ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
১৯৭৬ সালের ১৬ মে; তপ্ত রোদে পুড়তে থাকা উত্তরবঙ্গের আকাশে সেদিন ছিল অধিকার আদায়ের এক বজ্রনিঘোষ। মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে লক্ষ লক্ষ মানুষের সেই ঐতিহাসিক ‘ফারাক্কা লং মার্চ’ আজ কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং বাংলাদেশের পানিসম্পদ রক্ষার ইতিহাসে এক ‘মরণ জয়ী মিছিলের’ মহাস্মৃতি। অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে এসে আজ যখন আমরা সেই লং মার্চের ৫০ বছর পালন করছি, তখন কেবল স্মৃতিকাতরতা নয়, বরং আমাদের সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—ফারাক্কা বাঁধের সেই দীর্ঘস্থায়ী অভিঘাত এবং বাংলাদেশের অমীমাংসিত পানি নীতি। অভিন্ন নদীর ওপর উজানের একতরফা নিয়ন্ত্রণ কীভাবে আমাদের কৃষি, পরিবেশ এবং মানচিত্রকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে, তা বিশ্লেষণের দাবি রাখে। ফারাক্কার ৫০ বছরের এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের পানির ন্যায্য হিস্যা ও বর্তমান জল-রাজনীতির গভীর সমীকরণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল।
ফারাক্কা বাঁধের পটভূমি ও বর্তমান বাস্তবতা
১৯৭৫ সালে ভারত গঙ্গার পানির গতিপথ পরিবর্তনের জন্য ফারাক্কা বাঁধটি চালু করে। উদ্দেশ্য ছিল কলকাতা বন্দরকে পলিযুক্ত হওয়া থেকে রক্ষা করা। কিন্তু এই একটি বাঁধ বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ এবং অর্থনীতিতে যে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষত সৃষ্টি করেছে, তার চড়া মূল্য আমরা আজও দিয়ে যাচ্ছি।
গঙ্গার উজানে এই একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে আমাদের নদীগুলো মরুভূমিতে পরিণত হয়। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় কৃষি সেচ ব্যাহত হচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে।
পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়
ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লোনা পানির অনুপ্রবেশ বেড়েছে। সুন্দরবনের মতো স্পর্শকাতর ম্যানগ্রোভ বন আজ সংকটের মুখে। যখন শুষ্ক মৌসুমে আমাদের এক ফোঁটা পানির জন্য হাহাকার করতে হয়, ঠিক তখনই বর্ষাকালে ভারত বাঁধের গেটগুলো খুলে দিলে বাংলাদেশে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ, আমরা খরা এবং বন্যা—উভয় সংকটের আবর্তে বন্দি।
চুক্তিটির মৌলিক দিকগুলো
১. চুক্তির মেয়াদ ও পর্যালোচনা
এই চুক্তিটি ৩০ বছর মেয়াদী (১৯৯৬-২০২৬)।
প্রতি ৫ বছর অন্তর বা প্রয়োজনে তার আগেও উভয় পক্ষ চুক্তির কার্যকারিতা পর্যালোচনা করতে পারবে। যদি কোনো পক্ষ মনে করে যে বণ্টন ব্যবস্থা কাজ করছে না, তবে আলোচনা সাপেক্ষে পরিবর্তন আনা সম্ভব।
২. পানি বণ্টনের ফর্মুলা
চুক্তি অনুযায়ী ফারাক্কা পয়েন্টে পানির লভ্যতার ওপর ভিত্তি করে একটি নির্দিষ্ট অনুপাত বা 'শিডিউল' নির্ধারণ করা হয়:
যদি ফারাক্কায় পানির প্রবাহ ৭০,০০০ কিউসেক বা তার কম হয়: তবে উভয় দেশ ৫০% করে পানি পাবে।
যদি প্রবাহ ৭০,০০০ থেকে ৭৫,০০০ কিউসেক হয়: তবে বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবে ৩৫,০০০ কিউসেক পানি পাবে এবং বাকি অংশ ভারত পাবে।
যদি প্রবাহ ৭৫,০০০ কিউসেক বা তার বেশি হয়: তবে ভারত ৪০,০০০ কিউসেক পানি পাবে এবং বাকি অংশ বাংলাদেশ পাবে।
৩. গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা ক্লজ (১০ দিনের পর্যায়কাল)
শুষ্ক মৌসুমে (১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে) পানি বণ্টনের জন্য ১০ দিনের একেকটি পর্যায় বা 'Cycle' ভাগ করা হয়। এর মধ্যে:
মার্চের শেষ থেকে মে মাসের শুরু পর্যন্ত অত্যন্ত সংকটাপন্ন সময়ে উভয় দেশ যেন অন্তত তিনটি করে ১০ দিনের ব্লক পায়, যেখানে তারা নিশ্চিতভাবে ৩৫,০০০ কিউসেক পানি পাবে।
৪. যৌথ নদী কমিশন (JRC)
চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য একটি যৌথ পর্যবেক্ষণ দল গঠনের বিধান রাখা হয়। এই কমিটি প্রতিদিন ফারাক্কায় গঙ্গার পানির প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করে এবং উভয় দেশের ডাটা বা তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করে।
৫. ঐতিহাসিক গড় প্রবাহের ওপর ভিত্তি
১৯০১ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ফারাক্কায় গঙ্গার পানির গড় প্রবাহের যে তথ্য ছিল, তাকেই এই চুক্তির ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে।
৬. নতুন পানিবণ্টন চুক্তির সুযোগ
