ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
পৃথিবীর আদিমতম এবং পবিত্রতম সংগঠন হলো পরিবার। একটি সুন্দর সমাজ ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনের প্রথম পাঠশালা হলো এই পারিবারিক পরিমণ্ডল। কিন্তু আধুনিক সভ্যতার চাকচিক্য আর যান্ত্রিক জীবনধারার প্রবল স্রোতে আজ আমাদের সেই প্রাণের শিকড় ‘পারিবারিক বন্ধন’ ক্রমশ যেন আলগা হয়ে পড়ছে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ এবং আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাবে আমরা একই ছাদের নিচে বাস করেও একে অপরের থেকে যোজন যোজন দূরে সরে যাচ্ছি। মায়া-মমতা আর ত্যাগের যে সুতোয় একটি পরিবার বাধা থাকত, সেখানে আজ জায়গা করে নিয়েছে স্বার্থপরতা আর একাকিত্ব।
পরিবারের এই ভাঙন রোধে এবং হারানো গৌরব ও প্রশান্তি ফিরিয়ে আনতে ইসলামের শাশ্বত বিধান এক অনন্য রক্ষাকবচ। ইসলাম পরিবারকে কেবল একটি সামাজিক চুক্তি হিসেবে দেখে না, বরং এটাকে ইবাদতের অংশ হিসেবে গণ্য করে। মা-বাবার অধিকার, আত্মীয়স্বজনদের পারস্পরিক অধিকার,জীবনসঙ্গীর মর্যাদা এবং সন্তানদের সঠিক লালন-পালনের মধ্য দিয়ে ইসলাম এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ পারিবারিক কাঠামোর রূপরেখা দিয়েছে, যা চৌদ্দশ বছর আগে যেমন প্রাসঙ্গিক ছিল, আজকের এই যান্ত্রিক পৃথিবীতেও তেমনি প্রাসঙ্গিক ও অপরিহার্য।
প্রতি বছর ১৫ মে যখন ‘আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস’ ঘুরে আসে, তখন আমাদের সামনে বড় একটি প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়—আমরা কি আমাদের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থলটিকে পর্যাপ্ত সময় ও গুরুত্ব দিচ্ছি নাকি পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া এবং গুরুত্ব সহকারে বিষয়টিকে বিবেচনা না করার কারণে আমাদের সবচাইতে নিরাপদ আশ্রয়স্থল পরিবার নামক এই জায়গাটি অন্তসারশূন্য হতে চলেছে, পারিবারিক সুসম্পর্ক রক্ষায় আমাদের উদাসীনতা কোনভাবে দায়ী কিনা? ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এক প্রস্তাবে দিবসটি স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে বিশ্বব্যাপী এটি পালিত হয়ে আসছে।
আজকের এই আন্তর্জাতিক পরিবার দিবসে আমাদের গভীরভাবে ভাববার সময় এসেছে—আমরা কি কেবল যান্ত্রিক চাকচিক্য ও আকাশ সংস্কৃতির লাগামহীন উন্নতির পিছে ছুটব, নাকি ইসলামের সুশীতল ছায়া তলে এসে আমাদের হারিয়ে যাওয়া পারিবারিক বন্ধন কে পুনরায় নিরাপদ ও প্রেমময় করে তুলব?
