সিদ্দিকা লাকী
সময়টা বিশেষভাবে উজানভাটি চক্রে নিমজ্জিত হয়ে আছে। কিছু সমসাময়িক সামাজিক কিংবা প্রথাবিরোধী ইস্যু নিয়ে চলছে নানান তর্ক বিতর্ক ও উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়।
তাহলে আমি কী নিয়ে লিখতে বসলাম? প্রথমেই দুটি রম্য বা হাস্যরসাত্মক বিষয় নিয়ে বলি। প্রথমটা হয়তো
আপনাদের অনেকেরই জানা আছে, আগের দিনে দেয়ালে, রাস্তার পাশে, স্টেশনে অথবা বাজারের প্রকাশ্য কোন স্থানে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি লেখা থাকতো এভাবে-
এখানে প্রস্রাব করিবেন না,
করিলে ৫০ টাকা জরিমানা।
এই বাক্যটি একটু ব্যাকরণগত ভুলের কারণে যদি এভাবে লেখা বা পড়া হয়, তাহলে আমরা কীভাবে পড়তে পারি?
এখানে প্রস্রাব করিবেন,
না করিলে ৫০ টাকা জরিমানা।
লক্ষ করুন, দুটি বাক্যই দেখতে প্রায় একইরকম। শুধুমাত্র কমা (,) বিরামচিহ্নের ভুল জায়গায় ব্যবহারের কারণে সেটি কার্যকারিতা হারিয়ে নেতিবাচক কাজে অনেকটা বাধ্য করার ইংগিত বহন করে, এমনকি আইনের প্রয়োগেও জটিলতা দেখা দিতে পারে ।
আরেকটি হলো, একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যিনি একটি প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই প্রশিক্ষণের একটি সেশনে যখন লার্নিং আউটপুট এর অংশ হিসেবে প্রশিক্ষণার্থীদের কিছু বলার সময় দেওয়া হয়, এরকম সময় তিনি খাদ্যে ভেজাল দুরীকরণে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ভেজাল অর্থে Adulteration ( ভেজাল) না বলে Adultery(পরকীয়া) বলে ফেলেছিলেন।
এটি নিশ্চয়ই তার অনিচ্ছাকৃত ভুল অথবা একটি ফরমাল সেশনে এভাবে ভুল শব্দ প্রয়োগ করে নিজেকে অন্যদের কাছে হাসির পাত্র হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।
ঘটনা যাই হোক, আমাদের দেশে বাংলায় একটি কথা খুবই জনপ্রিয়, মানুষ মাত্রই ভুল করে থাকে। আপনাদের অনেকের হয়তো এ দুটি ঘটনাই জানা থাকতে পারে।
এবার আসি শরীফার গল্প নিয়ে। যেহেতু এ বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট কন্ট্রোভার্সি চলছে, তাই আমি আগ্রহভরে ৭ম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের সেই গল্পটি পড়ে দেখলাম।
তবে এই গল্প কোনো পরিমার্জন বা এডিট করা হয়েছে কি না, আমার জানা নেই। আমি জেনুইন সোর্স এনসিটিবি ( NCTB) এর ওয়েবসাইট থেকে পড়েছি।
এ গল্প মূলত লেখা হয়েছে আমাদের দেশের হিজড়া সম্প্রদায়কে নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি তথা অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে।
এই গল্প পড়ে যেকোনো সাধারণ মানুষ বলতে পারবে না যে এটি সরাসরি কোনো বিশেষ নেতিবাচক যৌনতার দিকে ইংগিত করে।
তবে গল্পের শুরুতেই শরীফকে শরীফা হিসেবে পরিচিত না করিয়ে হিজড়া, তৃতীয় লিঙ্গ, থার্ড জেন্ডার ইত্যাদি বিষয় নিয়ে এক দু লাইনে ভালো ও স্বচ্ছ ধারনা দিলে কোন ঝামেলাই পড়তে হতো না।
আর ট্রান্সজেন্ডার শব্দটি এ গল্পে আমার চোখে পড়ে নি।
মানুষ এ গল্পটি এতটাই নেতিবাচক হিসেবে নিয়েছে যে, ট্রান্সজেন্ডার, সমকামিতা ইত্যাদি বিতর্কিত কিংবা সমাজ বা রাষ্ট্রভেদে নিষিদ্ধ ইস্যুগুলো এখানে মুখ্য হয়ে পড়েছে।
যারা এনসিটিবি'র বই লেখা, কারিকুলাম প্রস্তুত ও পরিমার্জনের বিষয়গুলো দেখভাল করেন, তারা এ বিষয়টি বিবেচনা করবেন বলে আশা রাখি।
তবে গল্পের শেষের দিকে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ২০১৩ সালে হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেবার মতো মহৎ বিষয়টি খুব বেশি কারো নজরেই আসে নি।
এমন কি কিছু সফল হিজড়াদের কর্মজীবন চিত্র সহকারে বর্ণিত হয়েছে, তা সাধারণ মহলে খুব বেশি দৃষ্টিগোচর হয় নি। এ যেন এক মণ দুধে এক ফোটা গোবর পড়ার মতো অবস্থা।
যাই হোক, হিজড়া বলতে আমরা যা বুঝি-
হিজড়া মূলত আল্লাহর সৃষ্টি এক ধরনের মানুষ যারা জন্মগতভাবে লিংঙ্গগত ত্রুটির কারণে না নারী, না পুরুষ-কোনোটারই অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। এরা ত্রুটিপূর্ণ বা অসম্পূর্ণ যৌনাংগ নিয়ে জন্মলাভ করে থাকে যাতে মানুষের কোনো হাত নেই।
সাধারণত এদের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ শারীরিক গঠন ভিন্ন রকমের হয়ে থাকে, সেই সাথে শরীরের অন্য অংগসমূহ যা পুরুষ বা নারী নির্ধারক হিসেবে কাজ করে থাকে, সেগুলো ত্রুটিপূর্ণ হয়ে থাকে।
এদের কন্ঠস্বর ভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। তবে পরিবার বা সমাজ কর্তৃক প্রত্যাখাত হয়ে এদের সবাই একটি বিশেষ গোষ্ঠীতে পরিণত হয়ে থাকে, যাদেরকে আমরা হিজড়া নামে জেনে থাকি।
এদের যাপিত জীবন খুব কষ্টের হয়ে থাকে, নির্ধারিত কোনো জীবিকা থাকে না, ভিক্ষাবৃত্তি, চাঁদা আদায়, পাড়ায় মহল্লায় ঘরে নতুন শিশুর জন্ম হলে টাকা আদায় করা, স্থানীয় বাজারে ফ্রি খাবার সংগ্রহ করা, এসব তাদের নিত্যজীবনে চলতে থাকে।
আমরা ইতিমধ্যে জেনেছি, ৩৫ তম বিসিএস ফরেন সার্ভিসে যোগদান করে বর্তমানে কেনিয়ায় কর্মরত আছেন ওয়ালিদ ইসলাম নামের একজন তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি। তার গল্প নিয়ে বিবিসি, প্রথম আলোসহ প্রথম শ্রেণির মিডিয়াগুলো ইতিবাচক সংবাদ প্রকাশ করেছে। আমি সত্যতা যাচাইয়ের জন্য নাইরোবির বাংলাদেশ দুতাবাসের ওয়েবসাইটে তার নাম দেখতে পেয়েছি।
কারণ আজকাল ফেইক বা রিয়েল নিউজ বোঝার খুব বেশি উপায় থাকে না।
এবার বলছি, পৃথিবীতে ট্রান্সজেন্ডার নামে যারা পরিচিতি পেয়েছেন বা নিজেকে তুলে ধরেছেন তাদের কথা। তারা মূলত কোনো অপারেশন বা সার্জারীর মাধ্যমে কিংবা হরমোন ট্রিটমেন্ট , ইমপ্লান্টেশনসহ অনেক পদ্ধতির মাধ্যমে নিজের দৈহিক পরিবর্তনকে প্রকাশ্য জানান দিয়ে থাকেন। এদেরকে ট্রান্সজেন্ডার বা রুপান্তরকামী বলা হয়ে থাকে। হিজড়ারাও হয়তো এরকম রুপান্তরকামী হতে পারেন। বিশ্বে ট্রান্সজেন্ডার কোনো দেশে বৈধভাবে স্বীকৃত আবার কোন দেশে অবৈধও হতে পারে।
সমকামিতা মূলত সেইম সেক্স এট্রাকশন(Same Sex Attraction) বোধ করা যে কোনো ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য বুঝানো হয়ে থাকে। বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনে সমকামিতা বৈধ বা স্বীকৃত নয়। এমনকি সামাজিকভাবে নিষিদ্ধসহ ধর্মীয়ভাবে সম্পূর্ণ গর্হিত ও নিষিদ্ধ একটি বিকৃত যৌনাচারের বিষয়।
দুঃখজনক হলেও সত্য এই যে, এতো হৈ চৈ তোলপাড়ের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষ গুগল করে সমকামিতা, তৃতীয় লিঙ্গ এবং ট্রান্সজেন্ডার বিষয়ে জানতে পেরেছে। এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিকই থাকতে পারে।
কথায় আছে, বাঁচতে হলে জানতে হবে। হাত ধোয়ার অভ্যাস আর হাতে তৈরি গুড়, লবণ আর পানির স্যালাইনের মাধ্যমেই কিন্তু এদেশ কলেরা মুক্ত হয়েছে। তাই আসুন, সব কিছুরই নেতিবাচক দিক যা আছে তা জানার ব্যাপারে সচেতন হই, ইতিবাচক মানসিকতা ধারণ করি, নিজে সঠিক ধারণা লাভ করি,অপরকেও বুঝতে সাহায্য করি।
একটি সমাজে মন্দ-ভালো পরস্পরের কাছাকাছি অবস্থানে থাকে। এটা সাংঘর্ষিক হওয়া মোটেও বাঞ্ছনীয় নয়।
তবে সম্প্রতি স্যোশাল মিডিয়ায় ছেলে থেকে মনে মনে মেয়ে হওয়া বা বিপরীত চর্চা, এ ধরনের কুরুচিপূর্ণ ট্রল না করে সচেতনতামূলক ও ইতিবাচক তথ্যচিত্র আমরা প্রত্যাশা করছি।
শেষে, কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠ্যবইয়ের সঠিক পরিমার্জন, স্পষ্ট ব্যাখাসহ সরল কোমলমতি শিশুদের বোধগম্য একটি সুখকর পাঠ্যবই আশা করছি।
লেখক: কবি, গদ্যকার ও মোটিভেশনাল স্পিকার। অতিরিক্ত ডিআইজি হিসাবে সিআইডিতে কর্মরত।
*মতামত লেখকের নিজস্ব