Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও ঈদ আনন্দ: মানবিক ও নৈতিক আত্মোপলব্ধি

ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ,২০২৬, ০৪:১৪ পিএম
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ,২০২৬, ০১:৩২ পিএম
মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও ঈদ আনন্দ: মানবিক ও নৈতিক আত্মোপলব্ধি

আকাশের এককোণে বাঁকা চাঁদ উঁকি দিলেই বিশ্বের কোটি কোটি মুসলিম হৃদয়ে খুশির হিল্লোল বয়ে যায়। ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই মিলন, আর এক মাস সিয়াম সাধনার পর প্রাপ্তির পরম তৃপ্তি। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই কালজয়ী সুর— "রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ"— আমাদের মনে করিয়ে দেয় ত্যাগের পর আনন্দের মাহাত্ম্য। কিন্তু ২০২৪ সালের এই পবিত্র ঈদ কি আমাদের কাছে সেই চেনা আমেজ নিয়ে এসেছে? উত্তরটা খুঁজতে গেলে অবধারিতভাবেই আমাদের দৃষ্টি চলে যায় পশ্চিমের দিগন্তে, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন আতশবাজির বদলে বারুদের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। উৎসবের সেমাইয়ের মিষ্টি স্বাদের চেয়েও যেন গাজার রক্ত আর কান্নার নোনতা স্বাদ আজ বিশ্ববিবেকের দরজায় কড়া নাড়ছে।

ঈদের দর্শন ও বর্তমান বাস্তবতা

ঈদের প্রকৃত দর্শন হলো 'ত্যাগ'। হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ত্যাগের মহিমা থেকে যে উৎসবের সূচনা, তার মূল সুর হলো নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে বৃহত্তর কল্যাণে আত্মনিয়োগ করা। রমজান আমাদের শিখিয়েছে ধৈর্য এবং সংযম। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে সেই সংযম আর ত্যাগের শিক্ষা কতটুকু প্রতিফলিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে। একদিকে যখন আমরা বিলাসবহুল আয়োজন আর নতুন পোশাকের উৎসবে মত্ত, অন্যদিকে আমাদেরই ভাই-বোনেরা মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত মরুর বুকে নিজ রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে। ঈদ যেখানে ভ্রাতৃত্বের জয়গান গায়, সেখানে আধুনিক বিশ্বের ভূ-রাজনীতি আর ক্ষমতার লিপ্সা সেই ভ্রাতৃত্বকে আজ খণ্ড-বিখণ্ড করে দিয়েছে।

গাজার মানবিক বিপর্যয়: একটি পরিকল্পিত গণহত্যা

গত কয়েক মাস ধরে ফিলিস্তিনের গাজায় যা ঘটছে, তাকে কেবল 'সংকট' বললে সত্যের অপলাপ হবে; এটি একটি পরিকল্পিত গণহত্যা ও চরম মানবিক বিপর্যয়। যে শিশুরা ঈদের দিনে নতুন জামা পরে মেলায় যাওয়ার কথা ছিল, তাদের অনেকেই আজ ধুলোবালির নিচে চিরনিদ্রায় শায়িত। গাজার আকাশে এখন ঈদের চাঁদ নয়, বরং ড্রোন আর যুদ্ধবিমানের শব্দ আতঙ্ক ছড়ায়।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় উন্মুক্ত কারাগার হিসেবে পরিচিত গাজায় আজ উৎসবের পরিবর্তে চলছে শোকের মাতম। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার হওয়া প্রতিটি শিশুর প্রাণহীন দেহ যেন আমাদের ঈদ আনন্দকে বিদ্ধ করছে। ক্ষুধা আর তৃষ্ণায় কাতর গাজাবাসীর কাছে ঈদের সেমাই বা পোলাও আজ এক সুদূরপ্রসারী বিলাসিতা। আমাদের উৎসবের টেবিলে যখন খাবারের সমারোহ থাকবে, তখন গাজার কোনো এক ধ্বংসস্তূপের নিচে দাঁড়িয়ে কোনো এক মা হয়তো তার সন্তানের জন্য এক ফোঁটা পানির আর্তনাদ করছেন। এটি কেবল একটি অঞ্চলের লড়াই নয়, বরং এটি মানবতা বনাম বর্বরতার লড়াই।

ইরান-ইসরায়েল সরাসরি সংঘাত: নতুন মেঘের ঘনঘটা

এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুক্ত হয়েছে নতুন ভয়ানক কালো মেঘ— ইরান ও ইসরায়েলের সরাসরি সংঘাতের বিভীষিকাময় দৃশ্য। গত কয়েক দশকের ছায়াযুদ্ধ ছাপিয়ে এখন তা সরাসরি মুখোমুখি সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। সিরিয়ার কনস্যুলেটে হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরানের পাল্টাহামলা পুরো অঞ্চলকে এক মহাযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই উত্তেজনা কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে তছতছ করে দিচ্ছে।

ইরানের উত্তপ্ত আকাশ আর ইসরায়েলি হামলার হুমকি মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষের মনে স্থায়ী ভয়ের সঞ্চার করেছে। যখন একটি অঞ্চলের মানুষ জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন পাশের দেশের উৎসবের রং ফ্যাকাশে হতে বাধ্য। যুদ্ধের এই দামামা কেবল ভূ-রাজনৈতিক বিষয় নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতি এবং আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মুদ্রাস্ফীতি আর অস্থিরতা আমাদের মধ্যবিত্তের ঈদের আনন্দকেও সংকুচিত করে দিচ্ছে।

মুসলিম উম্মাহর অনৈক্য ও বিশ্ববিবেকের নীরবতা

মুসলিম বিশ্বের বর্তমান অবস্থান আজ বড়ই করুণ। 'মুসলিম উম্মাহ' শব্দটি এখন যেন কেবল কিতাব আর বক্তৃতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, "মুমিনরা তো পরস্পর ভাই-ভাই।" কিন্তু আজ এক ভাইয়ের বিপদে অন্য ভাইয়ের এই নির্লিপ্ততা ইসলামী ভ্রাতৃত্বের ধারণাকেই কি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে না? ফিলিস্তিনের ওপর চলা এই অমানবিক নির্যাতনের মুখে মুসলিম দেশগুলোর অনৈক্য এবং প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর নৈতিক দেউলিয়াত্ব আমাদের ব্যথিত করে।

অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্র আজ তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ আর ক্ষমতার সিংহাসন রক্ষায় ব্যস্ত। গাজার মজলুম মানুষের আর্তনাদের চেয়ে তাদের কাছে পশ্চিমাদের সন্তুষ্টির মূল্য অনেক বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রভাবশালী দেশগুলো যখন ক্ষমতার দাবার চালে অন্ধ হয়ে যায়, তখন মজলুমের দীর্ঘশ্বাস কেবল দীর্ঘতরই হয়। ঈদ আমাদের আত্মোপলব্ধির সুযোগ দেয়— আমরা কি কেবল নামমাত্র ধর্মীয় আচার পালন করছি, নাকি বাস্তবেই আর্তমানবতার পাশে দাঁড়ানোর সেই চেতনা ধারণ করছি যা ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে?

ফিলিস্তিনিদের ঈমান ও ত্যাগের শিক্ষা

বিপরীতভাবে, ফিলিস্তিনিরা আজ তাদের জীবন, সম্পদ এবং প্রিয়জনদের বিসর্জন দিয়ে সেই ত্যাগেরই এক চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করছে। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে তারা যখন জামাতে ঈদের নামাজ আদায় করে, তখন তা পৃথিবীর শক্তিশালী সব পরাশক্তির চেয়েও বেশি সাহসী মনে হয়। তাদের এই অবিচল ধৈর্য আর ঈমান আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, উৎসব কেবল খাওয়া-দাওয়া আর সাজগোজের নাম নয়; বরং এটি হলো সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার এক নবায়নকৃত শপথ। তারা আমাদের শিখিয়েছে যে, পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলেও মাথা নত না করার নামই হলো প্রকৃত উৎসব।

উৎসবের দায়বদ্ধতা ও আমাদের করণীয়

ঈদ কেবল ব্যক্তিগত সুখের নাম নয়। ইসলাম শিখিয়েছে যে, প্রতিবেশী অভুক্ত রেখে নিজে পেট পুরে খাওয়া ইবাদতের অংশ হতে পারে না। আর আজ যখন গাজা বা দক্ষিণ লেবাননের হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন, তখন আমাদের উৎসবের ধরন কী হওয়া উচিত? এবারের ঈদ আনন্দ যেন কেবল ভোগবিলাসে সীমাবদ্ধ না থাকে। আমাদের আনন্দের একটি অংশ হোক ফিলিস্তিনি ও যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের প্রতি সংহতি। আমাদের উচিত তাদের জন্য প্রার্থনা করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের পাশে দাঁড়ানো।

উৎসবের এই ক্ষণে আমাদের উচিত অপচয় রোধ করা। ঈদের কেনাকাটায় যে টাকা আমরা ব্যয় করি, তার একটি ক্ষুদ্র অংশ যদি আর্তমানবতার কল্যাণে ব্যয় করা হয়, তবেই ঈদের প্রকৃত সার্থকতা আসবে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শান্তি কামনাই হোক আমাদের এবারের প্রধান স্লোগান।

শান্তির আকাঙ্ক্ষা ও আগামীর স্বপ্ন

অন্ধকার যত ঘনীভূত হয়, ভোরের আলো তত নিকটে আসে। মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট আর ফিলিস্তিনের রক্তঝরা দিনগুলোর অবসান একদিন অবশ্যই হবে। ইতিহাসের পাতায় কোনো জুলুমই চিরস্থায়ী হয়নি। আজকের এই সংকটময় মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমরা স্বপ্ন দেখি একটি নতুন পৃথিবীর।

আমরা প্রার্থনায় এক হই সেই ভোরের জন্য— যে ভোরে কোনো মাকে তার সন্তানের লাশ নিয়ে আহাজারি করতে হবে না, কোনো বাবাকে ধ্বংসস্তূপের নিচে ঈদের উপহার খুঁজতে হবে না। গাজার ধুলোবালিমাখা কোনো এক শিশু আবারও ঈদের চাঁদ দেখে প্রাণ খুলে হাসবে। ইরানের আকাশে যুদ্ধের বোমার বদলে শান্তির সাদা পায়রা উড়বে। লেবানন থেকে ইয়েমেন— সর্বত্র মানুষ বুক ভরে শান্তির নিঃশ্বাস নেবে।

শেষকথা

ঈদ আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায় যখন তা সর্বজনীন হয়। মধ্যপ্রাচ্যের অশান্ত পরিস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নই। অন্যের দুঃখকে পাশ কাটিয়ে নিজের সুখ কখনো দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। এবারের ঈদের চাঁদ আমাদের হৃদয়ে কেবল আনন্দের আলো নয়, বরং সহমর্মিতা ও প্রতিবাদের চেতনা জাগিয়ে তুলুক। পৃথিবীর প্রতিটি কোণে শান্তির আনন্দ পৌঁছে যাক, প্রতিটি মানুষের চোখে মুখে ফুটুক উৎসবের হাসি। আমাদের ঈদ আনন্দ যেন পরিপূর্ণ মানবিকতার আলোয় আলোকিত হয়। এই প্রত্যাশাই হোক আমাদের একমাত্র প্রার্থনা।

শান্তিহীন পৃথিবীতে কোনো উৎসবই পূর্ণতা পায় না। আসুন, আমরা শপথ নিই— আমাদের প্রতিটি উৎসবে আমরা সেইসব মানুষদের কথা ভুলব না যারা আজ নিজ ভূমিতে পরবাসী। মানবিক পৃথিবী গড়তে পারলেই ঈদের প্রকৃত খুশি সবার ঘরে ঘরে পৌঁছাবে।

লেখক: গবেষক ও ব্যাংকার

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)