বাঙালির আদি সত্তায় পরিবার
বাঙালি সংস্কৃতির মূল শক্তিই ছিল যৌথ পরিবার। একসময় ‘একান্নবর্তী পরিবার’ ছিল আমাদের গর্ব। দাদাদাদি, চাচা চাচি, ফুপা-ফুপু আর ভাইবোনদের সেই কলকাকলি ভরা ঘরগুলো ছিল একেকটি প্রাণবন্ত পাঠশালা। সেখানে শিশুরা একে অপরে ভাগাভাগি করে নেওয়ার শিক্ষা পেত, বড়রা পেতেন শেষ বয়সের পরম মমতা। বাংলাদেশে পরিবারের এই সংজ্ঞায় রক্ত আর আবেগের টান সবসময়ই ছিল মুখ্য। কিন্তু বিশ্বায়নের হাওয়া এবং যান্ত্রিক সভ্যতার যাতাকলে পিষ্ট হয়ে সেই দৃশ্যপটে এখন ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।
পরিবর্তনের হাওয়া: যৌথ থেকে একক পরিবার
বর্তমানে বাংলাদেশের নগর জীবনে ‘নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি’ বা একক পরিবারের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বিআইডিএস এবং পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অর্থনৈতিক ব্যস্ততা এবং বাসস্থানের সীমাবদ্ধতার কারণে মানুষ এখন ছোট পরিবারের দিকে ঝুঁকছে।
এই পরিবর্তনের ইতিবাচক দিক যেমন আছে, তেমনি নেতিবাচক প্রভাবও কম নয়। একক পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুরা অনেক সময় একাকীত্বে ভোগে। অন্যদিকে, পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যরা হয়ে পড়ছেন পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বোঝা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি একটি নীরব মানবিক বিপর্যয়। যে বাবা-মা সারাজীবন সন্তানদের জন্য জীবনের সবটুকু বিলিয়ে দিলেন, শেষ বয়সে এসে তাদের ‘বৃদ্ধাশ্রম’ নামক কোনো নিঃসঙ্গ আশ্রয়ে ঠাঁই হওয়া আমাদের হাজার বছরের পারিবারিক ঐতিহ্যের সঙ্গে বেমানান।
পরিবার দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য
প্রতি বছর ১৫ ই মে বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস পালিত হয়। ২০২৬ সালের জন্য এই দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বা থিম হলো :
"পরিবার এবং জলবায়ু পরিবর্তন" (Families and Climate Change)
দিবসটির তাৎপর্য
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৯৩ সালে এই দিনটি ঘোষণা করে। এর মূল লক্ষ্যগুলো হলো:
১.পরিবার ব্যবস্থার গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা
২.পরিবারের ওপর প্রভাব ফেলে এমন সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং জনতাত্ত্বিক প্রক্রিয়াগুলো সম্পর্কে ধারণা দেওয়া।
৩.টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনে পরিবারের ভূমিকা তুলে ধরা।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে পরিবারগুলো কীভাবে সচেতনতার মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষায় অবদান রাখতে পারে, বর্তমান সময়ে সেটিই সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুশৃংখল পারিবারিক কাঠামো গঠনে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে চ্যালেঞ্জ সমূহ :
বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সাথে সাথে একক পরিবারের (Nuclear Family) সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। যদিও এতে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা বেশি থাকে, তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বেশ কিছু গুরুতর সমস্যাও দৃশ্যমান হচ্ছে।প্রধান সমস্যাগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. যৌথ পরিবারের পারিবারিক নৈতিক শিক্ষা থেকে শিশুদের বঞ্চিত হওয়া
শহরে বড় হওয়া শিশুরা দাদা-দাদি, নানা-নানি, ফুপা ফুফু ও পাড়া-প্রতিবেশী মুরব্বিদের স্নেহ এবং দিকনির্দেশনা থেকে বঞ্চিত হয়। যৌথ পরিবারে যে নৈতিক শিক্ষা এবং সহমর্মিতার চর্চা হতো, একক পরিবারে তার অভাব অনেক সময় শিশুদের মধ্যে স্বার্থপরতা বা একাকীত্ব তৈরি করে। বিশেষ করেএকক পরিবারে মা-বাবা উভয়েই কর্মজীবী হলে শিশুরা চরম একাকীত্বে ভোগে। চাচা চাচি, ফুফু ফুপা,দাদা-দাদি বা অন্য আত্মীয়দের সঙ্গ না পাওয়ায় তাদের মধ্যে শেয়ারিং (একে অপরের মধ্যে পারস্পরিক ভাগ করে নেওয়া) বা সহমর্মিতার মতো সামাজিক গুণাবলি কম গড়ে ওঠে।
২. প্রবীণদের নিঃসঙ্গতা ও নিরাপত্তাহীনতা
শহরের একক পরিবারে সবচেয়ে বড় অবহেলার শিকার হন বয়স্করা। সন্তানরা আলাদা হয়ে যাওয়ায় বৃদ্ধ মা-বাবা গ্রামে বা শহরের অন্য বাসায় একাকী জীবন যাপন করেন। অসুস্থতা বা জরুরি প্রয়োজনে পাশে কাউকে না পাওয়া এবং শেষ বয়সে এসে চরম মানসিক অবসাদ বা 'বৃদ্ধাশ্রম' সংস্কৃতি আমাদের পারিবারিক কাঠামোর জন্য একটি বড় ক্ষত।
৩. গৃহিণী ও কর্মজীবী মায়েদের ওপর মানসিক চাপ
যৌথ পরিবারে কাজের ভাগাভাগি থাকলেও একক পরিবারে রান্নাবান্না থেকে শুরু করে সন্তান লালন-পালন—সব দায়িত্ব মা-বাবাকেই সামলাতে হয়। বিশেষ করে কর্মজীবী মায়েদের ক্ষেত্রে এই কাজের চাপ (Double Burden) চরম মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তির সৃষ্টি করে, যা অনেক সময় দাম্পত্য কলহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৪. পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষার অভাব
একসময় পরিবারের বড়োরা শিশুদের বিভিন্ন নীতিগল্প বা ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা দিতেন। একক পরিবারে সময়ের অভাবে মা-বাবা অনেক সময় এই দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে পারিবারিক মূল্যবোধ এবং বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের চরম ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।
৫. জরুরি মুহূর্তে সহায়তার অভাব
হঠাৎ কেউ অসুস্থ হলে বা কোনো বিপদ ঘটলে একক পরিবারে সাহায্যের জন্য হাত বাড়ানোর মতো সাধারণত কেউ থাকে না। রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়দের সাথে দূরত্ব তৈরি হওয়ায় মানুষ ধীরে ধীরে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। এতে সামাজিক বন্ধন ও ভ্রাতৃত্ববোধের যে চিরাচরিত বাঙালি ঐতিহ্য, তা ফিকে হয়ে যাচ্ছে।
৬. দাম্পত্য কলহ ও বিচ্ছেদ বৃদ্ধি
একক পরিবারে কোনো ঝগড়া বা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হলে তা মীমাংসা করে দেওয়ার মতো কোনো মুরুব্বি থাকে না। ছোটখাটো মান-অভিমান থেকে শুরু করে বড় কোনো জটিলতা—সবই দম্পতিদের একা সামলাতে হয়। সহনশীলতার অভাব এবং বড়দের হস্তক্ষেপ না থাকায় বর্তমানে শহরাঞ্চলে পারিবারিক অভ্যন্তরীণ কলহ ও বিবাহবিচ্ছেদের হার ও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
৭. সময়ের অভাব ও যান্ত্রিকতা
শহুরে জীবনে কর্মব্যস্ততা এবং দীর্ঘ যাতায়াত বা ট্রাফিক জ্যামের কারণে পরিবারের সদস্যদের একে অপরকে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় থাকে না। দিনশেষে সবাই ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরায় মেজাজ অনেক সময় খিটখিটে থাকে সে কারণে গঠনমূলক আলাপচারিতার চেয়ে বিশ্রামই প্রাধান্য পায়। ফলে একই ছাদের নিচে থেকেও মানসিকভাবে একে অপরের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়।
৮. প্রযুক্তির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার
বর্তমানে "ডিজিটাল আসক্তি" পারিবারিক বন্ধনের অন্যতম আরেকটি বড় বাধা। ডিনার টেবিলে বাবা, মা, স্ত্রী সন্তান সবাই নিজের স্মার্টফোন, ফেসবুক,সোশ্যাল মিডিয়া বা ল্যাপটপে ব্যস্ত থাকে। একে 'Phubbing' (ফোন ব্যবহারের মাধ্যমে পাশের মানুষকে উপেক্ষা করা) বলা হয়, যা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পারিক ভাব বিনিময়ও আবেগের আদান-প্রদান কমিয়ে দেয়।অনেক শিশু স্মার্টফোন বা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা তাদের মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
৯. উচ্চাকাঙ্ক্ষার অর্থনৈতিক চাপ ও প্রতিযোগিতা
শহরের উচ্চ জীবনযাত্রার মান বজায় রাখার মানসিক চাপ দম্পতিদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করে। আর্থিক টানাপোড়েন বা ক্যারিয়ার নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা পরিবারের স্বাভাবিক শান্তি বিঘ্নিত করে।
১০. চিত্তবিনোদনের অভাব
শহরে পর্যাপ্ত উন্মুক্ত মাঠ বা প্রাকৃতিক পরিবেশের অভাব থাকায় পরিবারের সবাই মিলে বাইরে সময় কাটানোর সুযোগ কম। চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি জীবন অনেক সময় বিরক্তি ও খিটখিটে মেজাজের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সংকট নিরসনে আমাদের করণীয়
