আবদুর রহমান সোহাগ
আবদুর রহমান সোহাগ ছবি: এ আই প্রণীত
ছাত্র রাজনীতি থেকে আমার উত্থান। ২০০৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এম এম কলেজে ছাত্রশিবিরের সাথে যুক্ত ছিলাম। ২০১৯ সাল পর্যন্ত সংগঠনটির শহর শাখায় যুক্ত থেকে রাজনীতি করেছি। বলতে দ্বিধা নেই, সেই দিনগুলোতে শিবির ছিল অচ্ছুৎ ! আমরা ছিলাম ভুক্তভোগী।
কেউ শিবির করলে তাকে মারপিট করে রক্তাক্ত করা, ক্যাম্পাস-হল থেকে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে বের করে দেওয়া, পুলিশি গ্রেফতার টর্চার, গুম, ক্রসফায়ার, চাঁদাবাজি সবকিছুই ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে জায়েজই শুধু নয় সেটা ছিল একপ্রকার অবশ্যিক কর্তব্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির ছিল আরও বেশি অচ্ছুৎ, অঘোষিত নিষিদ্ধ সংগঠন। দাড়ি, টুপি কিংবা টাখনুর ওপরে প্যান্ট পরলেই সন্দেহের তালিকায় রাখা হতো।ওখানে রাম বাম আর নাস্তিকদের জয়জয়কার। এমনই অবস্থা ছিল আমার ক্যাম্পাস জীবনের সোনালি সময়টাই। পুরোটা সময় চলে গেছে একটা ট্রমার ভিতরে। এম এম কলেজে তো আমাদের শিবিরের সাথী মর্যাদার দুই ভাই হাবিবুল্লাহ আর কামরুল হাসানকে দিনে দুপুরের খানা খাওয়া অবস্থায় তুলে নিয়ে গিয়ে কলেজের আসাদ হলে পিটিয়ে হত্যা করে। পার্শ্ববর্তী ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে তো যাকে ধরে নিয়ে যায় পরবর্তীতে নর্দমায় তার লাশ পাওয়া যায়। এর মধ্যে আমার পরিচিত ভাই পারভেজ, জহুরুল , আবু যর গিফারী, মহিউদ্দীন সোহানসহ আরও অনেকে। কী যে ছিল সেদিনের বিভীষিকাময় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের অন্ধকার দিনগুলো!
যা হোক একটা সময় পর হাসিনা যখন লজ্জাজনকভাবে পালিয়ে প্রভুভক্ত ভৃত্যের মতই মোদীর আশ্রয়ে চলে গেল; তখন ছাত্রশিবিরের সুযোগ আসে প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের সর্বোচ্চ মেধাধী শিক্ষার্থীদের কাছে নিজেদেরকে উপস্থাপন করার। কাদের নেতৃত্বে চলতে চায় তারা, কাদেরকে সমর্থন করে জাতির সামনে এলো পরীক্ষা করার সুযোগ। ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ছিল ঐতিহাসিক ডাকসু নির্বাচনের সেই দিন।
আমার স্ত্রী তখন বেগম রোকেয়া হলের আবাসিক ছাত্রী, আমার মেয়ের বয়স তখন মাত্র ৫ মাস ৯ দিন। সে যশোরে অবস্থান করছে।ডাকসু নির্বাচন-প্রগতিশীলদের সাথে অচ্ছুতের লড়াই। ১৭ বছরে যারা হত্যাযোগ্য ছিল। যাদেরকে গণশত্রু হিসেবে ফ্যাসিস্টের সকল মিডিয়া এবং সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীগুলো প্রোপাগাণ্ডা ছড়াত, হলে হলে যাদের হত্যা করার জন্য খুঁজে বেড়াত তাদের নিয়ে এই প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গী কী, জাতির সামনে তার প্রমাণে ইতিহাসের সেরা সুযোগ পেয়েছে শিবির। আমার স্ত্রীর এতোদূর থেকে ভোট দিতে যেতে অনেক কষ্ট হবে, আমারও অফিস মিস করা লাগবে, এদিকে প্রচণ্ড গরমে ৫ মাসের দুধের বাচ্চাকে নিয়ে শুধু ১ টা ভোট দিতে যাওয়া আবার আসা, সাথে ২ জনের যাতায়াতে খরচেরও একটা ব্যাপার আছে। সব মিলিয়ে অনেক প্রতিবন্ধকতা।
হাজারো নির্যাতিত মজলুমের সংগঠন ছাত্রশিবির। এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিলাম শিবিরের সম্মান রক্ষার্থে আর ইতিহাসের অংশ হতে এতটুকু ত্যাগ স্বীকার করতেই হবে। নির্বাচনের দিন সকালে আমরা যশোর থেকে বাসে ঢাকায় যায়। ক্যাম্পাস এরিয়ায় প্রবেশাধিকার সীমিত, রিক্সা চলছে না। আমি বহিরাগত তাই নিষিদ্ধ। দুধের বাচ্চা সাথে আছে, সুতরাং ক্যাম্পাসে প্রবেশের অনুমতি পেলাম। ভোট দেওয়ার জন্য এত গরমে বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে হেঁটে গিয়ে প্রথমে হলে, তারপর ক্যাম্পাসে গিয়েছিলাম।

ঢাবি ক্যাম্পাসে মায়ের কোলে লেখকের আত্মজা জান্নাতুল ফেরদৌস জান্নাত
২.
