ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
"ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে"— কবি গোলাম মোস্তফার এই চিরন্তন সত্যটি মনে করিয়ে দেয় যে, আজকের শিশুই আগামী দিনের পৃথিবীর কাণ্ডারি। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, ১২ই জুন আন্তর্জাতিক শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস যখন আমাদের দুয়ারে কড়া নাড়ে, তখনো বিশ্বের কোটি কোটি শিশুর শৈশব বন্দি হয়ে আছে কলকারখানার ধোঁয়া, ইটের ভাটা কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের অন্ধকার গলিতে। যে বয়সে শিশুর হাতে থাকার কথা ছিল রঙিন পাঠ্যবই আর খাতা, সেই বয়সে অভাবের তাড়নায় তাদের কাঁধে চেপে বসেছে জীবিকার নির্মম জোয়াল। অথচ মানবতাবাদের শ্রেষ্ঠ আলোকবর্তিকা ইসলাম আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগেই শিশুর এই অসহায়ত্বের অবসান ঘটিয়েছে। ইসলাম কেবল শিশুশ্রমের বিরোধিতাই করেনি, বরং শিশুর নিরাপত্তা, শিক্ষা এবং সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার অধিকারকে আইনি ও ধর্মীয়ভাবে নিশ্চিত করেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিশুশ্রমের এই অভিশাপ থেকে সমাজকে মুক্ত করতে ইসলামের সেই শাশ্বত ও মানবিক বিধানগুলোর বাস্তবায়ন আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
১২ই জুন আন্তর্জাতিক শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস (World Day Against Child Labour) হলো বিশ্বজুড়ে শিশুশ্রম বন্ধ করার লক্ষ্যে সচেতনতা সৃষ্টির একটি বিশেষ দিন। প্রতি বছর আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং জাতিসংঘের যৌথ উদ্যোগে এই দিবসটি পালন করা হয়।
১. দিবসটির মূল উদ্দেশ্য
সচেতনতা বৃদ্ধি : বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ শিশু এখনো বিপজ্জনক এবং তাদের বয়সের অনুপযোগী কাজে নিয়োজিত। এই শিশুদের অধিকার রক্ষা এবং তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সাধারণ মানুষ ও সরকারকে সচেতন করা।
আইন ও নীতিমালা প্রয়োগ : শিশুশ্রম নির্মূলে বিভিন্ন দেশের সরকারকে কঠোর আইন তৈরি ও তা বাস্তবায়নে উৎসাহিত করা।
শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা : "কাজের বদলে শিক্ষা"—প্রতিটি শিশুর জন্য মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিত করার বার্তা এই দিনে জোরদার করা হয়।
২. ইতিহাস ও শুরুর গল্প
২০০২ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) প্রথম এই দিবসটি চালু করে। বিশ্বব্যাপী শিশুশ্রমের ভয়াবহতা দেখে এবং এটিকে একটি বৈশ্বিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতি বছর ১২ই জুন দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আন্তর্জাতিকভাবে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ও শোষণমুক্ত পরিবেশ গড়ার অঙ্গীকার থেকেই এর যাত্রা শুরু।
৩. শিশুশ্রমের ক্ষতিকর দিক
শিশুশ্রম কেবল একটি শিশুর শৈশবকেই কেড়ে নেয় না, বরং তার পুরো ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দেয়:
শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি : ভারী বা বিপজ্জনক কাজ শিশুদের শরীর গঠন ও মানসিক বিকাশে বাধা দেয়।
শিক্ষাবঞ্চিত হওয়া : কর্মক্ষেত্রে সময় দেওয়ার কারণে শিশুরা স্কুল থেকে ঝরে পড়ে, যা সমাজকে নিরক্ষরতার দিকে ঠেলে দেয়।
দারিদ্র্যের চক্র : শিক্ষা না পাওয়ায় এই শিশুরা বড় হয়েও ভালো কোনো কাজ পায় না, ফলে তারা আজীবন দারিদ্র্যের বৃত্তেই আটকে থাকে।
বাংলাদেশের পথ শিশুদের চিত্র :