শহুরে একক পরিবারের এই সংকটগুলো রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়, তবে ব্যক্তি, পরিবার এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিছু সমন্বিত পদক্ষেপ নিলে এই নেতিবাচক প্রভাবগুলো অনেকখানি কমিয়ে আনা সম্ভব।করণীয়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো-
১. 'কোয়ালিটি টাইম' বা গুণগত সময়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া
একক পরিবারে সময়ের অভাবই বড় সমস্যা। তাই মা-বাবা দুজনে কর্মজীবী হলেও দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় (যেমন রাতের খাবার বা ছুটির দিন) স্মার্টফোন ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস থেকে দূরে থেকে সন্তানদের এবং একে অপরকে সময় দেওয়া উচিত। সন্তানদের সাথে গল্পগুজব করা, খুনসুটি করা,তাদের মনের কথা শোনা, একে অপরকে বুঝা ও ঘরের নানা বিধ কাজে তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করানোর মাধ্যমে একটি কোয়ালিটি টাইম বরাদ্দ নিশ্চিত করা দরকার ।
২. প্রবীণদের সাথে নবীনদের সেতুবন্ধন পুনর্নির্মাণ
শহরে থাকলেও নিয়মিত বিরতিতে গ্রামে বা দূরে থাকা মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজনদের কাছে যাওয়া কিংবা তাদের মাঝেমধ্যে শহরে নিজের কাছে এনে রাখা জরুরি। শিশুদের মধ্যে দাদা-দাদি বা নানা-নানির প্রতি ভালোবাসা তৈরি করতে হবে। ভিডিও কলের মাধ্যমে প্রতিদিন অন্তত একবার বড়দের সাথে কথা বলিয়ে দেওয়ার অভ্যাস তৈরি করতে হবে তাতে শিশুদের নৈতিক ও আবেগীয় বিকাশে সাহায্য করবে।
৩. কমিউনিটি লিভিং ও প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক
শহরের ফ্ল্যাট কালচারে পাশের ফ্ল্যাটের মানুষের সাথেও আমাদের অনেক সময় পরিচয় থাকে না। এই যান্ত্রিকতা ভেঙে প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত। বিপদে-আপদে বা উৎসব-পার্বণে প্রতিবেশীরাই হতে পারে আধুনিক একক পরিবারের জন্য 'অঘোষিত আত্মীয়'। আবাসন পর্যায়ে কমন স্পেস বা শিশুদের খেলার জায়গায় সামাজিক মেলামেশা বাড়ানো প্রয়োজন।
৪. ডে-কেয়ার এবং চাইল্ড-কেয়ার সেন্টারের আধুনিকায়ন
যেহেতু একক পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে, তাই সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে মানসম্মত ও নিরাপদ 'ডে-কেয়ার' সেন্টার গড়ে তোলা দরকার। যেখানে শিশুরা কেবল থাকবেই না, বরং সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষা পাবে। কর্মস্থলে ব্রেস্টফিডিং কর্নার এবং চাইল্ড-কেয়ার সুবিধা নিশ্চিত করলে কর্মজীবী মায়েদের মানসিক চাপ অনেকটা কমবে।
৫. মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি গুরুত্ব ও কাউন্সিলিং
দাম্পত্য কলহ বা একাকীত্ব যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের সহায়তা নেওয়াকে সামাজিক ট্যাবুর বাইরে নিয়ে আসতে হবে। পরিবারে ছোটখাটো সমস্যা হলে তা নিজেরা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা এবং সহনশীলতা বাড়ানো প্রয়োজন।
৬. পারিবারিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়ানো
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং পাঠ্যপুস্তকে কেবল জিপিএ-কেন্দ্রিক শিক্ষা নয়, বরং পারিবারিক বন্ধন, বড়দের শ্রদ্ধা করা এবং ত্যাগের মহিমা সংক্রান্ত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সুস্থ পারিবারিক বিনোদন ও মূল্যবোধ প্রচার করা জরুরি।
৭. রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা
বয়স্কদের জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রাষ্ট্র যদি প্রবীণদের জন্য নিরাপদ আবাসন ও বিনোদনের ব্যবস্থা করে, তবে একক পরিবারের কারণে সৃষ্ট তাদের নিঃসঙ্গতা কিছুটা লাঘব হবে।
পারিবারিক বন্ধন সুরক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা
ইসলামী জীবনদর্শনে পারিবারিক বন্ধন রক্ষা করাকে ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়। আধুনিক শহরের একক পরিবারগুলোতে সম্প্রীতি বজায় রাখতে ইসলাম বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর সমাধান নিম্নে দেয়া হলো-
১. 'সিলাহ-রাহিম' বা আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা
ইসলামে আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখাকে ওয়াজিব বা আবশ্যক করা হয়েছে। শহরের ছোট পরিবারে যাতে একাকীত্ব দানা না বাঁধে, সেজন্য দূরে থাকা আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, খোঁজখবর নেওয়া এবং সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের সাহায্য করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এটি পরিবারের গণ্ডিকে মানসিকভাবে বড় করে।
২. পারিবারিক 'শুরা' বা পরামর্শ ভিত্তিক ব্যবস্থা
পরিবারের ছোট-বড় যেকোনো বিষয়ে স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে পারস্পরিক আলোচনার (মাশুয়ারা) মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার শিক্ষা দেয় ইসলাম। এতে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে গুরুত্ব পাওয়ার অনুভূতি তৈরি হয় এবং ব্যক্তিত্বের সংঘাত কমে।
৩. একে অপরের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা
ইসলামে শুধু নিজের অধিকার নয়, বরং অন্যের অধিকার আদায়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্বামীর প্রতি স্ত্রীর ও স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব,একে অপরের প্রতি দয়া, ভালোবাসা (মাওয়াদ্দাহ) ও রহমত বজায় রাখা।
সন্তানের প্রতি বাবা মা'র দায়িত্ব,সন্তানদের সময় দেওয়া এবং তাদের নৈতিক ও দ্বীনি শিক্ষা নিশ্চিত করা।
বাবা মা'র প্রতি সন্তানের দায়িত্ব,বৃদ্ধ বয়সে বা কোন বয়সে, যেকোনো প্রয়োজনে তাদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান ও ধৈর্য প্রদর্শন।
৪. জামাতে ইবাদত ও দ্বীনি পরিবেশ
শহুরে যান্ত্রিকতা দূর করতে পরিবারের সবাই মিলে অন্তত এক ওয়াক্ত নামাজ জামাতে পড়া বা নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত ও হাদিস পাঠের আসর করা যেতে পারে। এটি ঘরে প্রশান্তি (সাকিনাহ) নিয়ে আসে এবং সদস্যদের মধ্যে আধ্যাত্মিক বন্ধন তৈরি করে।
৫. পর্দার বিধান ও দৃষ্টির হেফাজত
পরিবারের শান্তি রক্ষায় পর্দা এবং হায়া (লজ্জাশীলতা) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাইরের অনাকাঙ্ক্ষিত সম্পর্ক থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা এবং পরিবারের ভেতরে শালীনতা বজায় রাখা পারস্পরিক বিশ্বাস ও বিশ্বস্ততা বৃদ্ধি করে।
৬. ক্ষমা ও ধৈর্য (সবর)
একক পরিবারে ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি থেকে বড় অশান্তি হতে পারে। ইসলাম শেখায়—মানুষ মাত্রই ভুল করে, তাই একে অপরের ভুলগুলোকে ক্ষমা করা এবং কঠিন সময়ে ধৈর্য ধারণ করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।"
৭. হালাল রিজিক ও অল্পে তুষ্টি (কানাআত)
শহুরে জীবনের অধিকাংশ মানসিক চাপ আসে অতিরিক্ত বিলাসিতা ও প্রতিযোগিতার আকাঙ্ক্ষা থেকে। ইসলাম 'হালাল রিজিক' উপার্জন এবং যা আছে তাতে সন্তুষ্ট থাকার শিক্ষা দেয়। এর ফলে পরিবারের ওপর থেকে মানসিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা কমে যায়।
পরিশেষে বলা যায়, পরিবার কেবল একটি সামাজিক একক নয়, বরং এটি মানুষ গড়ার প্রাথমিক বিদ্যাপীঠ। বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে বর্তমানে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ এবং প্রযুক্তির অপব্যবহারে আমাদের পারিবারিক কাঠামো যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, তার সর্বোত্তম সমাধান নিহিত রয়েছে ইসলামী জীবনদর্শনে। ইসলাম পরিবারকে কেবল বৈষয়িক সম্পর্কের ঊর্ধ্বে তুলে একে একটি পবিত্র ইবাদত হিসেবে গণ্য করেছে। যদি পরিবারের প্রতিটি সদস্য—পিতা-মাতা, সন্তান এবং আত্মীয়-স্বজন—পরস্পরের প্রতি অর্পিত অধিকার ও দায়িত্ব পালনে সচেতন হন এবং মহানবী (সা.)-এর প্রদর্শিত ভালোবাসাময় পারিবারিক নীতি অনুসরণ করেন, তবেই আমাদের সমাজ কলুষতামুক্ত হবে। আন্তর্জাতিক পরিবার দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—পারিবারিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং ইসলামী নীতিমালার আলোকে প্রতিটি ঘরকে শান্তি ও নিরাপত্তার নীড় হিসেবে গড়ে তোলা। কারণ একটি সুরক্ষিত পরিবারই পারে একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র উপহার দিতে।
লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা