গাজী মুকিতুল হক
আমরা এমন এক সময়ের মানুষ, যখন হাতে বানানো ঈদ কার্ডেই মিশে থাকত অকৃত্রিম ভালোবাসা। অল্প ক’টা টাকার সেলামি-ই রাঙিয়ে দিত সারা দিন। আর মায়ের হাতের রান্না করা সেই অমৃতের স্বাদ মনে পড়লে আজও জিভে পানি চলে আসে।
করোনা মহামারীর সময়ের ঈদের কথা ভাবলে এক ধরণের অস্বস্তি কাজ করে।না ছিল ঘরে কোনো অতিথি, না ছিল আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ। খুব অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঘুম থেকে উঠে নতুন জামা পরে ঈদের বিশেষ পোলাও-কোরমার টেবিলে বসেছিলাম।খাওয়ার এক ঘণ্টা পরেই আবার ঘুম। ঘুমানোর আগে দেখছিলাম ফেসবুকের সেই সব ডিজিটাল মেসেজ, যা এমন সব মানুষের পাঠানো যাদের সাথে কোনোদিন হাই-হ্যালো পর্যন্ত হয়নি। সেই পানসে দিনে একমাত্র প্রাপ্তি ছিল মায়ের হাতের সেই 'থ্রি-কোর্স মিল'—যেকোনো মন খারাপের মোক্ষম ওষুধ।
মহামারি গেছে সেই কবে কিন্তু ঘরবন্দি ঈদের রেশ যেন রয়েই গেছে।অদৃশ্য সেই ভাইরাস চলে গেলেও আমরা এক অদৃশ্য যান্ত্রিক দেয়ালের ভেতর নিজেদের বন্দি করে ফেলেছি। মহামারি না থাকলেও আমাদের ঈদ উদযাপন এখন মূলত ঘরবন্দি আর স্ক্রিন-নির্ভর।
শৈশবের 'রোজার ঈদ' এখন কেবল নস্টালজিয়া জাগায় না, বরং মনের কোণে এক গভীর বিষাদ তৈরি করে। মনে পড়ে সেই 'চাঁদ রাত'-এর কথা। ইফতারের পর চলত সেই অধীর অপেক্ষা—কখন বিটিভিতে বেজে উঠবে নজরুলের সেই কালজয়ী সুর: ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ...’। এই গানটি বাজলেই যেন চারদিকের সব আনন্দ বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসত।
পুরনো দিনের ঈদের প্রস্তুতি মানেই ছিল বড় বড় ডেকচিতে দুধ জ্বাল দেওয়া। সেই ঘন দুধ দিয়ে তৈরি হতো ঈদের দুই অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ—সেমাই আর ফিরনি। এলাচ-দারুচিনির সেই ম ম সুবাস সারা বাড়িতে ঘুরে বেড়াতো। ছিল মেহেদি পরার উৎসব। লাইন দিয়ে ছোটদের হাত রাঙিয়ে দেওয়া হতো। বয়স বাড়ার সাথে সাথে হাতের সেই লাল রঙের মোহ ফিকে হয়ে এলো। উঠানে দৌড়াদৌড়ির বদলে তখন জায়গা নিল ঈদের ছুটির পরেই শুরু হতে যাওয়া পরীক্ষার দুঃশ্চিন্তা। শৈশবের সেই দুঃশ্চিন্তাহীন জীবনটা কখন যেন হারিয়ে গেল!
স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের আগ্রাসন ছাড়াই বড় হওয়া ৯০-এর দশকের সেই প্রজন্মই বোধহয় সবচেয়ে সুখী ছিল। তখন হাতে বানানো ঈদ কার্ডের চল ছিল, মচমচে ২ বা ৫ টাকার নোটের সেই চমৎকার ঘ্রাণ ছিল। মায়ের হাতের চিকেন রোস্টের সেই সুবাস আর বিটিভিতে ঈদের নাটক দেখার জন্য পুরো পরিবারের এক হওয়া—এই সবকিছুর সাথে কি আজকের ডিজিটাল শুভেচ্ছার তুলনা চলে?
বাংলাদেশে ঈদ উদযাপনের ধরনে এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে। এখনকার আধুনিক কিশোর-কিশোরীদের ঈদ মানেই নামী দামী ক্যাফে বা রেস্টুরেন্টে আড্ডা। গ্রুপের যার আইফোন আছে তাকে দিয়ে জুতসই হ্যাশট্যাগ সহ সেলফি তোলাটাই এখন পরম আরাধ্য। বাবা-মায়ের সাথে দরদাম করে কেনাকাটার সেই দিনগুলো এখন ই-কমার্সের 'ফেসবুক লাইভ'-এ বন্দি। যানজট আর দরদামের ঝামেলা কমলেও, সেই পছন্দের জামাটি হাতে নিয়ে উত্তেজনায় বাড়ি ফেরার আনন্দ কি পিক্সেলের পর্দায় খুঁজে পাওয়া সম্ভব?
প্রযুক্তি আমাদের জীবন সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে মানুষের প্রতি মানুষের সেই গভীর মায়া আর পরম মমতা। আগে মাটির ব্যাংকে জমানো ঈদের সেলামির সেই মচমচে নোটের ঘ্রাণে যে তৃপ্তি ছিল, আজকের বিকাশে আসা ডিজিটালের অংকে তা খুঁজে পাওয়া ভার। ভিডিও কলে হয়তো মুখ দেখা যায়, কিন্তু সেই বুক ভরা ‘কোলাকুলি’র উষ্ণতা কি আর পিক্সেলের পর্দায় ধরা পড়ে?
আজকালকার ঈদ যেন ক্রমে এক যান্ত্রিক খোলসে বন্দি হয়ে পড়ছে। মানুষের সান্নিধ্য ছাড়া কেবল স্ক্রিনের আলোয় যে ঈদ, তা আসলে উৎসব নয়, বরং এক ধরণের যান্ত্রিক একাকীত্ব। আমাদের বর্তমানের তরুণ থেকে বৃদ্ধ—সবাই যেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই বেশি আবিষ্ট হয়ে থাকেন। মানুষের সাথে সরাসরি কথা বলার চেয়ে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকাই যেন এখনকার দস্তুর। সামাজিক মাধ্যমে অন্যের আপলোড করা রঙিন ছবিতে নজর দিলেই যেন ঈদ শেষ হয়ে যায়!
বলা যায় ‘বোবা নিঃসঙ্গ ঈদ’। চারপাশে শোরগোল আছে, ইনবক্স ভরা মেসেজ আছে, কিন্তু নেই হৃদয়ের সেই অকৃত্রিম টান। এই নিঃসঙ্গতা আমাদের উৎসবের প্রাণটুকু শুষে নিচ্ছে।
লেখক: ধ্রুব নিউজের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক