুলনামূলক ভালো ছিল। কিন্তু আক্রমণভাগের মূল তারকা আলেকজান্ডার ইসাক চোটের কারণে দলের বাইরে থাকায় এবং মোহামেদ সালাহ পুরোপুরি ফিট না হওয়ায় বদলি বেঞ্চে থাকায়, ভিলার রক্ষণভাগকে কাঁপানোর মতো ধারালো আক্রমণ তারা করতে পারেনি। জানা গেছে, গত মাসে পায়ের হাড় ভেঙে যাওয়ার চোট থেকে ফেরা এই সুইডিশ তারকাকে নিয়ে কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি ক্লাব কর্তৃপক্ষ, তাই তাকে বিশ্রামে রাখা হয়েছিল।
তবুও এই সত্য এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই যে, গত গ্রীষ্মে ১২৫ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করে যে স্ট্রাইকারকে দলে আনা হয়েছিল, তার কাছ থেকে এখনো আশানুরূপ পারফরম্যান্স পায়নি স্লটের দল। অসুস্থতা কাটিয়ে বদলি হিসেবে মাঠে নামা ফ্লোরিয়ান ভির্টজের একটি দুর্বল শট কেবল লিভারপুলের বড় অঙ্কের দলবদলের ব্যর্থতাকেই আরও একবার প্রমাণ করেছে।
ম্যাচের শুরুতে লিভারপুল আধিপত্য বিস্তার করলেও গোল করতে ব্যর্থ হয়। এর খেসারত দিতে হয় প্রথমার্ধের ঠিক আগে, যখন মরগান রজার্সের চমৎকার এক বাঁকানো শট লিভারপুলের জাল খুঁজে নেয়। এই গোলটি ভিলা শিবিরের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়, যারা এর আগ পর্যন্ত আগামী সপ্তাহের ইউরোপীয় প্রতিযোগিতার ফাইনাল নিয়ে কিছুটা অন্যমনস্ক ছিল।
দ্বিতীয়ার্ধের পর অধিনায়ক ভার্জিল ভ্যান ডাইকের হেড থেকে গোল করে সমতায় ফেরে লিভারপুল। তরুন রিও এনগুমোহা’র একটি শট পোস্টে লেগে ফিরে এলে মনে হচ্ছিল লিভারপুলই হয়তো ম্যাচটি নিয়ন্ত্রণে নেবে। কিন্তু এর মাত্র ৭৩ সেকেন্ড পরই দমিনিক সোবোজলাইয়ের এক মারাত্মক ভুলের সুযোগ নিয়ে রজার্স বল বাড়িয়ে দেন ওলি ওয়াটকিন্সের দিকে, যিনি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় বল জালে জড়ান।
সোবোজলাই এই মৌসুমে লিভারপুলের সেরা খেলোয়াড় হলেও, দলের সামগ্রিক বাজে পারফরম্যান্সের ছোঁয়া যেন তাকেও গ্রাস করেছে। এই ধাক্কা থেকে লিভারপুল আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এরপর ওয়াটকিন্স ও জন ম্যাকগিন আরও গোল করে ভিলার জয় নিশ্চিত করেন। শেষ মুহূর্তে ভ্যান ডাইকের আরও একটি গোল কেবল ব্যবধানই কমিয়েছে।
লজ্জার যত রেকর্ড
এই পরাজয় প্রধান কোচ আর্নে স্লটের ঝুলিতে এক গাদা অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড এনে দিয়েছে। গত মৌসুমে দলকে দুর্দান্তভাবে লিভারপুলকে লিগ শিরোপা জেতানো এই কোচ এবং তার ফুটবলাররা যেন হঠাৎ করেই তাদের সেই চেনা জাদু হারিয়ে ফেলেছেন।
• সেট পিস থেকে গোল হজম: চলতি মৌসুমে লিভারপুল সেট পিস থেকে ২০টি গোল হজম করেছে, যা লিগের যেকোনো দলের চেয়ে বেশি।
• শতবর্ষের রেকর্ড: লিগে এখন পর্যন্ত তারা মোট ৫১টি গোল খেয়েছে। ১৯১৪-১৫ মৌসুমের পর ৩৮ ম্যাচের লিগে এটিই লিভারপুলের সবচেয়ে বেশি গোল হজমের রেকর্ড।
• শীর্ষ দলগুলোর বিরুদ্ধে ব্যর্থতা: চলতি মৌসুমে টেবিলের শীর্ষ নয়টি দলের বিপক্ষে তাদের মাঠে খেলা ম্যাচগুলো থেকে সম্ভাব্য ২৪ পয়েন্টের মধ্যে লিভারপুল পেয়েছে মাত্র ১ পয়েন্ট।
• প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়া: স্লটের অধীনে লিগের অ্যাওয়ে ম্যাচে প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়ার পর বাকি সময়ে ম্যাচ জিতে ফেরার ১৪টি চেষ্টার একটিতেও তারা সফল হতে পারেনি।
কোচের আশ্বাস
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে লিভারপুল কোচ বলেন, "আমি বুঝতে পারছি এই মুহূর্তে সমর্থকদের মনে খুব বেশি আত্মবিশ্বাস বা আশা নেই যে আগামী মৌসুমে পরিস্থিতি ভালো হবে। তবে আমার মনে হয়, একটি দলবদলের মৌসুম এবং নতুন করে শুরু করার ক্ষমতাকে তারা ছোট করে দেখছেন।"
তিনি আরও যোগ করেন, "আমরা ভালো করেই জানি কোন কোন জায়গায় উন্নতি করতে হবে। আমার মনে হয় ব্যবধানটা খুব বেশি নয়, কেবল নির্দিষ্ট কিছু মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলেই বড় পরিবর্তন সম্ভব।"
ম্যাচের আগেও স্লট সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, সমর্থকদের ক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও আগামী মৌসুমেও অ্যানফিল্ডের ডাগআউটে থাকার ব্যাপারে তিনি আত্মবিশ্বাসী। ক্লাবের মালিকপক্ষও ডাচ কোচের ওপর আস্থা রাখছে। তবে সমর্থকদের বড় অংশ এই কোচের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন। শুক্রবার রাতে লিভারপুলের খেলোয়াড়রা যখন মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়ছিলেন, তখন ভিলা পার্কের স্পিকারে বাজছিল ইউরোপের শীর্ষ টুর্নামেন্টের আবহসঙ্গীত। বর্তমান পরিস্থিতিতে লিভারপুল আগামী মৌসুমে সেই মঞ্চে আদৌ পৌঁছাতে পারবে কি না, তা নিয়ে খোদ সমর্থকদের মনেই রয়েছে গভীর সংশয়।