Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

আন্তর্জাতিক হচ্ছে যশোর বিমানবন্দর : জাগবে দক্ষিণ-পশ্চিমের অর্থনীতি

ড. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ ড. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১১ জুন,২০২৬, ০৯:১৮ পিএম
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ১১ জুন,২০২৬, ১০:০৯ পিএম
আন্তর্জাতিক হচ্ছে যশোর বিমানবন্দর : জাগবে দক্ষিণ-পশ্চিমের অর্থনীতি

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের রূপরেখা ঘোষণা করেছেন। বাণিজ্য, পরিবহন এবং আঞ্চলিক সংযোগের প্রসারে দেশের চারটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরকে— যশোর, রাজশাহী, কক্সবাজার ও সৈয়দপুর—আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার যে ঐতিহাসিক ঘোষণা তিনি দিয়েছেন, তা দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। একই সাথে একটি সমন্বিত ‘ডিজিটাল লজিস্টিকস প্ল্যাটফর্ম’ চালুর পরিকল্পনাও দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে বহুগুণ ত্বরান্বিত করবে।

এই সময়োপযোগী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তের জন্য যশোরবাসীর পক্ষ থেকে আমরা বর্তমান সরকার ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে জানাই আমাদের প্রাণঢালা অভিনন্দন ও গভীর কৃতজ্ঞতা।বিশেষ করে, মহাকবি মধুসূদন ও সমাজসংস্কারক মেহেরুল্লাহর পুণ্যভূমি এবং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার এই যশোরের বিমানবন্দরটিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার এই সিদ্ধান্ত শুধু যশোরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবিই পূরণ করেনি, বরং এটি এই অঞ্চলের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিকে বৈশ্বিক বাজারে সরাসরি যুক্ত করার এক অভূতপূর্ব সুযোগ এনে দিয়েছে।

দূর ফ্রান্সের ভার্সাই নগরী থেকে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত কপোতাক্ষ নদকে ভালোবেসে লিখেছিলেন—'সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে! / সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে।' আজ মধুসূদনের মতোই এই অঞ্চলের লাখো প্রবাসী মানুষ মাতৃভূমির টানে, প্রিয় যশোরকে ভালোবেসে দূর প্রবাসে গায়ের ঘাম ঝরিয়ে দিনরাত খাটছেন এবং কষ্টার্জিত রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন।

প্রিয় যশোরের কথা তাঁদের মনেও প্রতিনিয়ত অনুরণিত হয়। এতদিন পরবাস থেকে ফেরা বা যাওয়ার পথে ঢাকার বিমানবন্দরে গিয়ে যে চরম ভোগান্তি আর দীর্ঘ যাতায়াতের কষ্ট পোহাতে হতো, এবার তাঁদের এবং এ অঞ্চলের মানুষের সেই লালিত স্বপ্ন ও আশা পূরণ হতে যাচ্ছে। এখন আর কষ্ট করে ঢাকার বিমানবন্দরে যেতে হবে না, ঘরের পাশ থেকেই সরাসরি দূরদেশে যাতায়াত করা সম্ভব হবে।

ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী যশোর বিমানবন্দর

যশোর বিমানবন্দর কেবল একটি যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি এ অঞ্চলের গৌরবময় ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল সময়ে, ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ারফোর্স যখন এখানে যুদ্ধবিমান ওঠানামার ঘাঁটি তৈরি করে, তখন থেকেই এই বিমানযাত্রার সূচনা।১৯৪৫ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম সক্রিয় সামরিক বিমানঘাঁটি ছিল এটি। দেশভাগের পর ১৯৫০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনী এখানে তাদের ঘাঁটি স্থাপন করে এবং পরবর্তীতে ১৯৬০ সালে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক বিমানবন্দর হিসেবে ডানা মেলে।

বর্তমানে এই বিমানবন্দরটি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ঐতিহ্যবাহী 'ঘাঁটি বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান' এবং বিমানবাহিনী একাডেমির প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে, যা এর কৌশলগত গুরুত্বকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।যশোর থেকে প্রতিদিন ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করা হচ্ছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় বিমান সংস্থাগুলো সফলতার সাথে এখানে তাদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। তবে একে আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত করার এই ঘোষণা বিমানবন্দরটির দীর্ঘ পথচলায় সবচেয়ে বড় মাইলফলক।

যশোর সমাচার

১৭৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত যশোর বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন এবং বৃহত্তম জেলা। এটি দেশের প্রথম শত্রুমুক্ত ও স্বাধীন জেলা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এই লীলাভূমি আনুমানিক ১৪৫০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে সুফি সাধক খান জাহান আলীর স্মৃতিবিজড়িত মুড়লী কসবা থেকে শুরু করে ১৫৫৫ সালের প্রতাপাদিত্যের যশোর রাজ্য গঠন পর্যন্ত দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ইতিহাসের ধারক। ১৮৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত যশোর জিলা স্কুল এবং ১৮৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত যশোর পাবলিক লাইব্রেরি এ অঞ্চলের শিক্ষা ও মননশীলতার গভীরতার প্রমাণ দেয়। ভৈরব নদের তীরে গড়ে ওঠা এই সমৃদ্ধ জেলাটি এখন পরিণত হতে যাচ্ছে দেশের অন্যতম আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বারে।

