ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
২০ জুন ; বিশ্বজুড়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার, আত্মত্যাগ ও টিকে থাকার লড়াইকে সম্মান জানানোর দিন—আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের কাছে এই দিনটি কেবলই ক্যালেন্ডারের কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এক নির্মম ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের জীবন্ত বাস্তবতা।
২০১৭ সালে মানবিকতার এক অনন্য নজির স্থাপন করে বাংলাদেশ যখন মিয়ানমারের জান্তা সরকারের নির্মম নিপীড়নের শিকার লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছিল, তখন বিশ্ববাসী ঢাকার এই উদারতার ভূয়সী প্রশংসা করেছিল। তবে সময়ের আবর্তে সেই মানবিকতার পিঠে এখন চেপে বসেছে এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বোঝা। আজ প্রায় এক দশকের কাছাকাছি সময়ে এসে রোহিঙ্গা সংকট কেবল একটি ‘মানবিক সমস্যা’ হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই ; এটি রূপ নিয়েছে বাংলাদেশের জাতীয়, আঞ্চলিক এবং দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার এক চরম ও জটিল হুমকিতে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ক্রমাগত উদাসীনতা এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার চরম স্থবিরতা এই সংকটকে এক বিস্ফোরক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতি কেন একটি স্থায়ী সংকটে রুপ নিতে যাচ্ছে তার কয়েকটি কারণ-
প্রত্যাবাসনে ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা ও স্থবিরতা
মিয়ানমার সরকারের আন্তরিকতার অভাব এবং দেশটির চলমান অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ (বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনী এবং আরাকান আর্মির মধ্যকার সংঘর্ষ) প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্থবির করে দিয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় বড় পরাশক্তিগুলোর (যেমন- চীন, ভারত, রাশিয়া) মিয়ানমারের সাথে নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ থাকায় তারা মিয়ানমারের ওপর কার্যকর কোনো চাপ সৃষ্টি করতে পারছে না। ফলে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সব ধরনের আলোচনাই এখন পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অপরাধ বৃদ্ধি
কক্সবাজার ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরগুলো এখন বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপ ও অপরাধী চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ক্যাম্পগুলোতে প্রায়ই মাদক চোরাচালান (বিশেষ করে ইয়াবা ও আইস), অস্ত্র ব্যবসা, মানব পাচার এবং অভ্যন্তরীণ আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে খুন-খারাবির ঘটনা ঘটছে। এটি কেবল ক্যাম্পের ভেতরই নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি।
বিশাল অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ
সীমিত সম্পদের এই দেশে ১০ লক্ষাধিক মানুষের দীর্ঘমেয়াদী বাড়তি দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত কঠিন। শুরুর দিকে আন্তর্জাতিক সাহায্য যেভাবে আসত, সময়ের সাথে সাথে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে নতুন সংকট (যেমন- ইউক্রেন বা মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ) তৈরি হওয়ায় রোহিঙ্গা তহবিলে বৈশ্বিক অনুদান অনেকটাই কমে গেছে। ফলে বাংলাদেশ সরকারকে নিজস্ব তহবিল থেকে একটি বড় অংশ ব্যয় করতে হচ্ছে।
একই সাথে স্থানীয় জনগণের সাথে রোহিঙ্গাদের এক ধরনের সামাজিক দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় বনায়ন ধ্বংস হওয়া, শ্রমবাজার সস্তা হয়ে যাওয়া এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে কক্সবাজার অঞ্চলের স্থানীয় মানুষের মনে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষোভের জন্ম নিচ্ছে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও দীর্ঘমেয়াদী অবস্থান
