ক্রীড়া ডেস্ক
ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে জিদানের সেই ভলি-টি ছবি: উয়েফা অফিসিয়াল
সময়টা ছিল ২০০২ সালের ১৬ মে। স্কটল্যান্ডের ঐতিহাসিক ভূমি গ্লাসগো শহরের হ্যাম্পডেন পার্ক ক্রীড়াশৈলী প্রদর্শনীক্ষেত্রে তখন টানটান উত্তেজনা। ইউরোপীয় ক্লাব শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ের চূড়ান্ত মঞ্চে সেদিন মুখোমুখি হয়েছিল ইতিহাসের অন্যতম সফল দল রিয়াল মাদ্রিদ এবং প্রথমবারের মতো অধরা স্বপ্নপূরণের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা জার্মানির বায়ার লেভারকুসেন।
একদিকে রাউল, ফিগো, কার্লোসের মতো বিশ্বসেরা তারকাদের নিয়ে গড়া মাদ্রিদের এক রাজকীয় দল। অন্যদিকে মাইকেল বালাক, লুসিও, বস্তুর্কদের মতো প্রতিভাবান ও লড়াকু সৈনিকদের নিয়ে গড়া এক অপ্রতিরোধ্য লেভারকুসেন। দুই দলের শক্তিমত্তার লড়াই দেখার জন্য ফুটবলবিশ্ব তখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল।
প্রথমার্ধের নাটকীয়তা ও সমতা
চূড়ান্ত লড়াইয়ের বাঁশি বাজার পর থেকেই মাঠের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে গ্যালারিতে। প্রতিযোগিতার মাত্র ৮ মিনিটের মাথায় চতুরতার সাথে বল ছুঁড়ে মারার (থ্রো-ইন) সুযোগ নিয়ে মাদ্রিদকে এগিয়ে নেন স্প্যানিশ তারকা রাউল। তবে জার্মানির দলটিও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ছিল না। মাত্র ১৪ মিনিটের মাথায় কর্নার থেকে উড়ে আসা বলে মাথা ছুঁইয়ে লেভারকুসেনের পক্ষে সমতা ফিরিয়ে আনেন ব্রাজিলীয় রক্ষণভাগের খেলোয়াড় লুসিও। ১-১ সমতায় খেলা যখন মাঝমাঠের তীব্র লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে, তখনই আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।
ইতিহাসের সেরা সেই জাদুকরী মুহূর্ত
প্রথমার্ধের খেলা শেষের ঠিক আগ মুহূর্ত। বাঁ প্রান্ত দিয়ে রবার্তো কার্লোস লেভারকুসেনের রক্ষণভাগ ভেঙে একটি বল ওপর দিয়ে ভাসিয়ে দেন। বলটি অনেক উঁচুতে উঠে যখন নিচে নামছিল, তখন ডি-বক্সের ঠিক সীমানায় একা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন ফরাসি জাদুকর জিনেদিন জিদান।
সেদিন হয়তো সময় নিজেই থমকে গিয়েছিল। বাতাসে ভাসমান বলটি মাটিতে পড়ার আগেই জিদান তাঁর বাঁ পা দিয়ে এক অবিস্মরণীয় কোণাকুণি শট (ভলি) নেন। বিদ্যুৎ গতিতে বলটি লেভারকুসেনের গোলরক্ষককে পরাস্ত করে জালের ওপরের কোণায় জড়ো হয়। হ্যাম্পডেন পার্কের গ্যালারি তখন উল্লাসের জোয়ারে ফেটে পড়ে। ধারাভাষ্যকাররা বিস্ময়ে চিৎকার করে বলে ওঠেন:
"জিদান, অসাধারণ! জিনেদিন জিদানের শ্বাসরুদ্ধকর এক প্রদর্শনীতে রিয়াল মাদ্রিদ আবার প্রাণ ফিরে পেল।"
ইতিহাসের পাতায় অমরত্ব
পরবর্তীতে সেই লড়াইয়ে ২-১ ব্যবধানে জয়ী হয়ে ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্বের স্মারক নিয়ে মাদ্রিদ শহরে প্রবেশ করেন জিদান ও তাঁর দল। জিদানের এই ঐশ্বরিক পায়ের জাদু লেভারকুসেনকে শিরোপার স্বপ্ন থেকে বঞ্চিত করলেও, ফুটবল বিশ্বকে উপহার দেয় এক অমর কাব্য।
এই অসাধারণ প্রদর্শনীটিকে ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা লক্ষ্যভেদ (গোল) হিসেবে গণ্য করা হয়। জিদান নিজেও পরবর্তী সময়ে স্বীকার করেছেন, এটিই তাঁর খেলোয়াড়ি জীবনের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। আজ থেকে ঠিক ২৪ বছর আগের এই দিনেই ফুটবলের রাজপুত্র জিনেদিন জিদান বিশ্ববাসীকে স্তব্ধ করে দিয়ে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি রচনা করেছিলেন।