বজলুর রহমান
যেকোনো ব্যবস্থার বা অবহেলার কারণে একটি শিশুর মৃত্যুও মেনে নেওয়া যায় না। সম্প্রতি আদ-দ্বীন হাসপাতালের একটি শাখায় ছয়টি শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু দেশের প্রতিটি নাগরিকের হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করেছে। এই ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক তদন্ত হওয়া এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া সময়ের দাবি। কিন্তু এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে তড়িঘড়ি করে পুরো হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি কি আসলেই কোনো সমাধান, নাকি দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য আরও বড় একটি বিপর্যয়? সচেতন মহল ও সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের মতে, এটি একটি চরম ভুল, অদূরদর্শী এবং আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
চিকিৎসাসেবার এক অনন্য বাতিঘর "আদ-দ্বীন"
দেশের সাধারণ এবং মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে আদ-দ্বীন হাসপাতাল কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি আস্থার নাম। বিশেষ করে প্রসূতি ও শিশু চিকিৎসায় হাসপাতালটির সুনাম দেশজুড়ে। যেখানে দেশের বড় বড় কর্পোরেট বা বেসরকারি হাসপাতালগুলো সাধারণ মানুষের রক্ত চোষার ফাঁদ পেতে বসে আছে, সেখানে আদ-দ্বীন বছরের পর বছর ধরে নামমাত্র মূল্যে, কখনো কখনো বিনামূল্যে দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে মানসম্মত চিকিৎসা দিয়ে আসছে।
অভিযোগ রয়েছে, দেশের বহু সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে রোগীরা অহেতুক হয়রানি, দালালচক্র এবং অতিরিক্ত বিলের শিকার হন। সাধারণ একটা টেস্ট বা সিজারের জন্য যেখানে হাজার হাজার টাকা গুনতে হয়, সেখানে আদ-দ্বীন স্বল্পমূল্যে আধুনিক সেবা নিশ্চিত করে আসছিল। এইরকম একটি মানবিক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করার অর্থ হলো হাজার হাজার গরিব ও অসহায় রোগীকে আধুনিক এবং সাশ্রয়ী চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া।
ব্যক্তির অপরাধের দায় প্রতিষ্ঠানের ওপর কেন?
যদি কোনো চিকিৎসক, নার্স বা টেকনিশিয়ানের অবহেলার কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটে থাকে, তবে তদন্ত সাপেক্ষে সেই নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু তার জন্য পুরো হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করে দেওয়া আইন ও ন্যায়ের পরিপন্থী। একজন চালকের ভুলের জন্য পুরো বাস কোম্পানিকে নিষিদ্ধ করা যেমন অবাস্তব, এখানেও বিষয়টি ঠিক তাই।
আরও পড়ুন-
তুমি হেরে যাওনি, হেরে গেছে বাংলাদেশ !
অন্যান্য হাসপাতালের ক্ষেত্রে দ্বিমুখী নীতি
দেশের বহু নামী-দামী এবং তথাকথিত নামকরা কর্পোরেট হাসপাতালে প্রায়শই ভুল চিকিৎসা, অতিরিক্ত বিল আদায়, এমন কি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (ICU) মৃত লাশ রেখে ব্যবসা করার মতো রোমহর্ষক ঘটনা ঘটে। সেসব ক্ষেত্রে কয়টি হাসপাতালের লাইসেন্স আজ পর্যন্ত বাতিল করা হয়েছে? বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটির নামে বিষয়গুলো ধামাচাপা দেওয়া হয়। তাহলে আদ-দ্বীনের মতো একটি জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কেন এত বড় এবং কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, তা নিয়ে জনমনে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সেবা বঞ্চিত হাজার হাজার মানুষ ও কর্মসংস্থান
এই লাইসেন্স বাতিলের ফলে বর্তমানে চিকিৎসাধীন শত শত রোগীর জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। যারা এখানে কম খরচে অপারেশনের শিডিউল পেয়েছিলেন, তারা এখন কোথায় যাবেন? এছাড়া হাসপাতালটির সাথে যুক্ত শত শত সৎ ও দক্ষ চিকিৎসক, নার্স এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভবিষ্যৎও এক নিমেষে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
শাস্তি হোক দোষীর, বন্ধ নয় সেবা
ছয়টি শিশুর অকাল মৃত্যু আমাদের সবাইকে কাঁদাচ্ছে। আমরা চাই এই ঘটনার পেছনের আসল সত্য বের হয়ে আসুক। সেটি কি কোনো ওষুধের ত্রুটি ছিল, নাকি কোনো যন্ত্রপাতির কারিগরি সমস্যা, নাকি সুনির্দিষ্ট কারও গাফিলতি ছিল—তা সুক্ষ্মভাবে খতিয়ে দেখা হোক। তদন্তে যারা দোষী প্রমাণিত হবে, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হোক। প্রয়োজনে ওই নির্দিষ্ট ইউনিটটির কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত রাখা যেতে পারত।
কিন্তু পুরো হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করে দেওয়ার মতো চরমপন্থী সিদ্ধান্ত দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও ভঙ্গুর করবে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। ক্ষোভের বশে বা সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য নেওয়া এই ভুল সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হোক। আদ-দ্বীন হাসপাতালকে কঠোর নজরদারির মধ্যে রেখে পুনরায় চালুর অনুমতি দেওয়া হোক, যাতে দেশের হাজার হাজার অসহায় মানুষ তাদের ন্যায্য চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হন।
লেখক: কলামিস্ট ও ব্যাংকার
মতামত লেখকের নিজস্ব