অর্থনীতির অনুঘটক: বেনাপোল ও নওয়াপাড়া

যশোরের অর্থনৈতিক সক্ষমতা দেশের অনেক জেলার চেয়ে অনন্য। দেশের সর্ববৃহৎ ও প্রধান স্থলবন্দর 'বেনাপোল' এই জেলার শার্শা উপজেলায় অবস্থিত। ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের সিংহভাগই সম্পাদিত হয় বেনাপোল ও ওপারস্থ পেট্রাপোল স্থলবন্দরের মাধ্যমে। সরকারের রাজস্ব আহরণের অন্যতম প্রধান উৎস এই বন্দর। আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা এবং কাস্টমস ক্লিয়ারিং এজেন্টদের কর্মব্যস্ততা এখানকার লাখো মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস।

নওয়াপাড়া ব্যবসার অন্যতম মূল কেন্দ্র। ভৈরব নদের অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই শিল্পশহরটি নৌ-বাণিজ্যে এক বিশাল হাব। দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী আকিজ গ্রুপসহ অসংখ্য পাটকল ও সার-কয়লার ব্যবসা নওয়াপাড়ার অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে। যশোর বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপ নিলে ভারত ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা সরাসরি বেনাপোল ও নওয়াপায়ায় যাতায়াত করতে পারবেন। এতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) বৃদ্ধি পাবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের জটিলতা অনেকাংশে কমে যাবে।

ফুল ও সবজি রপ্তানির অফুরন্ত ভাণ্ডার

যশোরকে দেশের 'ফুলের রাজধানী' বলা হয়। ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী অঞ্চলে উৎপাদিত রজনীগন্ধা, গোলাপ, জারবেরা, গ্ল্যাডিওলাসসহ নানা জাতের ফুল আজ সারা দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।

একই সাথে সবজি চাষে যশোর এক বিপ্লব ঘটিয়েছে। বিগত বছরগুলোতে যশোরের মণিরামপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রায় ১ হাজার ৩২৫ মেট্রিক টন পটোল, বাঁধাকপি, পেঁপে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেকগুলো দেশে রপ্তানি করা হয়েছে। কৃষকেরা ক্ষতিকারক রাসায়নিক ও কীটনাশকমুক্ত নিরাপদ সবজি চাষের আধুনিক প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করছেন।

সবজি ও ফুলের মতো পচনশীল পণ্য রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাধা ছিল সরাসরি বিমান যোগাযোগের অভাব। যশোর বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তরিত হলে এবং এখানে কার্গো হ্যান্ডলিং ও কোল্ড স্টোরেজ সুবিধা নিশ্চিত করা হলে, মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গদখালীর তাজা ফুল আর মণিরামপুরের তাজা সবজি মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপের বাজারে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। এটি আমাদের দেশের কৃষি খাতের জন্য এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। এছাড়া, যশোরের অর্থনীতির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হলো রেণু-পোনা উৎপাদন ও গলদা-বাগদা চিংড়ি চাষ। আন্তর্জাতিক বিমান সংযোগ এই চিংড়ি রপ্তানি প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল ও লাভজনক করে তুলবে।

মাল্টিপ্লায়ার প্রভাব ও সম্ভাবনা

যশোর বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক হলে শুধু যশোর নয়, পুরো খুলনা বিভাগ তথা মোংলা বন্দর ও প্রস্তাবিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র সংলগ্ন অঞ্চলের সাথে বৈশ্বিক যোগাযোগ সহজ হবে। এটি একটি সমন্বিত যাত্রী ও লজিস্টিকস কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সংলগ্ন হওয়ায় এই রুটটি কলকাতা কিংবা উত্তর-পূর্ব ভারতের সাথে আকাশপথের দূরত্ব ও খরচ অনেকাংশে কমিয়ে আনবে।

অবকাঠামোগত আধুনিকীকরণের অংশ হিসেবে টার্মিনাল সুবিধা সম্প্রসারণ এবং রানওয়ের সক্ষমতা বাড়ানোর যে কাজ এখন চলছে, তা দ্রুত সমাপ্ত করা প্রয়োজন। একই সাথে অর্থমন্ত্রীর ঘোষিত 'জাতীয় বিমান সংযোগ গ্রিড' এবং 'সমন্বিত ডিজিটাল লজিস্টিকস প্ল্যাটফর্ম' বাস্তবায়িত হলে দেশের সামগ্রিক আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন আসবে।

মূলকথা হলো, পরিকল্পনা যত চমৎকারই হোক না কেন, তার সাফল্য নির্ভর করে দ্রুত এবং সঠিক বাস্তবায়নের ওপর। যশোর বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বারে রূপান্তরের কাজ যাতে লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে আটকে না যায়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলে শুধু যশোর নয়, গোটা দেশের অর্থনৈতিক চেহারা বদলে যাবে।

বাজেটে দেশের বিমান চলাচল খাতকে বৈশ্বিক বাণিজ্য নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত করার এই দূরদর্শী ও সাহসী পদক্ষেপের জন্য সমগ্র যশোরবাসীর পক্ষ থেকে আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী এবং বর্তমান সরকারকে আবারও আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাই। যশোরবাসীর পক্ষ থেকে আমাদের প্রত্যাশা, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বারের কার্যক্রম শুরু হবে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমের এই পুণ্যভূমি বিশ্বমঞ্চে তার যোগ্য আসনটি দখল করে নেবে।

ড. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ: ধ্রুব নিউজের উপদেষ্টা সম্পাদক

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)