এএসএম জিল্লুর রশীদ
সম্প্রতি শিশু শিক্ষার্থীদের ভর্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান 'লটারি পদ্ধতি'র পরিবর্তে পুনরায় 'ভর্তি পরীক্ষা' চালুর দাবি নিয়ে শিক্ষা অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। একজন কোচিং ব্যবসায়ী সংসদ সদস্যের আবেদনের প্রেক্ষিতে বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। একসময় ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি প্রচলিত ছিল, কিন্তু নানাবিধ অনিয়ম ও অভিযোগের মুখে বিশেষজ্ঞ মহলের পরামর্শে লটারি পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়। এযাবৎকাল এই পদ্ধতিটি বেশ সফলভাবেই চলছে। এই প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা অনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই; সম্পূর্ণ সফটওয়্যার-ভিত্তিক এই ব্যবস্থা মানুষের প্রভাব ছাড়াই স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়। এর ফলে পিছিয়ে পড়া ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মেধাবী সন্তানরাও সরকারি নামী স্কুলে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে, যা রাষ্ট্রের সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার নীতির সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ।
তবে মূল সমস্যাটি অন্য জায়গায়। লটারি পদ্ধতির ফলে কিছু স্বার্থান্বেষী কায়েমি স্বার্থবাদী শিক্ষা ব্যবসায়ীর ব্যবসায়িক স্বার্থ ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে যারা ভর্তি কোচিং পরিচালনা করেন এবং পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাই করা 'মেধাবী' শিক্ষার্থী ভর্তি করে তথাকথিত ভালো ফলাফলের বিজ্ঞাপন দিয়ে শিক্ষা-বাণিজ্য চালিয়ে আসছিলেন, তারা শুরু থেকেই এই ব্যবস্থার বিরোধিতা করে আসছেন। তারা লটারি পদ্ধতি বাতিলের জন্য নানা ধরনের ফন্দি-ফিকির ও অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।
আমাদের বুঝতে হবে যে, পরীক্ষা বা টেস্ট হলো নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর কাঠামোবদ্ধ পদ্ধতিতে মান যাচাই মাত্র। এটি কখনোই একটি শিশুর সামগ্রিক মেধা, বিশেষ প্রবণতা কিংবা তার মানবিক গুণাবলী যেমন—সততা, ন্যায়পরায়ণতা, নেতৃত্ব বা ভ্রাতৃত্ববোধ পরিমাপ করতে পারে না। প্রতিটি শিশুর আগ্রহের জায়গা ভিন্ন। শিক্ষা কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয়; জীবন গঠনের প্রয়োজনীয় সব গুণাবলীই শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কেবলমাত্র খাতা-কলমের পরীক্ষার মাধ্যমে এসব গুণাবলী মূল্যায়ন সম্ভব নয়। তাই ভর্তির এই অসম প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শিশুদের 'যোগ্য' বা 'অযোগ্য' তকমা দিয়ে দেওয়া সঠিক নয়। তদুপরি, আমাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে অধিকাংশ পরীক্ষা পদ্ধতিই শতভাগ ত্রুটিমুক্ত নয়। জীবনের শুরুতেই শিশুকে এমন এক বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি করে দেওয়া তার মনে অসততার বীজ বপন করতে পারে, যা দেশ ও সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর।
'পরীক্ষা' শব্দটি অধিকাংশ শিশুর কাছেই আতঙ্কের নাম। মাত্র ৫-৭ বছর বয়সী শিশুর ওপর ভর্তি পরীক্ষার মতো কঠিন প্রতিযোগিতামূলক বোঝা চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই মনোবিজ্ঞানসম্মত নয়। শিশুর শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি বা সক্ষমতা (Maturity) তৈরি হওয়ার আগেই তার ওপর সাফল্যের চাপ সৃষ্টি করা হলে তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। শৈশবের এই মানসিক আঘাত সারাজীবনের জন্য শিশুর ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।
"দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণ করো।" শিক্ষার ভিত্তি রচিত হয় শৈশবে। মানুষের মন কোনো যান্ত্রিক সুইচ নয় যে নিয়ম মেনে চলবে। এর বিকাশে প্রয়োজন বিজ্ঞানসম্মত পথ ও পদ্ধতি। শিশুমন সহজাতভাবেই চঞ্চল ও অনুসন্ধানী। আনন্দের মাধ্যমে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই শিখনের সাফল্য নিশ্চিত করে। জোর করে চাপিয়ে দিলে তার মধ্যে ভীতি ও অনীহার সৃষ্টি হয়
প্রত্যেক শিশু দেশের অমূল্য সম্পদ। তাদের মধ্যে লুকিয়ে থাকে অমিত সম্ভাবনা। তাই প্রতিটি শিশুকে যোগ্য ও দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। শৈশব থেকেই, এমনকি মাতৃগর্ভ থেকেই শিশুর সঠিক পরিচর্যা প্রয়োজন। উন্নত জাতিগুলো যেমন—ইহুদিরা গর্ভধারণের সময় থেকেই পরিকল্পিত যত্ন শুরু করে, যার ফলে তারা বিশ্বকে অসংখ্য সফল কৃতি সন্তান উপহার দিতে পারছে। কিন্তু আমাদের সমাজে গর্ভধারিণী মা ও শিশুরা প্রায়শই অবহেলিত। তাদের জন্য আমাদের বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনার অভাব রয়েছে।
শিশুকে দক্ষ করে গড়ে তোলার প্রধান মাধ্যম হলো শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। হাদিসে বলা হয়েছে, "দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণ করো।" শিক্ষার ভিত্তি রচিত হয় শৈশবে। মানুষের মন কোনো যান্ত্রিক সুইচ নয় যে নিয়ম মেনে চলবে। এর বিকাশে প্রয়োজন বিজ্ঞানসম্মত পথ ও পদ্ধতি। শিশুমন সহজাতভাবেই চঞ্চল ও অনুসন্ধানী। আনন্দের মাধ্যমে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই শিখনের সাফল্য নিশ্চিত করে। জোর করে চাপিয়ে দিলে তার মধ্যে ভীতি ও অনীহার সৃষ্টি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে তার শিক্ষা জীবনকে ব্যাহত করে।
শিক্ষা জীবন কোনো ১০০ মিটার স্প্রিন্ট দৌড় নয় যে শুরুতেই সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে দৌড়াতে হবে। এটি মূলত ২০-২৫ বছরের একটি দীর্ঘ ম্যারাথন। এখানে শুরুতে ধৈর্য ধরে ও দম বজায় রেখে লক্ষ্যপানে এগোতে হয়। শুরুতে অতিরিক্ত দৌড়াতে বাধ্য করলে মাঝপথে শিশু খেই হারিয়ে ফেলে। সফল ব্যক্তিদের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাদের অনেকেই প্রাথমিক স্তরে খুব একটা উজ্জ্বল ছাত্র ছিলেন না, অথচ যারা শুরুতে অতি-মেধাবী ছিল তাদের অনেকেই চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেননি।
সাফল্যের জন্য মেধার চেয়েও বেশি প্রয়োজন প্রেষণা বা ইচ্ছাশক্তি। শিশুর মনে পড়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি করাই হলো আসল শিক্ষা। ঠেলাগাড়িকে যেমন ঠেলে বেশিক্ষণ নেওয়া যায় না, তেমনই জোর করে শিশুকে দীর্ঘকাল পড়ানো সম্ভব নয়। বরং শিশুর মধ্যে যদি পড়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করা যায়, তবে সে অটোগাড়ির মতো নিজের শক্তিতেই সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছে যাবে। শৈশবে অতি-চাপযুক্ত স্কুল, বিজাতীয় ভাষা, বইয়ের ভার এবং অসম প্রতিযোগিতা শিশুর বিকাশে বড় অন্তরায়। তাই বাড়ি সংলগ্ন খোলামেলা ও পরিচিত পরিবেশের স্কুলই শিশুর জন্য শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আপনার নেতৃত্বে যে নতুন বাংলাদেশের অভিযাত্রা শুরু হয়েছে, সেখানে কোমলমতি শিশুদের শৈশব যেন কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের হাতে জিম্মি না হয়। আজ একদল সুযোগসন্ধানী চক্র আবারও ভর্তি পরীক্ষার সেই বৈষম্যমূলক কালো অধ্যায় ফিরিয়ে আনার অপচেষ্টা করছে।
তথাকথিত নামী স্কুলগুলো যারা বাছাই করা বিত্তবান ও তথাকথিত মেধাবী শিশুদের ভর্তি করিয়ে ভালো ফলাফল দেখায়, তাদের শ্রেষ্ঠত্ব আসলে প্রশ্নসাপেক্ষ। দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে জরিপ করলে দেখা যাবে, শিক্ষার্থীদের বড় অংশই কোনো গ্রামীন বা সাধারণ স্কুল থেকে উঠে এসেছে।
পরিশেষে বলা যায়, লটারি পদ্ধতি শিশুদের ভর্তি যুদ্ধের নির্মম নির্যাতন থেকে মুক্তি দেয়। এটি মেধার কেন্দ্রীকরণ রোধ করে শিক্ষার সুষম বণ্টন নিশ্চিত করে এবং কোচিং বাণিজ্যের অবসান ঘটায়। তাই নবনির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার ও মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর কাছে জনগণের প্রত্যাশা—এই আত্মঘাতী ও পেছনের দিকে হাঁটার চিন্তা থেকে সরে এসে লটারি পদ্ধতি বহাল রাখুন।
সর্বোপরি, আমি পরম শ্রদ্ধার সাথে আগামীর সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আপনার নেতৃত্বে যে নতুন বাংলাদেশের অভিযাত্রা শুরু হয়েছে, সেখানে কোমলমতি শিশুদের শৈশব যেন কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের হাতে জিম্মি না হয়। আজ একদল সুযোগসন্ধানী চক্র আবারও ভর্তি পরীক্ষার সেই বৈষম্যমূলক কালো অধ্যায় ফিরিয়ে আনার অপচেষ্টা করছে। স্মার্ট ও আধুনিক বাংলাদেশের কারিগর যারা হবে, তাদের শৈশবকে প্রতিযোগিতার যাঁতাকলে পিষ্ট না করে আনন্দের মাধ্যমে বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিশ্চিত করতে আপনার বলিষ্ঠ হস্তক্ষেপ কামনা করছি। মেধা ও সাম্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুষ্ঠু বিকাশে আপনি সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে প্রতিটি শিশুকে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ দেবেন—এটাই আমাদের সবার প্রত্যাশা।
লেখক: উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (অব.)