শেখ জালাল
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে এখন পুরোদমে চলছে বোরো মৌসুম, যার সেচ কার্যক্রম পুরোপুরি জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ নির্ভর। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও অস্থিরতার জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের হাহাকার অবস্থা তৈরি হলেও বাংলাদেশে এর আঁচ এখনো সরাসরি লাগেনি। সরকার বর্তমানে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানি ও বিদ্যুতের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখছে। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই ভর্তুকি বজায় রাখা সম্ভব হবে কি না এবং তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হবে কি না—তা নিয়ে চরম শঙ্কার মধ্যে রয়েছেন যশোরের বোরো চাষিরা। বিশেষ করে ডিজেলের সংকট বা দাম বাড়লে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়বে ধানের উৎপাদনে। যশোরের কৃষকরা এখন আকাশের দিকে নয়, বরং তাকিয়ে আছেন বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণের দিকে। তাদের আশঙ্কা, বৈশ্বিক এই তেলের লড়াই শেষ পর্যন্ত কৃষকের ভাতের থালায় টান না ফেলে।
যশোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৫৭ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে। জেলার প্রতিটি উপজেলায় এখন ধান পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। অধিকাংশ জমিতে চারা রোপণ শেষ, এখন প্রয়োজন নিয়মিত সেচ। কেশবপুরের গোপসেনা গ্রামের কৃষক সালাম ও বাঁসবাড়িয়া গ্রামের কৃষক হামিদ শেখ বলেন, সরকারের সদিচ্ছায় সারের অভাব নেই, কৃষি অফিসও সহায়তা করছে। সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে বলে এখনো তেল পাচ্ছি। কিন্তু যুদ্ধ লেগে যদি ডিজেল আসা বন্ধ হয়ে যায়, তবে সব শেষ হয়ে যাবে। সেচ দিতে না পারলে বোরো আবাদ মাঠেই মারা যাবে। ৩ বিঘা জমিতে আবাদ করা কৃষক আনসার আলী জানান, উৎসবমুখর পরিবেশে ধান লাগালেও এখন ডিজেল সংকটের ভয়ে আছি।
ইরান-ইসরায়েল পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম পথ 'হরমুজ প্রণালি' কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। কাতার তাদের এলএনজি রপ্তানি বন্ধ রেখেছে এবং সৌদি আরামকো তাদের বড় শোধনাগার রাস তানুরায় উৎপাদন স্থগিত করেছে। এরই মধ্যে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে ব্যারেল প্রতি ৮৫ ডলারের আশপাশে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এটি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে। ডলারের দাম বাড়ায় আমদানি খরচও আরও বাড়বে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের চাহিদার প্রায় শতভাগ জ্বালানি তেল এবং ৩৫ শতাংশ গ্যাস আমদানিনির্ভর, যার বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় গত বুধবার এক জরুরি পর্যালোচনা সভা করেছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। সভায় উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব, বিপিসির চেয়ারম্যান ও পিডিবির চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সভায় জানানো হয়, জ্বালানি সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন ঘটতে পারে, যার প্রভাব বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সাধারণ জনগণের সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে। বিশেষ করে ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহণ ব্যবহারের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়ে নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহার সাশ্রয়ী করার আহ্বান জানিয়ে সব ধরনের অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা পরিহার করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জরুরি নির্দেশনায় জানানো হয়, খোলাবাজারে ডিজেল ও পেট্রল বিক্রয় বন্ধ রাখতে ব্যবসায়ী ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে তৎপর হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি পাচার রোধে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৈশ্বিক পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব ন্যূনতম পর্যায়ে রাখতে সম্ভাব্য সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। জ্বালানি সংগ্রহ স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ সফল করতে জনগণকে ধৈর্যধারণ ও সর্বাত্মক সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।