ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
সকাল ৯টা। অফিসের ডেস্কে বসে ল্যাপটপ অন করতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল ফেসবুকের নোটিফিকেশন। "একটু দেখেই কাজ শুরু করছি"— এই ভেবে যে স্ক্রলিং শুরু হলো, ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে দেখা গেল কখন যেন মূল্যবান ৩০ মিনিট পার হয়ে গেছে।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং আমাদের দেশের সরকারি-বেসরকারি বহু অফিসের প্রতিদিনের চেনা চিত্র। কর্মজীবী নারী ও পুরুষের মধ্যে ফেসবুকের এই অনিয়ন্ত্রিত আসক্তি আমাদের জাতীয় উৎপাদনশীলতার ওপর একটা বড় ধরনের আঘাত হানছে। এ নিয়ে এখনই গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট আমাদের জীবনকে সহজ করেছে সত্য, কিন্তু এর অপব্যবহার আমাদের মূল্যবান কর্মঘণ্টাকে গিলে খাচ্ছে। অফিসে কাজের ফাঁকে একটু রিফ্রেশমেন্টের জন্য ফেসবুকে ঢোকা দোষের কিছু নয়। কিন্তু সমস্যা তখনই হয়, যখন সেই 'একটু' সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টায় রূপ নেয়।
অনিয়ন্ত্রিত আসক্তির কারণ কী
লাইক, কমেন্ট আর শেয়ারের নোটিফিকেশন আমাদের মস্তিষ্কে এক ধরণের সাময়িক আনন্দের সৃষ্টি করে, যা কাজের একঘেয়েমি কাটাতে গিয়ে আমাদের আরও বেশি আসক্ত করে তোলে।
অন্যদিকে পিছিয়ে পড়ার ভয়ে ভার্চুয়াল জগতে কে কী করছে, কোথায় ঘুরছে, কী খাচ্ছে— তা জানার এক তীব্র কৌতুহল তৈরি হয়, যা কাজের মনোযোগ সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেয়।
অনেক সময় কর্মজীবী নারীরা ঘরের কাজ, সন্তান ও অফিসের চাপের মাঝে একটু মানসিক স্বস্তি খুঁজতে অবচেতনভাবেই ফেসবুকের দেয়ালে আশ্রয় নেন। একইভাবে পুরুষরাও কাজের স্ট্রেস কমাতে স্ক্রলিং শুরু করে আসক্তির ফাঁদে পড়েন।
মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্টের খতিয়ান
একজন কর্মী যদি দিনে গড়ে মাত্র ১ ঘণ্টাও ফেসবুকে অযথা ব্যয় করেন, তবে সপ্তাহে তা দাঁড়ায় ৬ ঘণ্টা এবং মাসে প্রায় ২৪ ঘণ্টা! অর্থাৎ, প্রতি মাসে একজন কর্মী প্রায় ৩টি পূর্ণ কর্মদিবস শুধুমাত্র ভার্চুয়াল জগতে হারিয়ে ফেলছেন !
নিচে কিছু নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান দেওয়া হলো-
আন্তর্জাতিক কর্মঘণ্টা নষ্টের পরিসংখ্যান
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান Statista এবং Salary.com-এর বিভিন্ন বৈশ্বিক জরিপ অনুযায়ী, কর্মজীবী মানুষ অফিসে কাজের সময়ের মধ্যে গড়ে ১ থেকে ২ ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়া এবং ব্যক্তিগত ইন্টারনেট ব্রাউজিংয়ে ব্যয় করেন।
বৈশ্বিক সাইবার সিকিউরিটি প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, একজন কর্মী যদি প্রতিদিন গড়ে ১ ঘণ্টাও সোশ্যাল মিডিয়ায় কাটান, তবে বছরে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, যা প্রায় ১২-১৫টি পূর্ণ কার্যদিবসের সমান।
উৎপাদনশীলতা হ্রাসের আর্থিক ক্ষতি
বিশ্বখ্যাত জরিপ সংস্থা Gallup-এর 'State of the Global Workplace' প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন করপোরেট সমীক্ষা অনুযায়ী, সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তির কারণে কর্মীদের কর্মক্ষমতা বা উৎপাদনশীলতা প্রায় ১৫% থেকে ২০% পর্যন্ত হ্রাস পায়।
আমেরিকার অফিসগুলোর ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মীদের এই ডিজিটাল অমনোযোগিতার কারণে প্রতি বছর কোম্পানিগুলোর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়।
মনোযোগ হারানোর "কস্ট অব ইন্টারাপশন"
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (UC Irvine) একটি বিখ্যাত গবেষণায় দেখা গেছে, কাজের মাঝে মাত্র একবার ফেসবুক নোটিফিকেশন বা মেসেজ চেক করলে, পুনরায় সেই কাজে পুরোপুরি মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে একজন মানুষের গড়ে ২৩ মিনিট ১৫ সেকেন্ড সময় লাগে। একে বলা হয় Cost of Interruption। অর্থাৎ, ৫ মিনিটের ফেসবুক ব্রাউজিং আসলে আধঘণ্টার কর্মক্ষমতা নষ্ট করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের তরুণ ও মধ্যবয়সী কর্মজীবীদের প্রায় আশি শতাংশের বেশি মানুষ কর্মঘণ্টার মধ্যেই নিয়মিত ফেসবুক ও মেসেঞ্জার ব্যবহার করেন।
একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, এ দেশের চাকরিজীবীরা অফিসে থাকাকালে প্রতি ১ থেকে ২ ঘণ্টা পর পর অন্তত একবার ফেসবুক স্ক্রল করেন।
প্রযুক্তি আমাদের জীবনের গতি বাড়াতে এসেছে, আমাদের স্থবির করতে নয়। ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কোনো ক্ষতিকর উপাদান নয়, যদি তার লাগাম আমাদের হাতে থাকে। কিন্তু যখন প্রযুক্তি মানুষের ওপর ভর করে, তখন সৃজনশীলতা আর পেশাদারিত্ব— দুই-ই লোপ পায়। কর্মজীবী নারী ও পুরুষদের বুঝতে হবে, ক্যারিয়ারের প্রকৃত সমৃদ্ধি বাস্তবের কর্মক্ষেত্রে মনোযোগ ও সততার ওপর নির্ভর করে, ফেসবুকের ভার্চুয়াল 'রিঅ্যাকশন' বা সাময়িক জনপ্রিয়তায় নয়। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, কাজের মাঝে মাত্র একবার ফেসবুক চেক করলে মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে মানুষের গড়ে ২৩ মিনিট সময় নষ্ট হয়; যা আমাদের প্রতিদিনের উৎপাদনশীলতাকে প্রায় বিশ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে এই বিশাল অপচয় মেনে নেওয়ার বিলাসিতা আমাদের নেই। তাই অফিসগুলোতে সুনির্দিষ্ট ডিজিটাল নীতিমালা প্রণয়ন এবং ব্যক্তিগত স্তরে সচেতনতা বৃদ্ধির এখনই সময়।
আসুন, আজই প্রতিজ্ঞা করি— আমাদের মূল্যবান কর্মঘণ্টা হোক শুধু পেশাগত উৎকর্ষের জন্য, ভার্চুয়াল মোহের দাসত্বের জন্য নয়। স্ক্রিনের স্ক্রলিং থামিয়ে এবার বাস্তবের কাজে মন দেওয়া যাক।
লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা