সুসান পাগানি
মার্কিন মুলুকে গাছের গুড়িতে এভাবেই খেলছে একটি শিশু ছবি: সংগৃহীত
একজন প্রাপ্তবয়স্কের চোখে স্কুলের মাঠে ছড়িয়ে থাকা গাছের গুঁড়ি কিংবা পাথরের স্তূপ হয়তো কেবলই আবর্জনা বা বিশৃঙ্খল কিছু। কিন্তু একটি শিশুর বিস্ময়ভরা চোখে সেই গুঁড়িটাই হয়ে ওঠে এক জাদুকরী মঞ্চ, কখনও বা রান্নাবাটির টেবিল, আবার কখনও বন্ধুদের নিয়ে গোল হয়ে আড্ডা দেওয়ার আস্তানা।
“বাচ্চারা এগুলো খুব পছন্দ করে,” বলছিলেন ওকল্যান্ড ইউনিফাইড স্কুল ডিস্ট্রিক্টের প্রোগ্রাম ইমপ্রুভমেন্টের পরিচালক মেগান অ্যালেগ্রেটি। “তারা এগুলোকে তাদের কল্পনার জগতের অংশ বানিয়ে নেয়। এই কারণেই আমরা একে বলি ‘প্রকৃতি অন্বেষণ এলাকা’ (Nature Exploration Area বা NEA)। এগুলো এমনভাবে তৈরি যাতে শিশুরা তাদের সৃজনশীলতা ব্যবহার করে প্রকৃতির আনন্দ নিতে পারে।”
প্রকৃতি অন্বেষণ এলাকা বা NEA কী?
প্রকৃতি অন্বেষণ এলাকা (NEA) হলো এমন একটি পরিকল্পিত বহিরঙ্গন স্থান, যেখানে কৃত্রিম প্লাস্টিক বা লোহার খেলার সরঞ্জামের বদলে প্রাকৃতিক উপাদানকে প্রধান্য দেওয়া হয়। এখানে থাকে গাছের গুঁড়ি, বড় পাথর, স্থানীয় গাছপালা, পরাগায়নকারী ফুলের বাগান, সবজি বাগান এবং ফলের গাছ। এটি এমন এক পরিবেশ যেখানে শিশুরা হাত দিয়ে মাটি স্পর্শ করে, পাথর গুনে কিংবা গাছের ডালে ভারসাম্য বজায় রেখে খেলার মাধ্যমে প্রকৃতির সাথে আজীবন এক আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলে।
কেন বাড়ছে এই উদ্যোগ?
বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে পার্ক, স্কুল এবং শৈশব শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে NEA তৈরির হিড়িক পড়েছে। বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া জনপদগুলোতে, যেখানে সবুজ শ্যামলিমার অভাব রয়েছে, সেখানে নগর নেতারা এই প্রকল্পকে প্রকৃতির অধিকার নিশ্চিত করার একটি কৌশল হিসেবে দেখছেন।
‘কাবুম!’ (KABOOM!) সংস্থার সহযোগী পরিচালক অ্যাবে ইওয়েল লংস্টেইন বলেন, “শহরে বড় হওয়া শিশুরা, বিশেষ করে যারা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা এলাকায় থাকে, তারা প্রায়ই পার্ক বা সবুজ জায়গা থেকে বঞ্চিত হয়। অনেকের বাড়ির আশেপাশে একটা ভালো গাছও নেই। NEA হলো এমন একটি মাধ্যম যা এই বৈষম্য দূর করে শিশুদের জন্য এক আনন্দময় ও প্রাণবন্ত পরিবেশ তৈরি করে।”
শিশুর বিকাশে প্রকৃতির ভূমিকা
গবেষণায় দেখা গেছে, প্লাস্টিকের স্লাইড বা দোলনার চেয়ে প্রকৃতি-ভিত্তিক পরিবেশে শিশুরা অনেক বেশি সক্রিয় থাকে। গাছের গুঁড়ির ওপর দিয়ে হাঁটা বা নিচু পাথর থেকে লাফ দেওয়ার মতো ‘উপকারী ঝুঁকি’ (Beneficial Risk) তাদের শারীরিক ভারসাম্য এবং মোটর স্কিল (Motor Skills) উন্নত করে।
শুধু শারীরিক নয়, মানসিক বিকাশেও এর ভূমিকা অপরিসীম। অসংগঠিত এই খেলাধুলা শিশুদের সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং সামাজিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করে। দীর্ঘক্ষণ প্রকৃতির মাঝে থাকলে শিশুদের মেজাজ নিয়ন্ত্রণে থাকে, মানসিক চাপ কমে এবং পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে।