ক্যাম্পগুলোতে প্রতি বছর হাজার হাজার নতুন শিশু জন্ম নিচ্ছে, যা সামগ্রিক জনসংখ্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। দীর্ঘ সময় ধরে একটি বিশাল জনগোষ্ঠী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও মৌলিক অধিকারহীন অবস্থায় ক্যাম্পে থাকলে তাদের মধ্যে চরমপন্থার (extremism) দিকে ঝুঁকে পড়ার ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়।
সংকট সমাধানে করণীয় কী
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী ও টেকসই সমাধানের ক্ষেত্রে ভূ-রাজনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে চীন ও ভারতের মতো পরাশক্তিগুলোর প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া মিয়ানমারকে এই বিশাল জনগোষ্ঠী ফেরত নিতে বাধ্য করা প্রায় অসম্ভব।
মিয়ানমারের জান্তা সরকার এবং রাখাইনের বর্তমান নিয়ন্ত্রণকারী সশস্ত্র গোষ্ঠী "আরাকান আর্মি"— উভয়ের ওপরই চীন ও ভারতের ব্যাপক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব রয়েছে।
চীনের ভূমিকা : চীনের জন্য মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাখাইনের 'কিয়াউকফিউ' (Kyaukphyu) গভীর সমুদ্র বন্দর থেকে চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন গেছে। চীন যদি মনে করে এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত তাদের এই বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্টকে ঝুঁকিতে ফেলবে, তবেই তারা মিয়ানমারকে চাপে ফেলবে।
সরাসরি মধ্যস্থতা : চীন পূর্বে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় (Tripartite) আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছিল। চীনকে কেবল আলোচনার টেবিল তৈরি করলেই হবে না, বরং রাখাইনে রোহিঙ্গাদের জন্য একটি "নিরাপদ বাফার জোন" বা নিরাপদ অঞ্চল তৈরিতে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে হবে।
ভারতের ভূমিকা
মানবিক অবস্থান থেকে রাজনৈতিক চাপ : ভারত শুরুতে এই সংকটকে বাংলাদেশের একটি দ্বিপাক্ষিক ও অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখলেও, বর্তমানে তারা স্বীকার করে যে এটি একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি। ভারতের উচিত মিয়ানমার সরকারের সাথে তাদের গভীর সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকারসহ পুনর্বাসনের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেওয়া।
বাংলাদেশ যেভাবে কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে
দীর্ঘ ৯ বছর ধরে চলা এই স্থবিরতা ভাঙতে হলে বাংলাদেশকে প্রচলিত "অনুরোধের কূটনীতি" থেকে বের হয়ে "আক্রমণাত্মক ও কৌশলগত কূটনীতি" (Strategic & Proactive Diplomacy) গ্রহণ করতে হবে ।
ক. বহুমুখী বা বহুপাক্ষিক কূটনীতি (Multi-track Diplomacy)
বাংলাদেশকে শুধু মিয়ানমারের জান্তা সরকারের ওপর ভরসা রাখলে চলবে না। রাখাইনের সিংহভাগ এলাকা এখন নিয়ন্ত্রণ করছে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (Arakan Army)। বাংলাদেশ সরকারকে অত্যন্ত গোপনে এবং চতুরতার সাথে আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা 'ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান' (ULA)-এর সাথে অনানুষ্ঠানিক সংলাপের পথ খোলা রাখতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে রাখাইনে সরকার পরিবর্তিত হলেও রোহিঙ্গাদের ফেরার পথ সুগম থাকে।
খ. আন্তর্জাতিক আদালতের (ICJ & ICC) রায়কে কাজে লাগানো
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) গাম্বিয়ার করা রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার আইনি প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) তদন্তে বাংলাদেশকে সক্রিয়ভাবে তথ্য ও প্রমাণ দিয়ে সহযোগিতা চালিয়ে যেতে হবে। আইসিজে থেকে মিয়ানমারের বিপক্ষে কোনো চূড়ান্ত বা বড় ধরনের অন্তর্বর্তীকালীন রায় আসলে, তা ব্যবহার করে বিশ্বমঞ্চে মিয়ানমারের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য বৈশ্বিক চাপ তৈরি করতে হবে।
গ. নিরাপত্তা ঝুঁকিকে বিশ্বমঞ্চে ব্র্যান্ডিং করা
বাংলাদেশকে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে এটি প্রমাণ করতে হবে যে, রোহিঙ্গা সমস্যা এখন আর কেবল "মানবিক বা শরণার্থীর আশ্রয় দেওয়ার বিষয়" নয়। এটি একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা বোমা (Regional Security Time-bomb)। ক্যাম্পগুলোতে যেভাবে আরএসও (RSO), আরসা (ARSA) বা আরাকান আর্মির মতো সশস্ত্র গ্রুপগুলোর আধিপত্য ও মাদক চোরাচালান বাড়ছে, তাতে পুরো বঙ্গোপসাগর অঞ্চল এবং দক্ষিণ এশিয়ায় উগ্রবাদ ছড়িয়ে পড়তে পারে—এই বার্তাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আসিয়ান (ASEAN) ভুক্ত দেশগুলোর কাছে জোরালোভাবে পৌঁছাতে হবে।
ঘ. চীন ও ভারতকে কাউন্টার-ব্যালেন্স করা
বাংলাদেশকে তার নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান ব্যবহার করতে হবে। বাংলাদেশ যদি চীন ও ভারতকে বোঝাতে পারে যে, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান না হলে এই অঞ্চলে তাদের বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে, তবেই তারা সক্রিয় হবে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক ফোরামে এই দুই দেশের "নীরব বা নিরপেক্ষ" ভূমিকার কারণে যে আঞ্চলিক ক্ষতি হচ্ছে, তা কূটনৈতিকভাবে তুলে ধরতে হবে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকট
রোহিঙ্গা সংকট কেবল ভবিষ্যতের নয়, বরং ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি অত্যন্ত বাস্তব এবং ক্রমবর্ধমান হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৭ সালের মানবিক সহানুভূতির অধ্যায় পার হয়ে বিগত ৯ বছরে ক্যাম্পগুলোর ভেতরের এবং বাইরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি চরম উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে।
মূলত ৪টি প্রধান দিক থেকে এটি বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করছে-
ক্যাম্পগুলোর ভেতরে সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান ও অপরাধ সাম্রাজ্য
কক্সবাজার ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরগুলো এখন আর সাধারণ আশ্রয়শিবির নেই। সেখানে উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পগুলোতে আরসা (ARSA), আরএসও (RSO) এবং বিভিন্ন অপরাধী গ্যাং (যেমন- নবী হোসেন গ্রুপ) গড়ে উঠেছে।
আধিপত্যের লড়াই : ক্যাম্পগুলোর নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি এবং রেশন কার্ডের ব্যবসা নিয়ে এই সশস্ত্র গ্রুপগুলোর মধ্যে প্রায়ই মাঝরাতে গোলাগুলি ও মারামারির ঘটনা ঘটছে। রোহিঙ্গা মাঝি (নেতা), সাধারণ শরণার্থী এবং এমনকি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের হত্যার ঘটনা এখন নিয়মিত সংবাদ।
সশস্ত্র তৎপরতা : দিনের বেলা ক্যাম্পগুলো শান্ত থাকলেও, রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সীমাবদ্ধতার সুযোগে এই গ্রুপগুলো পুরো ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।
আন্তর্জাতিক মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের ট্রানজিট রুট
মিয়ানমার সীমান্তে চলমান অস্থিরতা এবং রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনীর সাথে 'আরাকান আর্মি'র যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশে মাদক ও অস্ত্রের প্রবেশ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
নাফ নদী ও মাদক রুট : মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবা এবং উচ্চ ক্ষমতার বিপজ্জনক কেমিক্যাল ড্রাগ 'আইস' (Crystal Meth)-এর চোরাচালানের প্রধান বাহক বা ক্যারিয়ার হিসেবে ক্যাম্পের একটা বড় অংশের যুবসমাজকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
অস্ত্রের অনুপ্রবেশ: সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ঢুকছে, যা ক্যাম্পের ভেতরে অপরাধী চক্রের হাত শক্ত করছে। এই বিশাল অবৈধ অর্থ ও অস্ত্র বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অপরাধ চক্রের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে।
উগ্রবাদ এবং চরমপন্থার (Extremism) ঝুঁকি
দীর্ঘ ৯ বছর ধরে প্রায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষ শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং নাগরিক অধিকারবিহীন অবস্থায় ঘিঞ্জি ক্যাম্পে বাস করছে।
হতাশা থেকে চরমপন্থা : কোনো জনগোষ্ঠীর তরুণ সমাজ যখন দীর্ঘ সময় ধরে ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম হতাশায় ভোগে, তখন তাদেরকে উগ্রবাদী আদর্শে দীক্ষিত করা খুব সহজ হয়।
সীমান্তবর্তী ঝুঁকি : আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন এই বিশাল গৃহহীন ও রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীকে তাদের স্বার্থে মগজধোলাই বা রিক্রুটমেন্টের জন্য ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। এটি বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদী কাউন্টার-টেররিজম ঝুঁকি।
ভূ-রাজনৈতিক ফাঁদ ও সার্বভৌমত্বের ওপর চাপ
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে এখন জান্তা সরকারের চেয়ে বিদ্রোহী গোষ্ঠী 'আরাকান আর্মি' অনেক বেশি শক্তিশালী। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের উত্তাপ প্রায়ই বাংলাদেশের সীমান্তে এসে পড়ছে।
সীমান্ত লঙ্ঘন : অতীতে মিয়ানমারের যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে, মর্টার শেল এসে পড়েছে বাংলাদেশের ভেতরে, যার ফলে বাংলাদেশি নাগরিকও হতাহত হয়েছে।
কূটনৈতিক ব্ল্যাকমেইল : বাংলাদেশ যদি কোনো কারণে এই সংঘাতময় ভূ-রাজনীতিতে (মিয়ানমার সামরিক জান্তা বনাম আরাকান আর্মি বনাম চীন/ভারত) ভুল পদক্ষেপ নেয়, তবে দেশের সীমান্ত এবং সার্বভৌমত্ব সরাসরি হুমকির মুখে পড়তে পারে।
সারকথা: রোহিঙ্গা সংকটের কারণে বাংলাদেশ বর্তমানে একটি 'নিরাপত্তা বোমার' (Security Time-bomb) ওপর বসে আছে। এটিকে আর কেবল "শরণার্থী সমস্যা" ভাবার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ সরকার যদি কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি, সীমান্তে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা এবং ক্যাম্পগুলোর ভেতরে অপরাধ দমনে জিরো-টলারেন্স নীতি বজায় না রাখে, তবে এটি দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতাকে পুরোপুরি গ্রাস করতে পারে।
পরিশেষে বলতে পারি, রোহিঙ্গা সংকট এখন আর কেবল উখিয়া বা টেকনাফের পাহাড়-জঙ্গলে সীমাবদ্ধ কোনো স্থানীয় সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অর্থনীতি এবং সমাজ কাঠামোর ভিত্তিমূলে এক প্রচ্ছন্ন আঘাত। একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ অনির্দিষ্টকালের জন্য এই বিপুল জনসংখ্যার ভার বহন করতে পারে না—এই সত্যটি বিশ্বনেতৃত্বকে যত দ্রুত সম্ভব অনুধাবন করতে হবে। আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবসে বাংলাদেশের স্পষ্ট বার্তা হওয়া উচিত: মানবিকতার একচ্ছত্র দায় কেবল ঢাকার একার নয়। ফাঁকা আশ্বাস আর লোকদেখানো ত্রাণের দিন শেষ; এখন প্রয়োজন মিয়ানমারের ওপর কঠোর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা। একই সাথে, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের নিজস্ব আইন-শৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা তৎপরতা আরও জোরদার করা জরুরি। রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান যদি দ্রুত না হয়, তবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা এমন এক চরম ঝুঁকিতে পড়বে, যার মূল্য দিতে হতে পারে আগামী প্রজন্মকে। তাই আজই সময়—কূটনৈতিক ও কৌশলগত সব শক্তি কাজে লাগিয়ে এই সংকটের অবসান ঘটানোর।
লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা