ধ্রুব ডেস্ক
সাতক্ষীরার মাদুর ছবি: সংগৃহীত
বিলুপ্তির পথে সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী পরিবেশবান্ধব মাদুর শিল্প। ন্যায্য দাম না পাওয়া এবং আধুনিক প্লাস্টিক পণ্যের দাপটে এ পেশা থেকে সরে আসছেন অনেকেই। তবে অনেকে আবার পিতৃপুরুষের ঐতিহ্য ধরে রাখতে এখনো এ শিল্পে জড়িয়ে আছেন। সংশ্লিষ্ট ও কারিগররা মনে করেন, জেলার ঐতিহ্যবাহী এই পরিবেশবান্ধব শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে জরুরি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।
এককালে সাতক্ষীরা জেলা মাদুর শিল্পের জন্য দেশজুড়ে বিখ্যাত ছিল। জেলার আশাশুনি উপজেলার বড়দল, কুল্যা ও কাদাকাটি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ‘মেলে ঘাস’ জন্মাতো, যা মাদুর তৈরির প্রধান কাঁচামাল। তখন স্থানীয় লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা নির্বাহ হতো এ শিল্প থেকে। দক্ষিণ খুলনার এক সময়ের বৃহত্তম হাট বড়দলে প্রচুর মাদুর পাইকারি বিক্রি হতো। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা এসে এই হাট এবং বুধহাটা হাট থেকে মাদুরসহ বিভিন্ন সওদা করে নিয়ে যেতেন। প্রতি রোববার বড়দল হাটে এবং শুক্রবার ও সোমবার বুধহাটা হাটে বসতো মাদুরের বিশাল বাজার। উপজেলার কারিগররা প্রতি সপ্তাহে তাদের তৈরি মাদুর এনে পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করতেন, যা চলে যেতো খুলনা, যশোরসহ আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায়। তবে এখন আর আগের মতো এসব হাটে মাদুর বিক্রি হয় না।
বর্তমানে খাটের ওপর তোষক, বিছানার চাদর ও প্লাস্টিকের মাদুরের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় এই কুটির শিল্পের কদর আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এখন কেবল আশাশুনি ও তালা উপজেলার প্রায় তিন শতাধিক পরিবারের মানুষ পারিবারিক ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে মাদুর বোনার কাজ ধরে রেখেছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে নারীদের অবদানই সবচেয়ে বেশি। চাকচিক্য কম হলেও মেলে ঘাসের মাদুর সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত।
আশাশুনি উপজেলার বড়দল গ্রামের প্রবীণ মাদুর কারিগর সুধীর মন্ডল জানান, এই মাদুর বিক্রি করে তিনি সংসার চালান ও ছেলের লেখাপড়ার খরচ জোগান। তবে বাইরে থেকে কৃত্রিম মাদুর আসায় এখন আগের চেয়ে দাম অনেক কম মিলছে। তিনি বলেন, একটা ছোট আকারের মাদুর তৈরি করতে খরচ হয় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, যা বিক্রি হয় ৩০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩৫০ টাকায়। আর বড় সাইজের মাদুর তৈরি করতে খরচ পড়ে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা, যা বিক্রি হয় ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকায়। এই সীমিত লাভে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ওপর এখন মেলে ঘাস বাকিতে কিনতে হয় এবং আগের মতো পাতি উৎপাদনও হয় না। সুধীর মন্ডলের স্ত্রী সরলা রাণী মন্ডল জানান, সংসারের কাজের পাশাপাশি তিনি স্বামীকে সহযোগিতা করলেও এই পেশা দিয়ে বর্তমান বাজারে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
কচুয়া গ্রামের মাদুর ব্যবসায়ী লুৎফর মোড়ল জানান, তিনি বড়দল, খাজরা, বাইনতলাসহ বিভিন্ন বাজার থেকে পাইকারি মাদুর কিনে সাতক্ষীরা, পাটকেলঘাটা ও খুলনায় বিক্রি করেন। বাজারে এখন মাদুরের আগের মতো চাহিদা নেই এবং লাভও একদম কমে গেছে।
ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে বিসিক শিল্পনগরী সাতক্ষীরার উপ-ব্যবস্থাপক গৌরব দাস বলেন, বিসিক সাধারণত ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজ করে। সাতক্ষীরার মাদুর শিল্পটি এক সময়ে অত্যন্ত নামকরা ছিল। এই শিল্পকে আরও কীভাবে আধুনিকায়ন করা যায়, সেজন্য কারিগরদের প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সাথে মাদুর শিল্পের বাজার আরও কীভাবে সম্প্রসারণ করা যায়, সে ব্যাপারেও বিসিক কাজ করছে।