সফলতার তিন গল্প
১. ওকল্যান্ড: অ্যাসফল্ট থেকে অরণ্যে
ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে গত তিন বছরে ২০টি স্কুলে NEA স্থাপন করা হয়েছে। আগে এই স্কুলের মাঠগুলো ছিল কেবল তপ্ত অ্যাসফল্ট আর বাস্কেটবল কোর্ট। এখন সেখানে ছোট ছোট জলাভূমি, লাল কাঠের গোল চাকতি এবং আলগা কাঠের অংশ দিয়ে সাজানো হয়েছে খেলার জায়গা। মজার বিষয় হলো, এই স্থানগুলোর নকশা করেছে খোদ শিশুরা। ‘ডিজাইন ডে’-তে শিশুরা তাদের স্বপ্নের খেলার মাঠ আঁকে এবং অভিভাবক ও স্বেচ্ছাসেবীরা মিলে তা বাস্তবে রূপ দেন।
২. অস্টিন: যখন নীতিমালায় প্রকৃতি
টেক্সাসের অস্টিন শহরে পার্ক ও স্কুল মিলিয়ে প্রায় ৩০টি স্থানে NEA তৈরি হয়েছে। এখানে তারা কেবল মাঠ তৈরি করেই থেমে থাকেনি, বরং বিষয়টিকে শহরের স্থায়ী নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত করেছে। অস্টিন ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্কুল ডিস্ট্রিক্ট এখন যেকোনো নতুন খেলার মাঠ তৈরির সময় NEA রাখা বাধ্যতামূলক করেছে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থার পরিবর্তনের চমৎকার উদাহরণ।
৩. প্রভিডেন্স: পরিবেশগত বিচার ও শিক্ষা
রোড আইল্যান্ডের প্রভিডেন্সে শহরের ৯৭ শতাংশ পার্ক সংস্কার করে সেখানে প্রাকৃতিক উপাদান যুক্ত করা হয়েছে। এখানে NEA-কে ব্যবহার করা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায়। বৃষ্টির জল ধরে রাখা বা স্থানীয় ঘাস ও ফুলের চাষের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। এখানে বাগান করার পাশাপাশি স্কেটবোর্ডিংয়ের জায়গাও রাখা হয়েছে, যাতে কিশোর-কিশোরীরাও প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকতে পারে।
নিরাপত্তা ও সচেতনতা
অনেক অভিভাবক শুরুতে ভয় পান যে, পাথর বা কাঠের গুঁড়িতে বাচ্চাদের আঘাত লাগার ঝুঁকি বেশি। কিন্তু প্রভিডেন্সের পার্ক সুপারিনটেনডেন্ট ওয়েন্ডি নিলসন এক চমকপ্রদ তথ্য দেন। তিনি জানান, গত ১০ বছরে তাদের এলাকায় নথিভুক্ত বড় কোনো আঘাতের ঘটনা প্রকৃতি অন্বেষণ এলাকায় ঘটেনি; বরং বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটেছে প্রথাগত লোহার বা প্লাস্টিকের সরঞ্জামে খেলার সময়।
প্রকৃতি অন্বেষণ এলাকাগুলো কেবল খেলার জায়গা নয়, এগুলো এক একটি জীবন্ত শ্রেণীকক্ষ। এখানে শিশুরা কোনো গাইড ছাড়াই আবিষ্কার করতে শেখে, শিখতে শেখে পৃথিবীকে ভালোবাসতে। যখন একটি শিশু কাদার ভেতর হাত ডুবিয়ে বীজ রোপণ করে কিংবা লাঠি দিয়ে দুর্গ বানায়, তখন সে কেবল খেলছে না, সে তার ভবিষ্যতের বুনিয়াদ গড়ছে প্রকৃতির পরম মমতায়।
আমাদের দেশের শহরগুলোতেও যেখানে কংক্রিটের জঙ্গল বাড়ছে, সেখানে এমন ‘প্রকৃতি অন্বেষণ এলাকা’ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। শিশুদের শৈশবকে প্লাস্টিকের খাঁচা থেকে মুক্ত করে পুনরায় মাটির কাছে ফিরিয়ে দেওয়াই হোক আমাদের লক্ষ্য।
অনুবাদ ও রূপান্তর: মহিউদ্দীন মোহাম্মদ