সিদ্দিকা লাকী
এক.
১৯৯১ সালের কথা। হিন্দি সাজান(Saajan)মুভির একটি গান ছিল, দ্যাখা হে পেহলি বার, সাজান কি আখুমে পিয়ার।
তখন এর বাংলা গানও বের হয়েছিল, দেখেছি প্রথমবার, দু'চোখে প্রেমের জোয়ার।
আর এই সিনেমাটি যখন প্রদর্শিত হয়, তখন এদেশের আমজনতার মধ্যে দু-একজন ধনী গোত্রের লোকজনের বাড়িতে সাদাকালো বাক্সওয়ালা টিভি ছিল। সেই টিভি খোলা আঙ্গিনায় বা মাঠে রেখে ডিসপ্লে করা হতো যাতে মানুষ সাজান বা এরকম মুভিগুলো দেখে।
সেই আবেদনময়ী নায়িকা মাধুরীর সাথে সালমান, সঞ্জয়ের রসায়ন, এক রকম অসমাপ্ত প্রেমের সুপারহিট মুভি ছিল এটি।
কালের বিবর্তনে এখন ২০২৬। ৩৫ বছরের ব্যবধানে একজন গৃহকর্ত্রী তার গৃহ পরিচারিকাকে একটি নরমাল এলইডি টিভি কিস্তিতে কিনে দেন। বাসায় নিয়ে সেটা চালু করার চেষ্টা করলে মিস্ত্রি বলেন যে এটা এন্ড্রয়েড টিভি নয়, এটা ডিশের লাইন দিয়ে চালাতে হবে।
গৃহকর্মী ফোন করে ব্যঙ্গ করে বলে, আফা এটা কি টিভি দিছেন, এটা তো ওয়াইফাইয়ে চলে না, স্মার্ট টিভি না, এরকম টিভি দরকার নাই, ফেরত নিয়ে যান।
কিছু বুঝলেন?
দুই.
শোনা যায়, এখন ছাত্ররা যত্রতত্র শিক্ষককে পেটানোর মহোৎসব পালন করছে। অথচ আজ থেকে প্রায় ৪১ বছর আগে আমি বা আমার বয়সি অনেকেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রী ছিলাম। আমাদের সেই শিক্ষাগুরুদের সাথে এখনও সম্মানসূচক যোগাযোগ আছে, আমাদের ভালো থাকার খবরে তারা সুখ বোধ করেন, পদোন্নতির খবর আকাশে বাতাসে ভাসলেও ফোন করে খোঁজ নেন, তাছাড়া কোন কারণ ছাড়াই মাঝে মাঝে খোঁজ নেন শুধু ভালো আছি কি না, চিনতে পেরেছি কি না ইতাদি।
ভেবে দেখুন, কতটা সামাজিক মুল্যবোধ আর বন্ডিং ইস্পাত সমান দৃঢ় হলেই তবে এটা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব!
এখন প্রতি কিলোমিটারে স্কুল কলেজ, আর কত রকমের প্রতিষ্ঠান আছে,কিন্তু মূল্যবোধের চর্চা যে পরিবার, সমাজ বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে, আমদের তা জানা নেই।
বিবেকলুপ্ত বিকৃত মানসিকতায় বেড়ে ওঠা এক শ্রেণির তরুণ হাত তুলছেন মহান শিক্ষকের গায়ে।
কাজী কাদের নেওয়াজ রচিত শিক্ষাগুরুর মর্যাদা কবিতাটি আমিও পড়েছি, আমার সন্তানও প্রায় ৩০ বছরের ব্যবধানে পড়েছে; এ ধরনের মূল্যবোধ জাগ্রত করা কবিতা বা শ্লোক বা বাণীগুলো শহর, গ্রাম বা জনপদে ব্যানার বিলবোর্ড বা প্রদর্শনী আকারে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত।
তিন.
মাত্র কয়েকদিন আগের ঘটনা।
আমি ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ পাই না বললেই চলে। জরুরিভাবে বিমানবন্দরে যেতে উত্তরার মধ্যে সিভিল এভিয়েশন এলাকা দিয়ে গাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলাম। পথে কর্তব্যরত আনসার সদস্য বাধা দিয়ে বলেন যে এ রাস্তায় কাজ চলছে, এদিক দিয়ে যাওয়া যাবে না। আমার গাড়িচালক তাকে আমার পরিচয় দেন এবং অনুরোধ করেন, তিনি আমার পরিচয় (সিআইডি'র এসপি) শুনেও বলেন, মহিলা মানুষের সাথে আবার কিসের কথা বলবো!
এ কথা আমি নিজের কানেও শুনে ফেলি। গাড়িচালককে বলি যে ডিউটি আনসার যেন আমার দিকে আসে, যথারীতি আমি তাকে তার পরিচয় জিজ্ঞাসা করি, তিনি বলেন যে তিনি সরকারি চাকরি করা আনসার। আমি তাকে আমার পরিচয় না দিয়ে বললাম যে আপনি যে কথা বললেন এটা কি ঠিক হলো? তিনি আমার পরিচয় জানার পরে শুধু দু'হাত তুলে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে রাস্তা এগিয়ে দিল।
এ তো গেল আমার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা।
আমরা এ সমাজে কেন জানি দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর চর্চায় অনেক পিছিয়ে। নারীকে নারী, পুরুষকে পুরুষ বা বীরপুরুষ ভাবতেই যেন আমরা স্বছন্দ্য বোধ করি।
যদি ভাবানাটা এমন হয়- আমরা সবাই মানুষ, সম্মান সবারই প্রাপ্য। তাহলেই কিন্তু কথায় কথায় মহিলা বলার অভ্যাস বদলে যাবে।
আজ পর্যন্ত নজরুলের বিখ্যাত কবিতার বাণী কেউ অস্বীকার করতে পারে নি-
“অর্ধেক তার করিয়াছে নারী,
অর্ধেক তার নর।”
আর হার্ড জব, সফ্ট জব, নারী বান্ধব, পুরুষ বান্ধব, সহমর্মিতা,সহযোগিতা-এরকম অনেক ধারণা নিয়ে আমরা যেন আগ্রহই বোধ করি না।
ভালো থাকতে গেলে কখনো একা ভালো থাকা সম্ভব নয়।
মানুষকে নিয়ে সমাজ, সমাজকে নিয়ে রাষ্ট্র।
আসুন, ছোট ছোট করে হলেও সম্মানবোধ, মূল্যবোধ ও সহমর্মিতা চর্চা করি।
লেখক: কবি, গদ্যকার ও মোটিভেশনাল স্পিকার। অতিরিক্ত ডিআইজি হিসাবে সিআইডিতে কর্মরত।