কাজ শেষে ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে দুপুর ১ টার পরে বাসস্ট্যান্ডে এসে জানলাম ধর্মঘট চলছে বিকাল ৪ টার আগে কোনো গাড়ি যাবে না। এদিকে তীব্র গরম, প্রচণ্ড জ্যাম ঠিকমত বসার জায়গা নেই। ৪/৫ ঘণ্টা এভাবে অপেক্ষার পর ৫ টার দিকে রওনা হয়ে ফরিদপুরে এসে আবার স্থানীয় এক গণ্ডগোলে গাড়ি বন্ধ প্রায় ১ ঘন্টার বেশি । রাত ১১ টার পরে যশোরে পৌঁছায়। সকাল থেকে ১২ ঘন্টা বাস জার্নি। শরীরটা ক্লান্ত, অনেক কষ্ট হয়েছে আমাদের। সাথে সেক্রিফাইস করেছিল মেয়েটাও।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল দেশের সর্বোচ্চ মেধাবীরা ভুল সিদ্ধান্ত নেবে না। বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে ছাত্রশিবিরের প্যানেল। হয়েছিলও তাই। ডাকসু সফলতার সাথে ১ বছর মেয়াদ পূর্ণ করছে। ৩৫ লক্ষ টাকার বাজেট পেয়ে ৪০ কোটি টাকার কাজ করেছে ডাকসু।আমাদের পরিশ্রমও সার্থক হয়েছে,আলহামদুলিল্লাহ। অচ্ছুৎ শিবির এখন সবচেয়ে গ্লোরিয়াস। জানি দেশের কোথাও সহজে আর ছাত্র সংসদ নির্বাচন হবে না। কারণ মেধাবীরা ভুল করবে না। বার বার বিজয়ী হবে শিবির।
আমি শুধু ওদের কথা চিন্তা করি। ওরা কি ব্লেমিং দেয়নি শিবিরকে রগ কাটা, জঙ্গী, ধর্মান্ধ, উগ্র-সাম্প্রদায়িক, নারী বিদ্বেষী, সন্ত্রাসী ইত্যাদি ইত্যাদি। তথাকথিত প্রগতিশীলরা এখন কেমন বোধ করছে? এখন ওদের জবাব কী? ওদের এখন অনুভূতি কী? ওরা যদি মানুষের পর্যায়ে থাকতো তাহলে অনুতপ্ত হতো, ক্ষমা চাইত শিবিরের কাছে। কিন্তু ওদের মানবিকতা কি জাগ্রত হয়েছে? ওদের কি আদৌ কোনো মানবিকতা আছে! ডাকসুতে বিজয় ছিল হাজারো ত্যাগ, আহত, পঙ্গুত্ব বরণকারী আর শহীদের পিতা-মাতার রাত জাগা অশ্রুর প্রতিদান। ডাকসু ছিল হাজারো নির্যাতিত নিপীড়িত বনি আদমের দুয়ার ফসল। ডাকসুতে মিশে আছে আমাদের মতো এমন হাজারো আবেগের সংমিশ্রণ। এই ধারা অব্যাহত থাকুক।
লেখক: আইনজীবী। ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ সদস্য ও বাংলাদেশ ল'ইয়ার্স কাউন্সিল, যশোরের সাংগঠনিক সম্পাদক ।