বজলুর রহমান
একটি সরকার যখন ফ্যাসিস্ট বা স্বৈরাচারী রূপ নেয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই সেই প্রভাব পুরো রাষ্ট্রের কাঠামোর ওপর পড়ে। ফ্যাসিবাদ মূলত চরম জাতীয়তাবাদ, একনায়কতন্ত্র এবং ভিন্নমত দমনের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকে। এর ফলে রাষ্ট্রে নানামুখী ও দীর্ঘমেয়াদী সংকটের সৃষ্টি হয়। যেমন-
মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ
ভিন্নমত দমন: বাকস্বাধীনতা পুরোপুরি স্তব্ধ করে দেওয়া হয়। গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ নাগরিকদের সরকারের সমালোচনা করার অধিকার থাকে না।
বিরোধী দল নির্মূল: কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা ভিন্ন আদর্শের অস্তিত্ব সহ্য করা হয় না। বিরোধী নেতাকর্মীদের ওপর জেল, জুলুম, গুম ও নির্যাতন নেমে আসে।
আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের পতন
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নষ্ট: আদালত ও বিচারিক প্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। বিচার বিভাগকে সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
আইনের স্বেচ্ছাচারী প্রয়োগ: সাধারণ নাগরিকদের জন্য এক নিয়ম আর শাসকগোষ্ঠীর অনুসারীদের জন্য অন্য নিয়ম তৈরি হয়। বিনা বিচারে আটক বা শাস্তি দেওয়া নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণ: পুলিশ, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের জনগণের সেবা করার চেয়ে স্বৈরশাসকের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বেশি ব্যস্ত থাকে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর পেশাদারিত্ব ও জনআস্থা ভেঙে পড়ে।
অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও বৈষম্য
ক্রোনি ক্যাপিটালিজম (স্বজনতোষী পুঁজিবাজর): সাধারণ জনগণের চেয়ে শাসকের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেট একচেটিয়া সুবিধা পায়। ফলে দুর্নীতি ও অর্থ পাচার চরম আকার ধারণ করে।
অর্থনৈতিক অস্থিরতা: জবাবদিহিতা না থাকায় ভুল অর্থনৈতিক নীতি এবং মেগা প্রজেক্টের নামে বিপুল অপচয় হয়, যা সাধারণ মানুষকে চরম মূল্যস্ফীতি ও ঋণের বোঝায় ফেলে দেয়।
সামাজিক বিভাজন ও ভয়ভীতি
কৃত্রিম শত্রু তৈরি: ফ্যাসিস্ট শাসকেরা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে প্রায়ই সমাজে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, সংখ্যালঘু বা ভিন্ন মতাদর্শের মানুষকে 'রাষ্ট্রের শত্রু' হিসেবে দাঁড় করায়। এতে সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট হয়।
ভয়ের সংস্কৃতি: সমাজে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয় যেখানে কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। সরকারের গোয়েন্দা নজরদারি এবং সাধারণ মানুষের মনে তৈরি হওয়া ভয় সমাজকে স্থবির করে দেয়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একাকীত্ব
স্যাঙ্কশন ও কূটনৈতিক চাপ: মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের কারণে আন্তর্জাতিক মহলে রাষ্ট্রটি বন্ধুহীন হয়ে পড়ে। বিভিন্ন দেশ বা আন্তর্জাতিক সংস্থা নিষেধাজ্ঞা (Sanctions) আরোপ করতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বৈদেশিক বিনিয়োগে।
একটি ফ্যাসিস্ট সরকার সাময়িকভাবে কড়া শাসনের মাধ্যমে 'স্থিতিশীলতা' বা 'উন্নয়নের' প্রচার চালালেও, দীর্ঘমেয়াদে তা রাষ্ট্রের ভেতরের কাঠামোকে পুরোপুরি নড়বড়ে করে দেয়। জবাবদিহিতাহীন এই ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে একটি গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের দিকে ঠেলে দেয়।
বিগত দেড় দশকের আওয়ামী লীগ শাসনামলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো, অর্থনীতি এবং সমাজব্যবস্থায় যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা সম্প্রতি দেশের শ্বেতপত্র কমিটি এবং বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সংস্থার প্রতিবেদনে গাণিতিক পরিসংখ্যানসহ উঠে এসেছে। এই দীর্ঘ সময়ে একটি ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থা যে সংকটের সৃষ্টি করেছিল, তার প্রধান খাত ও গাণিতিক পরিসংখ্যান হলো-