বাংলাদেশে পথশিশুদের প্রকৃত সংখ্যা এবং তাদের জীবনযাত্রার মান নিয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তর, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং ইউনিসেফ (UNICEF) বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন "দ্য কোয়ালিটি স্টাডি অন চিলড্রেন লিভিং ইন স্ট্রিট সিচুয়েশনস ইন বাংলাদেশ" এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) তথ্য অনুযায়ী একটি সামগ্রিক পরিসংখ্যান নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সাধারণ জনসংখ্যা ও লিঙ্গভিত্তিক অনুপাত
মোট সংখ্যা : সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক ও জাতীয় গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩৪ লাখ (৩.৪ মিলিয়ন) পথশিশু রয়েছে।
লিঙ্গভিত্তিক হার : পথশিশুদের মধ্যে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য বেশ প্রকট। মোট পথশিশুর মধ্যে প্রায় ৮২% ছেলে শিশু এবং বাকি ১৮% মেয়ে শিশু।
ভৌগোলিক অবস্থান : দেশের অর্ধেকেরও বেশি পথশিশু রাজধানী ঢাকায় বসবাস করে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি পথশিশু রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে (২২.৭%), এর পরেই রয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (১৮.৩%)।
২. কেন তারা পথশিশু হচ্ছে? (প্রধান কারণসমূহ)
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী, শিশুরা ঘর ছাড়ার পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে:
তীব্র দারিদ্র্য ও ক্ষুধা : প্রায় ৩৭.৮% শিশু কেবল ক্ষুধা ও চরম দারিদ্র্যের কারণে পরিবার ছেড়ে রাস্তায় চলে আসে।
পরিবারের স্থানান্তর : ১৫.৪% শিশু বাবা-মায়ের সাথে কাজের খোঁজে গ্রাম থেকে শহরে এসে পরবর্তীতে পথশিশুতে পরিণত হয়।
কাজের সুযোগ : ১২.১% শিশু নিজের আয়ের আশায় শহরে পাড়ি জমায়।
অভিভাবকহীনতা : ৫% শিশুর কোনো আইনগত বা পারিবারিক অভিভাবক নেই।
৩. জীবনযাত্রার মান ও মৌলিক অধিকারের সংকট
আবাসন সমস্যা : প্রায় ৩০% পথশিশু কোনো ধরনের মৌলিক নাগরিক সুবিধা (যেমন: বিছানা, নিরাপদ দরজা বা টয়লেট) ছাড়াই সম্পূর্ণ খোলা জায়গায় ঘুমাচ্ছে। এদের অর্ধেকই মাটিতে ঘুমানোর জন্য চটের বস্তা, কার্টন বা প্লাস্টিক ব্যবহার করে।
শিক্ষা ও সচেতনতা : পথশিশুদের একটি বিশাল অংশ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। প্রায় ৭১.৮% পথশিশু সম্পূর্ণ নিরক্ষর এবং তারা সরকার বা এনজিওদের দেওয়া বিভিন্ন সাহায্য-সহযোগিতা সম্পর্কে কিছুই জানে না।
নির্যাতন ও শোষণ: রাস্তায় থাকা প্রতি ১০ জন পথশিশুর মধ্যে ৮ জনই পথচারী বা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সাধারণ মানুষের দ্বারা নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়।
একটি আশার আলো: সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতিকূল পরিবেশে থাকার পরও প্রায় ৬৬.৮% পথশিশু ভালো কাজ বা চাকরির মাধ্যমে তাদের এই যাযাবর জীবন পরিবর্তন করতে চায়। পাশাপাশি, প্রায় ২৭.৯% শিশু আবার স্কুলে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। সরকার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র' এবং বিভিন্ন এনজিওর 'ড্রপ-ইন সেন্টার'-এর মাধ্যমে এদের মূল স্রোতে ফেরানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী পথ শিশুদের একটি পরিসংখ্যান
জাতিসংঘ (UN), ইউনিসেফ (UNICEF) এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা 'কনসোর্টিয়াম ফর স্ট্রিট চিলড্রেন' (CSC)-এর বিভিন্ন প্রতিবেদন ও পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বব্যাপী পথশিশুদের একটি সামগ্রিক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
১. বিশ্বব্যাপী আনুমানিক সংখ্যা
মোট সংখ্যা : জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় এবং ইউনেস্কো (UNESCO)-এর হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০ থেকে ১৫ কোটি (১০০ থেকে ১৫০ মিলিয়ন) পথশিশু রয়েছে।
ক্রমবর্ধমান প্রবণতা : জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ণ, অর্থনৈতিক মন্দা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে বলে গবেষকরা ধারণা করছেন।
লিঙ্গভিত্তিক হার: বৈশ্বিক পরিসংখ্যানেও দেখা যায় পথশিশুদের মধ্যে ছেলের সংখ্যা মেয়েদের তুলনায় অনেক বেশি। তবে মেয়েরা রাস্তায় এলে তাদের পাচার, শোষণ ও চরম নির্যাতনের ঝুঁকি ছেলেদের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি থাকে।
২. অঞ্চলভিত্তিক একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র
বিশ্বের সব বড় শহরেই পথশিশু রয়েছে, তবে অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই সংকট সবচেয়ে তীব্র:
ক.এশিয়া (Asia)
এশিয়ায় পথশিশুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে ভারতে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখের বেশি শিশু রাস্তার ওপর বা তার আশেপাশে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। ফিলিপাইনে এই সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার।
খ.ল্যাটিন আমেরিকা (Latin America)
এই অঞ্চলে পারিবারিক ভাঙন ও চরম অর্থনৈতিক সংকটের কারণে লাখ লাখ শিশু রাস্তায় নামছে। শুধু ব্রাজিলেই আনুমানিক ২৫ হাজারেরও বেশি শিশু সম্পূর্ণ গৃহহীন অবস্থায় রাস্তায় বাস করে।
গ.আফ্রিকা (Africa)
সাব-সাহারা অঞ্চলের দেশগুলোতে যুদ্ধ, রাজনৈতিক সহিংসতা, দারিদ্র্য এবং মহামারীর (যেমন এইডস) কারণে পথশিশুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক। যেমন কেনিয়াতে প্রায় ৪৬,০০০-এর বেশি পথশিশু রয়েছে।
৩.বৈশ্বিক সংকট ও ঝুঁকি
মৌলিক অধিকারের অভাব : বিশ্বব্যাপী পথশিশুদের প্রায় ৭০%-৮০% কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পায় না।
শোষণ ও অপরাধ : আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) মতে, বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ পথশিশু মানব পাচার, জোরপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তি, মাদক চোরাচালান এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের শিকার হচ্ছে।
আইনি পরিচয়হীনতা : অধিকাংশ পথশিশুর জন্মনিবন্ধন বা আইনি কোনো কাগজপত্র থাকে না। ফলে তারা রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা বা সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের বাইরেই থেকে যায়।
আন্তর্জাতিক উদ্যোগ : প্রতি বছর ১২ই এপ্রিল "আন্তর্জাতিক পথশিশু দিবস" (International Day for Street Children) হিসেবে পালন করা হয়, যাতে বিশ্বনেতারা এই বিশাল অবহেলিত জনগোষ্ঠীর অধিকার ও পুনর্বাসনের দিকে নজর দেন।
পথ শিশুদের সুরক্ষায় বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত কার্যক্রম
বাংলাদেশে পথশিশুদের সুরক্ষা, শিক্ষা এবং তাদের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ও প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে প্রধান পদক্ষেপগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. শেখ রাসেল শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র
এটি সরকারের সবচেয়ে বড় ও সফল উদ্যোগগুলোর একটি। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশের বিভিন্ন জেলায় এই কেন্দ্রগুলো পরিচালিত হচ্ছে।
আশ্রয় ও নিরাপত্তা : রাস্তা থেকে পথশিশুদের উদ্ধার করে এই কেন্দ্রগুলোতে সম্পূর্ণ নিরাপদ আবাসন ও খাবারের ব্যবস্থা করা হয়।
শিক্ষা ও দক্ষতা : এখানে শিশুদের সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন বৃত্তিমূলক বা কারিগরি প্রশিক্ষণ (যেমন: দর্জি বিজ্ঞান, কম্পিউটার, মেকানিক্স) দেওয়া হয়, যাতে তারা স্বাবলম্বী হতে পারে।
পরিবারের কাছে হস্তান্তর : সম্ভব হলে কাউন্সেলিং-এর মাধ্যমে শিশুদের খুঁজে বের করে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
২. পথশিশু পুনর্বাসন কার্যক্রম (Street Children Rehabilitation Program)
সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে বিশেষ করে ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরগুলোতে এই কার্যক্রম চালানো হয়।
ওপেন এয়ার স্কুল ও ড্রপ-ইন সেন্টার : যেসব শিশু পুরোপুরি পরিবারবিচ্ছিন্ন নয় বা দিনের বেলা রাস্তায় কাজ করে, তাদের জন্য বিভিন্ন উন্মুক্ত স্থানে সংক্ষিপ্ত শিক্ষা এবং পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা হয়।
জরুরি সেবা : অসুস্থ পথশিশুদের জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাউন্সেলিং সেবা দেওয়া হয়।
৩. চাইল্ড হেল্পলাইন ‘১০৯৮’ (Child Helpline 1098)
সরকার ইউনিসেফের সহায়তায় এই টোল-ফ্রি (বিনামূল্যে কল করার সুবিধা) হেল্পলাইনটি চালু করেছে।
যেকোনো পথশিশু নিজে কোনো বিপদে পড়লে, কিংবা সাধারণ কোনো নাগরিক যদি কোনো পথশিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বা নির্যাতনের শিকার হতে দেখেন, তবে ১০৯৮ নম্বরে কল করে তাৎক্ষণিক আইনি সহায়তা বা উদ্ধারকারী দলের সাহায্য চাইতে পারেন।
৪. শিশু সংবেদনশীল সামাজিক সুরক্ষা (CSPB) প্রকল্প
এই প্রকল্পের মাধ্যমে পথশিশুদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়। সমাজকর্মীরা সরাসরি মাঠ পর্যায়ে গিয়ে পথশিশুদের চিহ্নিত করেন এবং তাদের আইনি অধিকার (যেমন: জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করা) ও প্রাতিষ্ঠানিক আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দেন।
৫. ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন প্রকল্প
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই প্রকল্পের মাধ্যমে যেসব পথশিশু গ্যারেজ, ট্যানারি বা অ্যালুমিনিয়াম কারখানার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত, তাদের সেখান থেকে সরিয়ে আনা হয়। এর বদলে তাদের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা (Non-formal education) এবং পুনর্বাসনের জন্য আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হয়।
ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ও চ্যালেঞ্জ : সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে (SDG লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী) দেশ থেকে সব ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম এবং পথশিশু সংকটের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। তবে বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে শতভাগ সফলতার জন্য সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা (NGO) এবং সাধারণ নাগরিকদের সচেতনতা ও সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।
পথ শিশুদের সুরক্ষায় জাতিসংঘের গৃহীত কার্যক্রম :
২০১৭ সালে জাতিসংঘের শিশু অধিকার কমিটি একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেয়। তারা বিশেষভাবে পথশিশুদের জন্য General Comment No. 21 প্রকাশ করে। এটি আন্তর্জাতিক আইনের একটি গাইডলাইন, যার মাধ্যমে বিশ্বের সব দেশের সরকারকে বাধ্য করা হয় যেন তারা পথশিশুদের সাধারণ নাগরিকের মতো সমান অধিকার দেয়। এর মূল বার্তা ছিল:
১.পথশিশুদের অপরাধী হিসেবে দেখা যাবে না (যেমন: ভবঘুরে বলে গ্রেপ্তার করা যাবে না)।
তাদেরও সাধারণ শিশুদের মতো আইনি পরিচয় (জন্মনিবন্ধন) এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
২. ইউনিসেফ (UNICEF)-এর মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম
ইউনিসেফ সরাসরি বিভিন্ন দেশের স্থানীয় সরকার এবং এনজিওদের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করে:
মোবাইল স্কুল ও ড্রপ-ইন সেন্টার: রাস্তায় থাকা শিশুদের জন্য বিশেষ অনানুষ্ঠানিক স্কুল তৈরি করা, যেখানে তারা খেলার ছলে প্রাথমিক শিক্ষা ও পুষ্টিকর খাবার পায়।
মনোসামাজিক সহায়তা (Psychosocial Support): রাস্তায় থাকার কারণে যেসব শিশু মানসিক ট্রমা, নির্যাতন বা মাদকের শিকার হয়, তাদের কাউন্সেলিং-এর মাধ্যমে সুস্থ করে তোলা।
জন্মনিবন্ধন নিশ্চিতকরণ: পরিচয়হীন পথশিশুদের আইনি পরিচয় বা জন্মনিবন্ধন করানোর জন্য বিভিন্ন দেশের সরকারকে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দেয় ইউনিসেফ।
৩. আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম প্রতিরোধ
পথশিশুদের একটি বড় অংশই বেঁচে থাকার জন্য রাস্তায় ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে। আইএলও (ILO) তাদের কনভেনশন নং ১৩৮ (নূন্যতম বয়স) এবং কনভেনশন নং ১৮২ (নিকৃষ্টতম শিশুশ্রম নিষিদ্ধকরণ)-এর মাধ্যমে পথশিশুদের জোরপূর্বক শ্রম, ভিক্ষাবৃত্তি এবং মানব পাচার থেকে রক্ষা করতে বিশ্বব্যাপী কঠোর আইন প্রণয়নে চাপ সৃষ্টি করে।
৪. ইউনেস্কো (UNESCO)-এর "স্ট্রিট চিলড্রেন এডুকেশন" প্রজেক্ট
ইউনেস্কো বিশ্বাস করে শিক্ষা ছাড়া এই শিশুদের ভাগ্যের পরিবর্তন সম্ভব নয়। তারা বিশ্বব্যাপী 'Education for All' বা 'সবার জন্য শিক্ষা' নীতির আওতায় পথশিশুদের জন্য বিশেষ শিক্ষা মডিউল তৈরি করেছে। এটি প্রথাগত স্কুলের মতো নয়, বরং শিশুদের কাজের সময়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে নমনীয় সময়ে (Flexible hours) শিক্ষার সুযোগ দেয়।
৫. ডেটা সংগ্রহ ও বৈশ্বিক সচেতনতা
পথশিশুরা যেহেতু সমাজ ও আদমশুমারির আড়ালে হারিয়ে যায়, তাই জাতিসংঘ বিভিন্ন দেশে গবেষণার মাধ্যমে তাদের সঠিক পরিসংখ্যান ও সমস্যার কথা তুলে ধরে (যেমন বাংলাদেশে বিবিএস-এর সাথে যৌথভাবে ইউনিসেফের সমীক্ষা)। এছাড়া প্রতি বছর ১২ই এপ্রিল আন্তর্জাতিক পথশিশু দিবস উদযাপনে জাতিসংঘ সক্রিয় সমর্থন দেয়।
জাতিসংঘের মূল দর্শন: জাতিসংঘ প্রতিটি দেশকে এটি মনে করিয়ে দেয় যে, পথশিশুরা কোনো সামাজিক বোঝা বা অপরাধী নয়; তারা পরিস্থিতির শিকার। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG)-এর অন্যতম মূলমন্ত্র হলো "কেউ পেছনে পড়ে থাকবে না" (Leave no one behind), আর এই লক্ষ্য অর্জনে পথশিশুদের উন্নয়ন অপরিহার্য।
পথ শিশুদের সুরক্ষায় ইসলামের শাশ্বত পথনির্দেশনা
ইসলামে সমাজ তথা রাষ্ট্রের সব স্তরের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ইসলামে 'পথশিশু' বা 'পথের শিশু' বলতে আলাদা কোনো শ্রেণীবিভাগ নেই; বরং তাদের 'ইয়াতিম' (পিতৃহীন), 'মিসকিন' (দরিদ্র বা অসহায়) এবং 'ইবনুস সাবিল' (পথচারী বা আশ্রয়হীন) হিসেবে গণ্য করা হয়।
পবিত্র কুরআন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী, এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সুরক্ষায় সমাজের এবং বিত্তবানদের ওপর সুনির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব ও করণীয় অর্পণ করা হয়েছে:
১. স্নেহ ও ভালোবাসা দেওয়া
রাস্তায় থাকা শিশুরা সাধারণত সবচেয়ে বেশি অবহেলা ও দুর্ব্যবহারের শিকার হয়। ইসলাম তাদের সাথে কোমল আচরণ করার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান প্রদর্শন করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (সুনানে তিরমিযী)
অন্য একটি হাদিসে এসেছে, কেউ যদি কোনো অনাথ বা অসহায় শিশুর মাথায় স্নেহের হাত বোলায়, তবে তার হাতের নিচে যতগুলো চুল পড়বে, আল্লাহ তাকে ততগুলো সওয়াব দান করবেন।
২. মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা (অন্ন, বস্ত্র ও আবাসন)