চুক্তিতে উল্লেখ ছিল যে, কেবল গঙ্গা নয়, অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের ক্ষেত্রেও উভয় দেশ সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করবে।
বাংলাদেশের প্রধান আশঙ্কাসমূহ
১. চুক্তির মেয়াদ ও নবায়ন: ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালেই শেষ হতে যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার আসার পর এই চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর রাজ্য সরকারের চাপ কতটা থাকবে বা তারা বাংলাদেশের স্বার্থকে কতটা গুরুত্ব দেবে, তা নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে।
২. উগ্র জাতীয়তাবাদী নীতি: বিজেপির 'আগে নিজের দেশ' বা অভ্যন্তরীণ স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার নীতি অনেক সময় প্রতিবেশী দেশের সাথে পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের সেচ চাহিদা মেটাতে গিয়ে ফারাক্কায় পানির প্রবাহ আরও কমিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
৩. অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ব্যবহার: তিস্তা বা গঙ্গার পানি বণ্টন ইস্যুটিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে (বিশেষ করে নির্বাচনে ভোটারদের তুষ্ট করতে) ব্যবহার করা হলে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
৪. পরিবেশগত ঝুঁকি: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গঙ্গার পানি প্রবাহ এমনিতেই কমছে। এর মধ্যে উজানে নতুন কোনো সেচ প্রকল্প বা পানি প্রত্যাহারের পরিকল্পনা নেওয়া হলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল স্থায়ী মরুকরণের দিকে যেতে পারে।
আমাদের করণীয়
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয়ের ফলে উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
১. আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা: পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের সাথে কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন করা। বিশেষ করে ২০২৬ সালে গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই একটি সম্মানজনক ও টেকসই নবায়ন নিশ্চিত করা।
২. যৌথ নদী কমিশনের সক্রিয়তা: জেআরসি-এর (Joint River Commission) বৈঠকগুলো নিয়মিত করা এবং উপাত্ত বা ডেটা বিনিময়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যাতে শুষ্ক মৌসুমে পানির সঠিক হিসাব পাওয়া যায়।
৩. আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ: জাতিসংঘ জলধারা আইন (UN Watercourses Convention, 1997) অনুযায়ী আন্তঃসীমান্তীয় নদীর পানির ওপর ভাটির দেশের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক জনমত গঠন করা।
৪. বেসিন-ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা: শুধু ফারাক্কা পয়েন্টে পানি না চেয়ে বরং গঙ্গা অববাহিকার (নেপাল-ভারত-বাংলাদেশ) সামগ্রিক পানি ব্যবস্থাপনার জন্য আঞ্চলিক আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া।
৫. অভ্যন্তরীণ বিকল্প তৈরি: গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পের মতো বড় পানির আধার নির্মাণের বিষয়টি পুনরায় খতিয়ে দেখা এবং আমাদের নিজস্ব নদীগুলোর ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানো, যাতে ভারত থেকে পানি কম পেলেও আমরা সংকট মোকাবিলা করতে পারি।
পরিশেষে বলা যায়, ১৬ মে ২০২৬ সাল,ফারাক্কা অভিমুখে সেই ‘মরণ জয়ী মিছিলের’ ৫০ বছর কেবল একটি ঐতিহাসিক তারিখ নয়, বরং এটি আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের এক জীবন্ত স্মারক। মওলানা ভাসানী যে বিপদের সংকেত আধা শতাব্দী আগে দিয়েছিলেন, আজ বাংলাদেশের মরুপ্রক্রিয়া এবং লোনাপানির আগ্রাসন তারই সাক্ষ্য দিচ্ছে। তবে কেবল প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ না থেকে এখন সময় এসেছে আন্তর্জাতিক নদীর পানি বণ্টন আইন অনুযায়ী আমাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে বৈশ্বিক পর্যায়ে বলিষ্ঠ কূটনৈতিক তৎপরতা চালানোর। গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার জীবন-জীবিকাকে বাঁচাতে হলে ‘অমীমাংসিত জল নীতির’ অবসান ঘটিয়ে একটি টেকসই ও বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধান জরুরি। ফারাক্কা লং মার্চের এই সুবর্ণ জয়ন্তীতে আমাদের শপথ হওয়া উচিত—প্রকৃতি ও মানুষের অধিকার রক্ষায় জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সজীব ও সুজলা-সুফলা বাংলাদেশ নিশ্চিত করা।
লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা