বজলুর রহমান
আজ কোনো সান্ত্বনা নেই, কোনো অজুহাত নেই। ছোট্ট রামিসার রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত নিথর দেহটা যখন আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন শুধু একটি শিশুর জীবনপ্রদীপ নিভে যায় না, বরং এই পুরো রাষ্ট্রের বিবেক, নৈতিকতা এবং শাসনব্যবস্থার কফিন তৈরি হয়। রামিসা, তোমার এই চলে যাওয়া কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের সমাজের পচনের চাক্ষুষ দলিল।
ধর্ষণ শেষে যখন তোমার দেহ থেকে মাথাটা আলাদা করে ফেলা হলো, তখন আসলে আলাদা হয়ে গেছে আমাদের তথাকথিত সভ্যতার মুখোশ। আমরা যারা প্রতিদিন নিদান হাঁকি, সুশাসনের গল্প বলি, প্রগতির বড়াই করি—তোমার নিথর দেহের সামনে এসে আমরা সবাই আজ অপরাধী, আমরা সবাই আজ মস্তকহীন।
হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে যায় যখন ভাবি, শেষ মুহূর্তে তোমার ওই ছোট ছোট চোখ দুটো কতটা আতঙ্ক দেখেছিল! কতটা যন্ত্রণায় তুমি চিৎকার করতে চেয়েছিলে, কিন্তু এই নিষ্ঠুর সমাজ তোমার সেই আর্তনাদ শুনতে পায়নি। তুমি তো কোনো অন্যায় করোনি, রামিসা। তোমার অপরাধ ছিল—তুমি একটি এমন দেশে জন্মেছিলে, যেখানে ফুল ফোটার আগেই তা ছিঁড়ে ফেলার শকুনরা মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়ায়।
না, রামিসা। তুমি হেরে যাওনি। হেরে গেছে এই ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশ। হেরে গেছে আমাদের আইন ব্যবস্থা, হেরে গেছে আমাদের প্রশাসন, হেরে গেছে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ। যে রাষ্ট্র তার কোলে একটি কন্যাসন্তানকে নিরাপত্তা দিতে পারে না, যে সমাজ পিশাচদের মনে ভয়ের দেওয়াল তুলতে পারে না—সে সমাজ প্রতিদিন হারে, প্রতি মুহূর্তে হারে।
না, রামিসা। তুমি হেরে যাওনি। হেরে গেছে এই ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশ। হেরে গেছে আমাদের আইন ব্যবস্থা, হেরে গেছে আমাদের প্রশাসন, হেরে গেছে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ।
আমরা আর কতকাল শুধু "তীব্র নিন্দা" জানিয়ে দায়িত্ব শেষ করব? আর কতটি রামিসার রক্তে আমাদের হাত লাল হলে পর রাষ্ট্রযন্ত্রের ঘুম ভাঙবে? আমরা এমন এক বিচারহীনতার সংস্কৃতির মধ্যে বাস করছি, যেখানে অপরাধীরা বুক ফুলিয়ে হাঁটে, আর ভুক্তভোগীর পরিবারকে সারাজীবন কান্নার সাগরে ভাসতে হয়। এই বিচারহীনতাই আজ নতুন নতুন পিশাচ তৈরি করছে।
সরকার এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে আজ কোনো অনুরোধ নয়, দেশের প্রতিটি নাগরিকের পক্ষ থেকে এটি এক চরম আলটিমেটাম: রামিসার হত্যাকারী ও ধর্ষকদের বিচার যেন কোনো আইনি জটিলতার বেড়াজালে আটকে না থাকে। ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টে, দ্রুততম সময়ে এই নরপশুদের এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক, যা দেখে আর কোনো অপরাধী কোনো শিশুর দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস না পায়।
যদি এই ঘটনার পর ও খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা না যায়, তবে ধরে নিতে হবে এ দেশের শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি ব্যর্থ। দেশের মানুষের হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, তা কেবল তখনই থামবে যখন অপরাধীর চণ্ডালরূপ পুরো জাতি দেখবে।
রামিসা, ওপারে তুমি ভালো থেকো। এই নরকসম পৃথিবী তোমার যোগ্য ছিল না। তবে আমরা যারা বেঁচে আছি, লজ্জিত ও মাথা নত করে আজ প্রতিজ্ঞা করছি—তোমার এই রক্তের শেষবিন্দু পর্যন্ত আমরা বিচারের দাবি ছাড়ব না। এই বাংলাদেশ আর হারতে পারে না, আমরা একে আর হারতে দেব না।
লেখক: কলামিস্ট ও ব্যাংকার
আরও লেখা:
ধর্ষিত শিশুর চিৎকারে হেরে যায় বাংলাদেশ