❒ গল্প
গল্প
ভাইয়ার উপরে ভীষণ রাগ করে আছে মুনিয়া।
এটা কোনো কাজ হলো? কেন ভাইয়াটা ওর সাথে এমনটি করলো? ভাইয়া কি জানে না ও তাকে কতোটা ভালোবাসে?
রুমের ভেতরে একবার খাটে বসছে, একবার চেয়ারে বসছে, আবার উঠে দুই কদম পাইচারি করছে এবং অনুচ্চস্বরে এইসব বলছে মুনিয়া।
স্থির থাকতে পারছে না কিছুতেই। ফোঁস ফোঁস করে নাকের ছিদ্র দিয়ে শ্বাস ছাড়ছে।
শীতের মধ্যেও ঘামছে মুনিয়া। প্রচণ্ড রাগ বা উত্তেজনার সময় মানুষ শীতেও ঘামে। মাথাটাও গরম হয়ে উঠছে। সাধারণত এরকমটি ওর আগে কখনও হয়নি। আগেও ভাইয়া বা অন্যদের ওপর রাগ করেছে, কিন্তু এতোটা অস্থির কখনও দেখা যায়নি ওকে।
এবার গজগজ করতে করতে বাগানে চলে গেল মুনিয়া।
শীতের বিকেলের এই সময়টাতে দাদুভাই বাগানেই সময় কাটান। কাশ্মিরী একটা শাল গায়ে জড়িয়ে বকুল গাছটার চারপাশে ইট-সিমেন্ট আর টাইলস দিয়ে যে গোলাকার আসনটি তৈরি করেছেন আব্বু, সেটাতে বসে বই পড়েন। এখনও দাদুভাইয়ের বই পড়ার প্রতি দারুণ ঝোঁক।
নঈম সিদ্দিকীর মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বইটি পড়ছিলেন দাদুভাই। যদিও এই বইটা তিনি এর আগেও বেশ কয়েকবার পড়েছেন। তারপরও এটা পড়তে পছন্দ করেন তিনি। আর প্রতিবারই নতুন কোনো না কোনো বিষয় আবিষ্কার করেন তিনি যা আগে ধরতে পারেননি।
‘দাদুভাই, ও দাদুভাই?’ বারান্দা থেকে ডাকতে ডাকতেই দাদুর কাছে চলে যায় মুনিয়া।
কিন্তু দাদুভাই এতোটাই মনোযোগ দিয়ে পড়ছিলেন যে, মুনিয়ার ডাক তার কানে যায়নি। তিনি বই পড়েই যাচ্ছেন।
সুন্দর গোলগাল মুখটা হাঁড়ির কালি করে দাদুর ডান পাশে গিয়ে বসে পড়ল মুনিয়া।
মুনিয়ার ছোয়ায় বইটা একটু নড়ে ওঠাই দাদুভাইয়ের সম্বিৎ ফিরল। একটা মিষ্টি গন্ধ ঢুকলো তার নাকে। এই গন্ধ তার খুবই চেনা এবং অত্যন্ত প্রিয়। পরিবারের সকল সদস্যের শরীরের ঘ্রাণ দাদুর মুখস্থ। তাই না দেখেও বলে দিতে পারেন কে তার কাছে এসেছে।
বইয়ের খোলা অংশের মাঝে বাম গাতের শাহাদাত আঙুল রেখে বন্ধ করলেন। ফিরলেন আদরের নাতনির দিকে। বললেন, ‘দাদুভাই, আজ খেলতে যাওনি?’
মুনিয়া কিছু বলে না। মুখটা তার তেমনিই গম্ভীর হয়ে রইলো।
দাদুভাই এবার বইটার পঠিত অংশটি চিহ্নিত করে পুরোপুরি বন্ধ করে বাম পাশে রাখলেন। ঘুরে গেলেন মুনিয়ার দিকে। তাকালেন সরাসরি চোখের দিকে।
মুনিয়ার চোখজোড়া নিচের দিকে। নিরেট শূন্যতা সে চোখজোড়ায়।
‘এই যে আমার মিষ্টি দাদুভাই!’ মুনিয়ার চিবুকটা নিচের ডান হাতের তালুতে উঁচু করে নিজের দিকে ফেরালেন দাদু। দেখলেন, চোখজোড়া ছলছল করছে ওর। এবার সিরিয়াস হয়ে উঠলেন তিনি। ব্যাপারটা খুব সুবিধের ঠেকছে না। নিশ্চয়ই সাংঘাতিক কিছু হয়ে গেছে! আস্তে করে জানতে চাইলেন, ‘কী হয়েছে আমার প্রিয় মহারানীর? মুখটা অমন থমথম করছে কেন?’
মুনিয়া একই রকম চুপ করে রইলো। বরং মনে হলো যেন মুখটা আরও আঁধারে ঢেকে গেল।
এবার প্রমাদ গুনলেন দাদু। শিগগীর শান্ত করতে হবে মেয়েটাকে। নইলে এক্ষুনি কেঁদে ফেলবে।
উপায় খুঁজতে লাগলেন তিনি নাতনীকে শান্ত করার। ‘আমার মিষ্টি গোলাপটার পাপড়িতে কে হুঁল ফুটালো শুনি?’ বললেন তিনি। ‘কোন্ সে দুষ্টু ভোমর এই কাজটি করল গো!’
‘দাদুভাই!’ এবার ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে কেঁদে ফেলল মুনিয়া।
‘সেকি মহারানী? তোমার হরিণচোখে মুক্তো ঝরছে যে!’ ঘুরে মুনিয়ার অশ্রুভেজা চোখে ‘টকাস্’ করে দুটো চুমু খেলেন দাদু। ‘বাহ্! বেশ নোনতা-মিষ্টি তো মুক্তোদানাগুলো!’
‘আমি কিন্তু রেগে যাচ্ছি দাদুভাই!’ অভিমান মিশ্রিত আহ্লাদি কণ্ঠে বলল এবার মুনিয়া।
‘তাহলে বলো আমার মিষ্টি কন্যা, তোমার চোখে কেন এই মুক্তোর বন্যা?’ ছড়া কেটে জানতে চাইলেন দাদু।
‘সে কথা বলবো বলেই তো এলাম!’ অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এলো মুনিয়া। আসলে দাদুর কণ্ঠে ওকে নিয়ে এমন সুন্দর সুন্দর প্রশংসা-মাখানো কথামালা দারুণ বিমোহিত করে ওকে। ভাইয়াটাও পারে এমন। কিন্তু তার জন্যই তো আজ ওর এই কাহিনী!
‘আমার ঠোঁটটা দেখো দাদুভাই!’ বলে নিজের ঠোঁটজোড়া দাদুর দিকে এগিয়ে দিল।
ভালো করে দেখলেন দাদু। কিন্তু কিছুই বুঝলেন না। জানতে চাইলেন, ‘দেখলাম বসরার গোলাপের মতো তোমার ঠোঁটজোড়া। আহ্! কী যে মাতাল করা সুঘ্রাণ বের হচ্ছে!’
‘দাদুভাই!’ আহ্লাদিত কণ্ঠটা বেশ মিষ্টি শোনালো মুনিয়ার।
‘হ্যাঁ দাদুভাই, তোমার নিচের ঠোঁটটা একটু যে ফেটে গেছে, এটা তো আমি দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু কেন এমনটি হলো বলো তো?’
‘সব হয়েছে ভাইয়াটার জন্য!’ ঠোঁটজোড়া আবারও ফুলে উঠল মুনিয়ার। ‘ভাইয়া আমার চ্যাপস্টিকটা নিয়ে গেছে!’
দাদু এতক্ষণে বুঝতে পারলেন আসল কারণটা কী। বললেন, ‘খুউব খারাপ করেছে মুরাদ! তা মুনিয়া দাদুভাই, আমার মুরাদ দাদুভাই তোমার সাথে এটা কেন করলো?’
‘সেটা আমি কীভাবে বলবো?’ বলল মুনিয়া।
‘হুঁউউ..!’ দাদু তার চোখে-মুখে কৃত্রিম গাম্ভীর্য নিয়ে এলেন। ‘খুবই ভাবনার কথা এটা! মুরাদ দাদুভাই কেনো তোমার চ্যাপস্টিকটা নিয়ে যাবে?’ ঠোঁটে আঙুল বুলিয়ে ভাবার অভিনয় করলেন। তারপর আবারও বললেন, ‘আসুক তাহলে তোমার ভাইয়া, এলেই তোমার আম্মুকে বলে পান্তাভাত দিয়ে গাল পুড়িয়ে দেব!’
খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠল মুনিয়া। পরক্ষণই কেমন চুপসে গেল নিজের মধ্যে। সরাসরি দাদুর চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, ‘কী বললে দাদুভাই? পান্তাভাত দিয়ে ভাইয়ার গাল পুড়িয়ে দেবে?’
প্রমাদ গুনলেন দাদু। নির্ঘাত ধরা পড়ে গেছেন তিনি। এখন উপায়?
‘দাদুভাই, আমি কিন্তু এখন সেই ছোট্ট মেয়েটি নেই।’ মুখে বেশ গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তুলে বলল মুনিয়া। ‘এখন আমি ক্লাস টুতে পড়ি! পান্তাভাতে যে গাল পোড়ে না, এটা আমি জানি।’
‘সরি আমরি মিষ্টি মহারনাী!’ বললেন দাদু।
‘তারপরও যে তুমি ভাইয়াকে বকে দিতে চেয়েছো,’ যেন দাদুর কথা শুনতেই পায়নি, তেমনিভাবে বলে চললো মুনিয়া। ‘এতেই আমি খুশি। ভাইয়াটা যদি আমার চ্যাপস্টিকটা না নিয়ে যেত, তাহলে কি আমার ঠোঁট ফেটে এভাবে রক্ত বের হতো?’
‘দাদুভাই, মুনিয়ার কথাটা কিন্তু সত্য না।’ পেছন থেকে বলে উঠল মুরাদ।
কখন যে মুরাদ এসে দাঁড়িয়েছে, তা কেউ টের পায়নি। শেষের দু’একটা কথা ওর কানে গেছে। তাতেই ও এই প্রতিবাদটা করে উঠল।
একলাফে উঠে দাঁড়াল মুনিয়া। মুখোমুখি হলো ভাইয়ার। বলল, ‘তাহলে সত্য কথাটা কী শুনি?’
মুরাদ এবার দাদুর বাম পাশে চলে এলো। বলল তারপর, ‘মুনিয়ার চ্যাপস্টিক কিন্তু আমি নিইনি দাদুভাই।’
‘তাহলে কোথায় আমার চ্যাপস্টিকটা?’ প্রশ্নটা করে দাদু ও ভাইয়ার দিকে পালাক্রমে তাকাতে লাগল মুনিয়া। ও জানে, ভাইয়া ওর সাথে কখনও মিথ্যা কথা বলে না।
‘আপুমণি, ওটা যেখানে থাকার কথা, সেখানেই আছে।’ বলল মুরাদ।
‘তুমি মিথ্যা বলছো ভাইয়া!’
‘সেটা তুমি বিশ্বাস করো?’
জবাবে মুনিয়া এপাশ ওপাশ মাথা নাড়ল।
‘দেখো দাদুভাই,’ এবার দাদুকে সাক্ষী মানলো মুরাদ। ‘মুনিয়া বিশ্বাস করে যে আমি মিথ্যা কথা বলছিনে, তারপরও আমাকে দোষ দিচ্ছে।’
‘ও তোমাকে দোষ দিচ্ছে না মুরাদ দাদুভাই।’ বললেন দাদু। ‘তুমিই দেখো না, আমার মিষ্টি বোনটির ঠোঁটটা কেমন ফেটে গেছে! চামড়া ছড়ে গিয়ে রক্তও বের হয়েছে! এ জন্যেই...’
‘আমি খুবই সরি দাদুভাই।’ মুনিয়ার কণ্ঠটা এবার বেশ মোলায়েম শোনালো। ‘ভাইয়া, তোমার কাছেও আমি সরি।’
মুরাদের অন্তরটা কেমন গুমড়ে উঠল বোনের এই কথায়। এগিয়ে গেলো ছোট্ট বোনটার দিকে। হাঁটু মুড়ে সামনে বসে ওর হাত দু’টো উঠিয়ে নিলো নিজের হাতের মধ্যে। তারপর সে হাত দুটো নিজের দু’গালে ছুঁইয়ে বলল, ‘আমার সোনা বোনটি, তোমার সুন্দর মুখটা ভারী হলে কি আমার ভালো লাগে? নাকি দাদুভাইয়ের লাগে? দেখো তো, দাদুভাইয়েরও চোখে কান্না চলে আসছে!’
মুনিয়া এবার ভাইয়ার কোলে আছড়ে পড়লো। বলল, ‘আমাকে মাফ করে দাও ভাইয়া। আমি খালি খালি তোমার উপরে রাগ করেছি। আসলে ভুলটা আমারই। এই দেখো, চ্যাপস্টিকটা আমার হাতের মধ্যেই রয়েছে। অথচ সারা জায়গায় খুঁজে বেড়াচ্ছি।’
মুরাদ চ্যাপস্টিকটা নিল বোনের হাত থেকে। তারপর ওটার মুখ খুলে বোনের ফাটা ঠোঁটে আলতো করে ঘষে লাগিয়ে দিল।
চকচক করে উঠল মুনিয়ার ঠোঁটজোড়া।
‘ব্যাস, সমাধান তাহলে হয়ে গেল সব সমস্যার।’ বললেন দাদু ওদেরকে উদ্দেশ্য করে। ‘বসো তোমরা। তোমাদেরকে একটা গল্প বলি।’
বসে পড়ল মুনিয়া ও মুরাদ। দাদুভাই আজ নিজ থেকেই গল্প বলতে চেয়েছেন। তারমানে দারুণ গল্প বলবেন নিশ্চয়ই। দাদুর গল্পগুলো বরাবরই ওদের ভালো লাগে। অনেক উপদেশ আর পরামর্শে ঠাসা থাকে সেসব গল্প।
‘বলো দাদুভাই, গল্প বলো।’ দাদুর গা-ঘেষে বসে বললো মুনিয়া।
মুরাদ ঘুরে গিয়ে দাদুর বাম পাশে বসলো। ‘হ্যাঁ দাদুভাই, শীত তো পড়ে গেছে। আর শীতের এই মিষ্টি বিকেলে বসে গল্প শুনতে বেশ ভালোই লাগবে।’
‘হ্যাঁ দাদুভাইয়েরা, আমি এই শীত সম্পর্কিত একটি গল্পই তোমাদেরকে বলবো আজ।’ একটু নড়েচড়ে বসলেন দাদু। তারপর শুরু করলেন, ‘প্রথমে শীতের আগমনের ব্যাপারে একটা কথা জানা যাক। আমাদের এই সুন্দর পৃথিবী যে সূর্যের চারদিকে একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘোরে, এটা তো আমরা জানি। এই ঘোরার সময় পৃথিবী সূর্যের দিকে সামান্য হেলে থাকে। এই ঘোরার বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশ সূর্যের দিকে হেলে থাকে। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে পৃথিবীর দক্ষিণ অংশ কখনো সূর্যের কাছে চলে যায় আবার কখনো উত্তর অংশ। যখন যে অংশ সূর্যের দিকে হেলে থাকে, তখন সেই অংশ খাড়াভাবে বেশিক্ষণ ধরে সূর্যের আলো ও তাপ পায়। ফলে সেই অংশে তখন বেশি গরম পড়ে। এ সময় সেখানে গরম বা গ্রীষ্মকাল থাকে। আর পৃথিবীর এই অংশটি সূর্যের কাছে থাকা মানে উল্টো দিকের অংশটি থাকবে সূর্য থেকে দূরে। ফলে সেখানে আলো ও তাপ কম থাকে। এবং সেখানে শীতকাল হয়।’
একটু থামলেন দাদু। বোঝার চেষ্টা করলেন মুরাদ ও মুনিয়ার মনোভাব। বেশ আগ্রহ ভরে শুনছে ওরা দুই ভাইবোন। ফলে বলার জন্য আরও আগ্রহ পেলেন তিনি।
‘এবার তোমাদেরকে একটা হাদিসের গল্প শোনাই।’ আবার বলতে শুরু করলেন দাদু। বিখ্যাত সহিহ হাদিসের বই বুখারি শরীফে এই হাদিসটি আছে। বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু তায়াল আনহু। তিনি হাদিসটি এভাবে বর্ণনা করেন, আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “জাহান্নাম তার রবের কাছে অভিযোগ করে বলে, হে রব, আমার এক অংশ অন্য অংশকে খেয়ে ফেলছে। মহান আল্লাহ তখন তাকে দু’টি নিঃশ্বাস ফেলার অনুমতি দেন। একটি নিঃশ্বাস শীতকালে, আরেকটি গ্রীষ্মকালে। এ জন্যই তোমরা গরমের তীব্রতা এবং শীতের তীব্রতা পেয়ে থাকো।” শোনো দাদুভাইয়েরা, আমাদের দয়ার নবী এই শীতকালকে “মুমিনের বসন্তকাল” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কারণ, এই সময় দীর্ঘ রাতের কারণে আমরা অনেক নফল ইবাদত করতে পারি। যেমন, নফল নামাজ পড়া, কুরআন তেলাওয়াত করা, আল্লাহর কাছে গুনাহের জন্য মাফ চাওয়া আর সঠিকভাবে নিজের জীবন পরিচালনার জন্য দোয়া করা। অন্যদিকে দিন ছোটো হওয়ায় আমাদের জন্য রোজা রাখাও সহজ হয়।’
আবারও থামলেন দাদু।
দাদু থামতেই কথা বলে উঠলো মুনিয়া, ‘তাহলে তো শীতকাল আমাদের নবীজির প্রিয় ঋতু ছিল।’
‘হ্যাঁ, আমার মহারানী,’ বললেন দাদু। ‘সেটা তো আমরা তার হাদিসের মাধ্যমেই জানতে পারলাম। এখন তোমাদেরকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবো আমি।’
‘বলো দাদুভাই।’ প্রায় সমস্বরে বলে উঠল মুরাদ ও মুনিয়া।
‘এই যে আমার মুনিয়া দাদুভাই,’ বলে চললেন দাদু। ‘শীত জেঁকে না বসতেই যে তোমার ঠোঁট ফেটে রক্ত বের হয়েছে, এরও সহজ সমাধান আছে। শীতকালে অধিকাংশ মানুষেরই এই সমস্যাটা দেখা দেয়। শুধু ঠোঁট না, ত্বক ও চুলেও শুষ্কতার সমস্যা দেখা দেয়। এ জন্য শীতের সময় আমাদেরকে প্রচুর ফলমূল খেতে হবে। আমলকি, পেপে, গাজর, মটরশুটি এসব খেতে হবে। এসব ফলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-সি থাকে। যা ত্বক ও চুল ভালো রাখতে সাহায্য করে। শীতে পাকা পেপে খেলে আরও অনেক উপকার পাওয়া যায়। খুবই পুষ্টিকর এই পেপে। পেপেতে থাকা ভিটামিন-সি শরীরের রোগ প্রদিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগা রোগীদের জন্য খালি পেটে পেপে খাওয়া আরও বেশি উপকারী। তোমরা জেনে অবাক হবে যে, পেপেতে এমন উপাদান থাকে যা শরীরে খারাপ কোলেস্টরলের মাত্রা কমায় এবং পাশাপাশি হার্ট অ্যাটাক, হার্ট স্ট্রোকের মতো মারাত্মক রোগ থেকে দূরে রাখে আবার হার্ট সুস্থ রাখে। এ ছাড়া ডায়াবেটিস ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য পেপে খুবই সাহায্য করে।’
‘আমি জানি দাদুভাই, তুমি কেন এমন ঘটা করে পাকা পেপে খাওয়ার কথা বললে।’ দাদু থামতেই বলে উঠল মুরাদ।
হাসলেন দাদু। বললেন, ‘তুমি তাহলে বিষয়টা ধরতে পেরেছো। কিন্তু মুনিয়া মহারানীর জন্য একটু খুলে বলো দাদুভাই। ওরও নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে।’
‘কিন্তু ওগুলোতে তো ওদেরও রিজিক নির্ধারিত রয়েছে, সে জন্যেই খেতে পারছে।’ বললো মুরাদ, একটু ঘুরিয়ে।
মুনিয়া বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে ভাইয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।
মুরাদ বললো আবার, ‘ওই দেখো আপুমণি, আমাদের পেপে গাছের একটা পাকা পেপে সুন্দর হলুদ পাখিটা ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে। কী মিষ্টি লাগছে পাখিটাকে, তাই না?’ চোখজোড়া চকচক করছে মুরাদের।
ভাইয়াকে লক্ষ্য করে মুনিয়াও তাকালো পেপে গাছটার দিকে। হ্যাঁ, অত্যান্ত মায়াবী সুন্দর একটা হলুদ পাখি তার ঠোঁট দিয়ে ঠুকরে ঠুকরে একটা পাকা পেপে খাচ্ছে। বেশ ভালো লাগলো মুনিয়ার। পাখি, প্রজাপতি, ফড়িং ওর বেশ পছন্দের।
‘হলুদ পাখিটারও কি তাহলে আমার মতো ঠোঁট ফেটে গেছে যে পেপে খাচ্ছে?’ যেনো নিজেকেই প্রশ্নটা করলো মুনিয়া।
তারপর একদৃষ্টে সেদিকেই তাকিয়ে রইলো। যেনো মনের মধ্যে সুন্দর কোনো স্বপ্ন এঁকে চলেছে। কল্পনার ডানা মেলে দিয়েছে পাখিটার পাশে। মুহূর্তেই ভাব জমিয়ে ওটার সঙ্গী হয়ে গেছে। একটু তফাতে লাল-সাদা আর হলুদ গোলাপের ঝাড়ের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। ডালিয়া ফুলের রঙিন পাপড়ি বুঝি ডানায় জড়িয়ে যাচ্ছে। বেগুনী অপরাজিতার রং মেখে নিচ্ছে ঠোঁটে, মাথায়। গাদা ফুলের রেণু উড়ছে চারধারে।
গোধূলীর নরোম ও মায়াবী আবহ তখন ছড়িয়ে পড়েছে সমস্ত বাগানটিতে।
ফুলের রেণু আর গোধূলীর সেই মাখামাখিতে কেবলই উড়ছে হলুদ পাখি আর আমাদের মুনিয়া।
-