Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

সুন্দরবন জলবায়ু সংকটে: নীরব বিস্তার ভিনদেশি গাছের

আলম শাইন আলম শাইন
প্রকাশ : শনিবার, ৭ মার্চ,২০২৬, ১০:৫৯ এ এম
সুন্দরবন জলবায়ু সংকটে: নীরব বিস্তার ভিনদেশি গাছের

জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কোনো কাল্পনিক শঙ্কা নয়; এটি আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার নির্মম বাস্তবতা। যে বাস্তবতার অভিঘাতে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো পড়ছে অস্তিত্ব সংকটে। যেমন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ক্রমাগতভাবে বাড়ছে, তেমনি সরাসরি ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে আমাদের নদী, কৃষি, বনজ সম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও জনজীবনের ওপর।

বিশেষত দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্রভূমিতে ইতোমধ্যে শুষ্কতা ও মরূকরণের প্রাথমিক লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাই আন্তর্জাতিক জলবায়ু ও মরুভূমি গবেষকেরা বারবার সতর্ক করে আসছেন—এই অঞ্চল ধীরে ধীরে মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এজন্য বাংলাদেশের ‘পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়’ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মূল্যায়নের ক্ষেত্রে চারটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে—

এক. জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দুই. কোন অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ বেশি। তিন. কোন অঞ্চল অধিক জনসংখ্যা ঝুঁকির মুখে রয়েছে। চার. ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল বা দেশ অভিযোজনমূলক কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এই চারটি সূচকের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ এখন বহুমাত্রিক সংকটের সম্মুখীন। বিশেষ করে প্রাকৃতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক—সব দিক থেকেই সংকট প্রকট হচ্ছে।

একসময় বাংলাদেশ ছিল ছয় ঋতুর দেশ। প্রতিটি ঋতুর ছিল স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য এবং অনন্য সৌন্দর্য। বসন্তের হাওয়া, গ্রীষ্মের প্রখরতা, বর্ষার সজীবতা, শরতের নির্মল আকাশ, হেমন্তের সোনালি ক্ষেত আর শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল—সব মিলিয়ে প্রকৃতি ছিল বৈচিত্র্যময় ও ভারসাম্যপূর্ণ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সেই স্বাভাবিক ঋতুচক্রে ব্যাপক হেরফের ঘটেছে। শীত ক্রমেই সংক্ষিপ্ত হচ্ছে, গ্রীষ্ম দীর্ঘায়িত ও দাবদাহ হয়ে উঠছে, আর বর্ষা অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। কখনো অতিবৃষ্টি, কখনো দীর্ঘ খরা প্রকৃতির স্থিতাবস্থা নষ্ট করছে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে বর্তমানে বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাতের ধরন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও ভূমির আর্দ্রতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। জলবায়ুর এই অস্বাভাবিক পরিবর্তন আমাদের পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।
বিশেষ করে কম বৃষ্টিপাত ও উজানের পানিপ্রবাহ হ্রাসের কারণে দেশের নদ-নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। ফলে অনেক ছোট নদীতে মৌসুমভিত্তিক পানিপ্রভাব হচ্ছে এবং কিছু নদী প্রায় বিলুপ্তির পথে।
নদীর পানিপ্রবাহ কমে গেলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ধীরে ধীরে স্থলভাগের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। আগে যে লবণাক্ত পানি উপকূলীয় নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা আরো ভেতরে প্রবেশ করছে। এর ফলে কৃষিজমি লবণাক্ত হয়ে পড়ছে এবং পানির উৎস দূষিত হচ্ছে, যা মানুষের স্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।
উপকূলীয় বিস্তীর্ণ এলাকায় মাটির লবণাক্ততা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে কৃষি ও বনজ সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি করছে। একই কারণে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার ফলে এই বনের গাছপালায় ‘আগামরা’ রোগের প্রকোপ দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে বাইন ও সুন্দরীসহ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতি দুর্বল হয়ে পড়ছে। গাছের স্বাভাবিক প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ায় পাতাখেকো পোকামাকড়ের আক্রমণও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বনের জন্য উদ্বেগজনক সংকেত।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে ইকোসিস্টেমের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। কোনো অঞ্চলের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা বা বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে গেলে সেখানে প্রাণিকুল ও কীটপতঙ্গের জীবনচক্রেও পরিবর্তন আসে। সুন্দরবনেও এসেছে। সুন্দরবনে বর্তমানে নতুন কিছু কীটপতঙ্গের বিস্তার লক্ষ করা যাচ্ছে, যা স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। দেশীয় প্রজাতির বিলুপ্তি এবং নতুন প্রজাতির আগ্রাসন এক ধরনের অদৃশ্য পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনছে। বিষয়টি গবেষণা করে ইউনেস্কো তাদের একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে— সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুন্দরবনের উল্লেখযোগ্য অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সুন্দরবন ছাড়াও দেশের বনজ ইকোসিস্টেমের ভেতরেও আরেকটি নীরব পরিবর্তন দীর্ঘদিন ধরে ঘটে চলছে। দেশীয় প্রজাতির গাছপালা ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে, আর তাদের জায়গা দখল করছে বিদেশি আগ্রাসী বৃক্ষ। গত কয়েক দশকে পরিকল্পনাহীন বনায়ন কর্মসূচির ফলে দ্রুত কাঠ উৎপাদনের লক্ষ্যে বিভিন্ন বিদেশি প্রজাতির গাছ রোপণ করা হয়েছে। প্রথমে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক মনে হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এসব গাছ স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য হুমকিতে পরিণত হয়েছে।

বিদেশি এই প্রজাতির গাছের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে—সেগুন, মেহগনি, আকাশমণি, রেইনট্রি ও ইউক্যালিপটাস। উল্লেখ্য, ঔপনিবেশিক আমলে এবং পরবর্তীকালে অর্থনৈতিক লাভের উদ্দেশ্যে এসব প্রজাতি এই অঞ্চলে আনা হয়েছিল।
এ গাছের বৈশিষ্ট্য হলো দ্রুত বৃদ্ধি, অধিক স্থান দখল এবং মাটি থেকে বিপুল পুষ্টি শোষণ। অনেক ক্ষেত্রে এদের পাতা ও শিকড় মাটির রাসায়নিক গুণাগুণ পরিবর্তন করে, ফলে আশপাশে দেশীয় প্রজাতির গাছ জন্মাতে পারে না। এতে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে এবং পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ঘটে।

সত্যি বলতে, আমাদের পূর্বপুরুষেরা তখন উপলব্ধি করতে পারেননি যে, আম, জাম, জারুল, সোনালু, হিজল ও করচের মতো দেশীয় বৃক্ষপ্রজাতি সংরক্ষণ করা কতটা জরুরি। এসব গাছ শুধু সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না, বরং দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বনায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক লাভকেই প্রধান বলে বিবেচনা করা হয়েছে। ফলে স্থানীয় ইকোসিস্টেমের জটিল ও আন্তঃনির্ভরশীল সম্পর্কগুলো উপেক্ষিত হয়েছে। এর পরিণতিতে মাটির উর্বরতা হ্রাস পেয়েছে, জীববৈচিত্র্য সংকটে পড়েছে এবং পরিবেশের সহনশীলতাও হ্রাস পেয়েছে।

অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দেশের মৎস্য ও কৃষি খাতেও গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। কখনো দীর্ঘ খরার কারণে পানির স্বল্পতা দেখা দিচ্ছে, আবার কখনো অসময়ে অতিবৃষ্টি মাছের জীবনচক্রে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। অনেক ক্ষেত্রে মাছের ডিম পেটের ভেতরেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং মা-মাছ মারা যাচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ মৎস্যসম্পদের জন্য অশনিসংকেত।

কৃষিক্ষেত্রেও একই চিত্র। খরা ও অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ফসলের উৎপাদন কমছে। আগাছা, পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের প্রকোপ বাড়ছে। দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে বোরো ধান চাষ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেচব্যবস্থায় সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক এলাকায় আর্সেনিক-দূষিত পানি কৃষিজ ফসলের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।

তবে পরিস্থিতি ভয়াবহ হলেও সমাধানের পথ রুদ্ধ নয়। জলবায়ু পরিবর্তন রাতারাতি থামানো সম্ভব না হলেও অভিযোজন ও প্রশমনমূলক উদ্যোগ দ্রুত গ্রহণ করার সুযোগ আছে। প্রথমত, নদীদূষণ রোধ ও নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধার করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, পরিকল্পিত ও দেশীয় প্রজাতিনির্ভর বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে; আগ্রাসী বিদেশি গাছ পর্যায়ক্রমে অপসারণ করে স্থানীয় পরিবেশোপযোগী বৃক্ষরোপণ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস করতে হবে। চতুর্থত, শিল্পোন্নত দেশগুলোর কাছে জলবায়ু ক্ষতিপূরণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার দাবি জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ রক্ষায় ব্যক্তিগত ও সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত না হলে কোনো উদ্যোগই দীর্ঘস্থায়ী সাফল্য পাবে না।
আমাদের মনে রাখতে হবে, জলবায়ু পরিবর্তন কোনো একক রাষ্ট্রের সমস্যা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক সংকট। এর প্রভাবে বনজ, কৃষিজ ও জলজ সম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তাতে খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক উন্নয়নে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তাই নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে। জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করে একটি টেকসই ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে হবে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক; পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক কলামিস্ট

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)