ভয়াবহ অর্থ পাচার (Economic Laundering)
ফ্যাসিস্ট সরকারের সবচেয়ে বড় আঘাত ছিল দেশের অর্থনীতির ওপর। জবাবদিহিতাহীন ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
সরকারি শ্বেতপত্র এবং অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার (২৩৪ বিলিয়ন ডলার) বিদেশে পাচার হয়েছে।
বর্তমান বাজারদরে এর পরিমাণ প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা।
এই হিসাবে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা অবৈধভাবে দেশের বাইরে চলে গেছে।
আরও পড়ুন-
আদ-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল: সিদ্ধান্ত কি আত্মঘাতী ও আবেগতাড়িত ?
ব্যাংকিং খাতের লুটপাট ও খেলাপি ঋণ
রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া এবং ভুয়া ও বেনামী ঋণের মাধ্যমে দেশের ব্যাংকিং খাতকে প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
শ্বেতপত্র কমিটির তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র ব্যাংক ও ব্যবসায়িক খাত মিলিয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও লুটের পরিমাণ প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার। হুন্ডি ও ভুয়া এলসির (Letter of Credit) মাধ্যমে দেশের রিজার্ভ খালি করে দেওয়া হয়, যার ফলে ২০২৪ সালের মাঝামাঝিতে দেশের ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মেগা দুর্নীতি (Capacity Charges)
"বিশেষ আইন" (ইনডেমনিটি) তৈরি করে টেন্ডার ছাড়াই আওয়ামী লীগ সরকার তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইসেন্স দেয়।
কেন্দ্র চালু না রেখেও শুধু বসে থাকার জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বিগত ১৫ বছরে প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা 'ক্যাপাসিটি চার্জ' (Capacity Charge) বা ভর্তুকি হিসেবে দেওয়া হয়েছে।
এর ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বকেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে বিদ্যুৎ খাতের (BPDB) বকেয়া প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা এবং গ্যাস খাতের (Petrobangla) বকেয়া প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা।
মেগা প্রজেক্টের নামে অর্থ আত্মসাৎ ও ব্যয় বৃদ্ধি
যেকোনো বড় প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় কৃত্রিমভাবে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেখিয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় ও লুটপাট করা হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রাথমিক প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা, যা শেষ পর্যন্ত ৩২ হাজার কোটি টাকার উপরে গিয়ে ঠেকে। একইভাবে দেশের সোয়া ২ লাখ কোটি টাকার ৭টি বড় মেগা প্রকল্পের ব্যয় এবং বাস্তবায়ন নিয়ে বর্তমানে গভীর আর্থিক পর্যালোচনা চলছে, কারণ এই প্রকল্পগুলোর জন্য নেওয়া বিশাল বৈদেশিক ঋণ ২০২৭ সাল থেকে পরিশোধ করতে হবে।
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
ভিন্নমত দমনে রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে দলীয় ক্যাডার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, যা সমাজের মধ্যে একটি তীব্র 'ভয়ের সংস্কৃতি' তৈরি করে।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর (যেমন- আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ) তথ্যমতে, এই শাসনামলে ৬০০ জনেরও বেশি মানুষ বলপ্রয়োগপূর্বক গুমের শিকার হয়েছেন, যাদের অনেকের হদিস আজও মেলেনি। এছাড়া বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন হাজারেরও বেশি মানুষ।
একটি ফ্যাসিস্ট কাঠামো কীভাবে পুরো রাষ্ট্রকে ফাঁপা করে দেয়, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ এই গাণিতিক পরিসংখ্যানগুলো। মেগা প্রজেক্টের নামে মেগা ঋণ নেওয়া হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের করের টাকায় পরিশোধ করতে হচ্ছে, অথচ সেই ঋণের সিংহভাগই দুর্নীতি ও পাচারের মাধ্যমে দেশের বাইরে চলে গেছে।
২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে সংঘটিত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক রক্তাক্ত অধ্যায়।
আরও পড়ুন-
তুমি হেরে যাওনি, হেরে গেছে বাংলাদেশ !
আন্দোলন দমনের জন্য সে সময় পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির পাশাপাশি তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠন (বিশেষ করে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ)-কে রাস্তায় নামানো হয়েছিল। তারা সাধারণ শিক্ষার্থী ও নাগরিকদের ওপর নির্বিচারে বুলেট, ছররা গুলি এবং সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে হত্যা করে 2000 এর অধিক মানুষকে। পাশাপাশি হাজার হাজার তরুণ ও কর্মক্ষম মানুষকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে, যা রাষ্ট্র ও তাদের পরিবারের জন্য এক দীর্ঘমেয়াদী বেদনার কারণ।
বিগত দেড় দশকে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোর ক্যাম্পাসগুলোকে এক প্রকার টর্চার সেলে পরিণত করা হয়েছিল। সাধারণ শিক্ষার্থীদের হলগুলোতে সিট পেতে বা টিকে থাকতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন 'ছাত্রলীগ'-এর মিছিলে যেতে বাধ্য করা হতো।
ক্যাম্পাসে কোনো ভিন্নমত বা অধিকারের কথা বললেই 'গেস্টরুম নির্যাতন' বা 'শিবির' ট্যাগ দিয়ে মারধর করা হতো। আবরার ফাহাদের মতো মেধাবী শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ছিল এই ক্যাম্পাস সন্ত্রাসের সবচেয়ে নৃশংস রূপ। জুলাই আন্দোলনেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর রড, লাঠি ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো হয়েছিল, যার ফলে শত শত শিক্ষার্থী রক্তাক্ত হন।
দেশজুড়ে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও 'হেলমেট বাহিনী'
ফ্যাসিস্ট সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত এক বিশাল চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল। ব্যবসা-বাণিজ্য, ফুটপাত, পরিবহন খাত থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জমি দখল পর্যন্ত সব জায়গায় দলীয় ক্যাডারদের রাজত্ব ছিল।
আন্দোলন চলাকালে সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে দমন করতে সাধারণ পোশাকে মাথায় হেলমেট পরে অস্ত্রধারী ক্যাডাররা (হেলমেট বাহিনী) আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বুক লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিল। রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে লালিত এই সন্ত্রাসীরা পুরো দেশটাকে সাধারণ নাগরিকদের জন্য একটি অনিরাপদ ও শ্বাসরুদ্ধকর নরকে পরিণত করেছিল।
মেগা প্রজেক্টের চাকচিক্য দিয়ে যে 'উন্নয়নের' খোলস তৈরি করা হয়েছিল, তার ভেতরে আসলে একটি রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খেয়ে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। একদিকে বিপুল অর্থ পাচার ও ব্যাংক লুটপাটের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ করে ধূলিসাৎ করা হয়েছে আইনের শাসন। আর এই ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখতে শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস ও লেঠেল বাহিনী লেলিয়ে দিয়ে, সবশেষে ২০২৪-এর জুলাইয়ে নির্বিচারে শত শত তরুণ প্রাণকে বুলেটে ঝাঁঝরা করে এবং হাজারো স্বপ্নকে চিরতরে পঙ্গু করে দিয়ে পুরো বাংলাদেশকে সার্বিক দিক দিয়ে পঙ্গু করে ফেলা হয়েছে।
লেখক: ব্যাংকার ও কলামিস্ট
*মতামত লেখকের নিজস্ব