ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন ছবি: সংগৃহীত
১৫ই সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। ২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী ‘জুলাই বিপ্লব’ এবং ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব অভ্যুত্থান বাংলাদেশকে এমন এক ঐতিহাসিক মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে দাঁড়িয়ে গণতন্ত্রের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পুনর্মূল্যায়ন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। আজ আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসে আমাদের আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের গণতান্ত্রিক চেতনা, পরবর্তী সময়ে তার বিচ্যুতি এবং জুলাই বিপ্লব-উত্তর নতুন বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা।
১৯৭২-এর সাংবিধানিক গণতন্ত্র : স্বপ্ন ও প্রাথমিক রূপরেখা
১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান চেতনা ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার—যার মূল ভিত্তি ছিল গণতন্ত্র। স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে। তৎকালীন বাস্তবতায় একটি কার্যকর সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, মৌলিক অধিকারের জামানত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, জনগণের সার্বভৌমত্ব এবং অবাধ নির্বাচনের রূপরেখা ৭২-এর সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
৭২-এর সংবিধান ছিল বাঙালি জাতির রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। এতে স্পষ্ট বলা হয়েছিল—জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। এটি ছিল একদলীয় বা স্বৈরাচারী শাসনের সম্পূর্ণ বিপরীতে দাঁড়িয়ে একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার অঙ্গীকার। তবে এই সংবিধানের বাস্তবায়ন ও পরবর্তী রূপান্তর প্রক্রিয়া থেকেই তৈরি হয় নানা দ্বন্দ্ব ও বিতর্ক।
সাংবিধানিক চেতনার বিচ্যুতি ও গণতন্ত্রের সংকট
৭২-এর সংবিধান একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করলেও, দ্রুতই তা দলীয় স্বার্থ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার চর্চায় পরিবর্তিত হতে শুরু করে। সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর হাতে একক ও অপরিসীম ক্ষমতা অর্পণ, বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের প্রভাব এবং দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে সংসদ সদস্যদের ভোটদানের বাধ্যবাধকতা (৭০ অনুচ্ছেদ) গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশকে ব্যাহত করে।
পরবর্তীকালে বিভিন্ন রাজনৈতিক পর্বে সংবিধানে আনা একাধিক সংশোধনী গণতন্ত্রকে আরও দুর্বল করে তোলে। বিশেষ করে পঞ্চদশ ও ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা হয়, যা ক্ষমতাকে একটি নির্দিষ্ট দলের হাতে চিরস্থায়ী করার সুযোগ সৃষ্টি করে। বিগত দেড় দশকে আমরা দেখেছি কীভাবে গণতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র ‘নির্বাচন ব্যবস্থা’ সম্পূর্ণ ভেঙে তছনছ হয়ে গিয়েছিলো। ভোটাধিকার হরণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন, বিচার বিভাগ ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর দলীয় নিয়ন্ত্রণ এবং বিরোধী মতকে স্তব্ধ করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি এক ভয়াবহ স্বৈরাচারী ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছিল। 'জনগণই ক্ষমতার উৎস'—এই সাংবিধানিক মূলনীতি একেবারেই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল।
আরও পড়ুন-
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুবছর পূর্তি : রক্তে লেখা ইতিহাসের দায়
জুলাই বিপ্লব : গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের গণজাগরণ
স্বৈরাচার, দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয় ২০২৪ সালের জুলাই মাসে। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যেই একটি সর্বাত্মক গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। রাষ্ট্রযন্ত্রের চরম নির্যাতন ও অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ে ছাত্র-জনতা এক ঐতিহাসিক বিজয় ছিনিয়ে আনে।
এই জুলাই বিপ্লব কেবল একটি সরকার পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল মূলত ভেঙে পড়া রাষ্ট্রব্যবস্থাকে মেরামতের একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণদাবি। এটি প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ ও সাধারণ মানুষ ভোটাধিকারহীন, স্বৈরাচারী এবং অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতাকাঠামোকে আর সহ্য করতে প্রস্তুত নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের রক্তের কোনো বিরোধ নেই; বরং জুলাই বিপ্লব হলো মুক্তিযুদ্ধের সেই অসমাপ্ত গণতান্ত্রিক স্বপ্নকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা।
জুলাই বিপ্লব পরবর্তী আমাদের প্রত্যাশা
আজকের আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসে বাংলাদেশ যখন এক নতুন ভোরের মুখোমুখি, তখন আমাদের প্রত্যাশার পরিধি অত্যন্ত স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট। চাটুকারিতা বা কেবল ক্ষমতার রদবদল নয়, আমাদের মূল দাবি—রাষ্ট্রের আমূল সংস্কার।
১. সর্বগ্রাসী ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা (সাংবিধানিক সংস্কার) : একটি টেকসই গণতন্ত্রের জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় সঠিক ভারসাম্য (Checks and Balances) থাকা অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রীর একক ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা হ্রাস করা, নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করা এবং ৭০ অনুচ্ছেদের সংস্কার করে সংসদে মুক্ত আলোচনার সুযোগ তৈরি করা এখন সময়ের মূল দাবি। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা প্রবর্তন বা রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে সামঞ্জস্য আনা নিয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
২. নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা : গণতন্ত্রের মূল শর্ত হলো জনগণের অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে ভোট দেওয়ার অধিকার। নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), মানবাধিকার কমিশন এবং পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মতো মূল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। কোনো দলীয় সরকারের অধীনে যেন আর কখনোই প্রহসনের নির্বাচন হতে না পারে, তার স্থায়ী আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
৩. আইনি শাসন ও মানবধিকারের নিশ্চয়তা : ডিজিটাল বা সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো সকল বাক-স্বাধীনতাবিরোধী কালো আইন চিরতরে বাতিল করতে হবে। বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের সংস্কৃতি বন্ধ করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে প্রতিটি নাগরিক দল-মত নির্বিশেষে সমান বিচার পাবে।
৪. অন্তর্ভুক্তিমূলক ও তরুণবান্ধব রাজনীতি : জুলাই বিপ্লবের মূল প্রেরণা ছিল তরুণ সমাজ। তাই রাজনীতিকে কেবল প্রবীণ ও নির্দিষ্ট কিছু পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তরুণদের মেধা, নতুন চিন্তা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সুযোগ দিতে হবে। শিক্ষাঙ্গনে সুস্থ ও লেজুড়বৃত্তিহীন ছাত্ররাজনীতির চর্চা নিশ্চিত করতে হবে।
৫. দুর্নীতি প্রতিরোধ ও স্বচ্ছতা : গণতন্ত্রের অন্যতম শত্রু হলো অনিয়ন্ত্রিত দুর্নীতি ও অর্থ পাচার। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
উপসংহার
৭২-এর সংবিধান আমাদের একটি রাষ্ট্র কাঠামোর স্বপ্ন দেখিয়েছিল, আর ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার নতুন সুযোগ ও দায়িত্ব আমাদের কাঁধে তুলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসে আমাদের দৃপ্ত অঙ্গীকার হওয়া উচিত—আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়ে তুলব, যেখানে গণতন্ত্র কেবল একটি শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা হবে দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রতীক। রক্তে অর্জিত এই দ্বিতীয় সুযোগকে হেলায় হারাতে দেওয়া যাবে না; নতুন বাংলাদেশের নির্মাণে বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠাই হোক আমাদের একমাত্র লক্ষ্য।
লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা
*মতামত লেখকের নিজস্ব