পথশিশুদের খাদ্য, বস্ত্র এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের ওপর আবশ্যক বা ফরজ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তারা আল্লাহর ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মিসকিন (অসহায়), ইয়াতিম এবং বন্দীদের খাদ্য দান করে।" (সূরা আদ-দাহর, আয়াত: ৮)
ইসলামের যাকাত ও সদকা ব্যবস্থার একটি বড় অংশই হলো এই অসহায় মানুষদের পুনর্বাসন করা, যাতে সমাজে কেউ গৃহহীন বা ক্ষুধার্ত না থাকে।
৩. শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়া
পথশিশুরা যাতে বড় হয়ে ভিক্ষাবৃত্তি বা অপরাধে জড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য তাদের দ্বীনি ও কর্মমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা করা জরুরি। ইসলামে জ্ঞান অর্জনকে প্রত্যেকের জন্য ফরজ করা হয়েছে। এই শিশুদের শিক্ষার দায়িত্ব নেওয়া একটি সর্বোত্তম সদকায়ে জারিয়া (স্থায়ী নেক আমল)।
৪. নির্যাতন ও শোষণ থেকে রক্ষা করা
পথশিশুদের দিয়ে জোরপূর্বক ভারী কাজ করানো, মারধর করা বা তাদের পাওনা মজুরি থেকে বঞ্চিত করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। মহান আল্লাহ তাআলা সূরা আদ-দুহায় বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়েছেন:
"অতএব, আপনি ইয়াতিমের প্রতি কঠোর হবেন না। আর সাহায্যপ্রার্থীকে ধমক দেবেন না।" (সূরা আদ-দুহা, আয়াত: ৯-১০)
৫. সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন
ইসলামী সমাজব্যবস্থায় বায়তুল মাল (রাষ্ট্রীয় তহবিল) থেকে অসহায়, অভিভাবকহীন ও পথশিশুদের লালন-পালনের দায়িত্ব নেওয়ার বিধান রয়েছে। ইসলামের প্রথম যুগে খলিফাগণ রাষ্ট্রীয়ভাবে এমন শিশুদের দায়িত্ব নিতেন যাদের কোনো অভিভাবক নেই।
ইসলামের ইতিহাসেএকটি চমৎকার শিক্ষণীয় ঘটনা
একবার ঈদের দিন সকালে রাসুলুল্লাহ (সা.) রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলেন সব শিশু নতুন জামা পরে হাসিমুখে খেলছে, কিন্তু একটি শিশু এক কোণে বসে কাঁদছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) তার কাছে গেলেন, স্নেহের সাথে তার কাঁদার কারণ জানতে চাইলেন। শিশুটি জানাল তার বাবা যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন এবং তার কোনো আশ্রয় নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) আবেগাপ্লুত হয়ে শিশুটির হাত ধরলেন এবং বললেন, "তুমি কি এতে খুশি নও যে, আজ থেকে আমি তোমার বাবা, আয়েশা তোমার মা এবং ফাতেমা তোমার বোন?" এরপর তিনি শিশুটিকে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে ভালো পোশাক ও খাবারের ব্যবস্থা করেন।
পরিশেষে বলা যায়, শিশুশ্রম কোনো একক ব্যক্তি বা পরিবারের সমস্যা নয়, এটি একটি গোটা জাতির ভবিষ্যৎ পঙ্গু করে দেওয়ার মতো সামাজিক ব্যাধি। কেবল আইন প্রণয়ন বা আন্তর্জাতিক দিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন এবং ইসলামের সেই মহান আদর্শের অনুরণন, যেখানে কোমলমতি শিশুদের প্রতি দয়া ও সহানুভূতি দেখানোর কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও ইসলামী শরিয়াহর আলোকেই আমরা একটি শিশুশ্রমমুক্ত, মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারি। আসুন, এই আন্তর্জাতিক শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবসে আমরা প্রতিজ্ঞা করি— কোনো শিশুর শৈশব যেন সস্তায় বিক্রি না হয়, কোনো শিশুর স্বপ্ন যেন কারখানার কালোধোঁয়ায় হারিয়ে না যায়। প্রতিটি শিশুর অধিকার নিশ্চিত করা এবং তাদের মুখে হাসি ফোটানো আমাদের নাগরিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। তবেই গড়ে উঠবে একটি সমৃদ্ধ ও শোষণহীন সুন্দর পৃথিবী।
লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা