গল্প
সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার। মেঘে মেঘে যেন মুখ গোমড়া করে আছে! দু’এক পশলা বৃষ্টিও হয়েছে। এখন ঝুম বৃষ্টিতে হুড়মুড়িয়ে ভেঙ্গে পড়ার অবস্থা। সূর্য তাই মেঘের আড়ালে মুখ লুকিয়ে বসে আছে! আচ্ছা, সূর্যের কি ঈদে একটুও আনন্দ করতে ইচ্ছে করে না! না করুক; ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ঈদের আনন্দ দেখেও তো খুশি হতে পারে! তাহলেও তো মেঘের পিঠে চাটি মেরে সরিয়ে উঁকি দিতে পারে। সকাল থেকে এসবই ভাবছে ফাহিম।
সকাল আটটায় ঈদের জামাত। আর ঘণ্টাখানেক বাকি। ফাহিম প্রস্তুতি নিচ্ছে, বাবার সাথে ঈদগাহে নামাজ পড়বে। কিন্তু এর মধ্যে বৃষ্টি শুরু। এখন উপায়! ছাতা মাথায় ঈদগাহে যেতে হবে। কিন্তু বৃষ্টি-কাদায় তো নতুন জামা-প্যান্টটাই নোংরা হয়ে যাবে। তা যাক! তবু নতুন জামা পরেই ঈদ-জামাতে যাবে ফাহিম। নতুন জামা-প্যান্ট আর টুপি পরে জায়নামাজ নিয়ে বাবার সাথে বের হয় ফাহিম।
এখন বৃষ্টি পড়ছে না। তবুও ছোট টিপছাতা নিয়ে নেয়। বৃষ্টি বাদেই ভালোয় ভালোয় ঈদের জামাত শেষ হয়। নামাজ শেষে প্রথমে বাবার সাথেই কোলাকুলি করে ফাহিম। কোলাকুলি শেষ হতেই দেখে, একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে তার স্কুলের বন্ধু কালাম।
ফাহিমদের বাড়ির পেছনেই রফিক চাচাদের বাড়িতে ভাড়া থাকে কালামরা। ক্লাস ফোরে ফাহিমদের সাথে পড়ে। কিন্তু নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না। কালামের বাবা কাগজের ঠোঙা তৈরি করে বিক্রি করেন। যখন অর্ডার বেশি থাকে, কালামকেও ঠোঙা বানাতে বসে যেতে হয়। তখন আর স্কুলে যাওয়া হয় না। পরে ফাহিমের কাছ থেকে পড়া দেখে নেয়। ফাহিমও তাকে সহযোগিতা করে।
কালামকে দেখে এগিয়ে যায় ফাহিম। তার সাথে কোলাকুলি করে। কিন্তু কালামের মুখ মলিন; মন খারাপ। কালাম বলে, ‘বৃষ্টি কাদা বলে মা নতুন পাঞ্জাবি পরতে দেয়নি। তাই পুরোনো পাঞ্জাবি পরে নামাজ পড়তে এসেছি।’
কালামকে বাড়িতে আসতে বলে ফাহিম বাবার সাথে বাড়ির পথ ধরে। বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই ঝুমঝুম করে বৃষ্টি শুরু হয়।
ফাহিমের লাচ্চা সেমাই খুব পছন্দ। ঘরে ঢুকতেই লাচ্চা সেমাই এগিয়ে দেন মা। সেমাই শেষ করেই খিচুড়ি আর গরুর মাংস নিয়ে বসে যায় সে। এই বৃষ্টিতে গরম গরম খিচুড়ি আর মাংসে যেন জিভে জল চলে আসে। খেতে বসতেই পেছন থেকে বিড়াল ‘মিয়াঁও’ করে ডেকে ওঠে।
বিড়ালটা ফাহিমদের না। পছন্দ করলেও বিড়ালকে ভয় পায় ফাহিম। ছোট্টবেলায় একবার বিড়াল তাকে হাঁচড়ে দিয়েছিল। সেই ভয় তার আজও যায়নি। বিড়ালটা আবারও ‘মিয়াঁও’ করে ডাক দেয়। ফাহিম তাকিয়ে দেখে বিড়ালটা কালামদের ।
‘মিনি’ বলে ডাক দিতেই বিড়ালটা এগিয়ে আসে ফাহিমের কাছে। মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে হাড়-মাংস খেতে দেয়। মিনি তৃপ্তির সাথে খায়।
মিনি’কে খেতে দিয়ে ফাহিম তার মাকে জিজ্ঞেস করে, ‘আম্মা, কালামদের বাড়িতে কি ভাল কিছু রান্না হয়নি?’
‘কেন একথা মনে হলো, ফাহিম?’, মা জানতে চান।
ফাহিম বলে, ‘মাংস-টাংস রান্না হলে তো মিনি’র এই সময় আমাদের বাড়িতে আসার কথা না!’
ফাহিমের মা বলেন, ‘হতে পারে, রান্না হয়নি! আবার এও হতে পারে, মিনি’র হয়ত খেয়ে পেট ভরেনি, তাই এসেছে।’
ফাহিমের মা একটু থেমে বলেন, ‘কিন্তু কালাম তোমার বন্ধু, আর আমাদের প্রতিবেশী। তাই তোমার খোঁজ নেয়া উচিত।’
ফাহিম কোনোমতে খাওয়া শেষ করে ঘুরতে যাওয়ার নামে কালামকে ডাকতে যায়। গিয়ে দেখে কালাম ঘরে শুয়ে কাঁদছে, আর ওর মা ঠোঙা তৈরি করছেন।
কালামকে না ডেকেই বাড়িতে ফিরে আসে ফাহিম। বুঝতে পারে, ওদের বাড়িতে ভাল কোনো খাবার রান্না হয়নি। আর ঈদে হয়তো নতুন জামাও কেনা হয়নি। তাই পুরোনো পাঞ্জাবিতে নামাজ পড়তে গিয়ে তাকে ওই কথা বলেছে।
ঘরে ফিরে মাকে বিষয়টি জানায় ফাহিম। বলে, ‘আম্মা, আমার মনে হয় নতুন জামা কেনা হয়নি বলেই কালাম কাঁদছে। আর ওদের ভাল কিছু রান্নাও হয়নি।’
ফাহিমের মা জানতে চান, ‘তাহলে এখন আমাদের কী করা উচিত, ফাহিম?’
ফাহিম বলে, ‘আম্মা, তুমি যদি রাগ না করো, তাহলে একটা কথা বলি?’
মা সম্মতি দিলে ফাহিম বলে, ‘ঈদে তো আমার তিন সেট জামা-প্যান্ট, পাঞ্জাবি-পাজামা হয়েছে। বড় মামা যে পাঞ্জাবি-পাজামা দিয়েছে, সেটা কালামকে দিয়ে দিই?’
একটু থেমে ফাহিম বলে, ‘আর বাটিতে করে সেমাই, খিচুড়ি আর গরুর মাংস দাও; সেটাও দিয়ে আসি!’
ফাহিমের কথায় খুবই খুশি হন মা। তাকে জড়িয়ে ধরে আদর করে বলেন, ‘ঠিক আছে, বাবা! তুমি যেটা বলেছো, প্রতিবেশী হিসেবে সেটাই আমাদের কর্তব্য।’
একটু পরেই খাবারের বাটি ও পাঞ্জাবি-পাজামা নিয়ে কালামদের বাড়িতে হাজির হয় ফাহিম। খাবারের বাটি কালামের মায়ের হাতে দিয়ে বলে, ‘খালাম্মা, এটা আম্মা পাঠিয়েছেন। আর কালাম কই? ওকে ডেকে দেন।’
কালাম বাইরে আসলে ওর হাতে পাঞ্জাবি পাজামার প্যাকেটটি ধরিয়ে দিয়ে পরে আসতে বলে ফাহিম। কিন্তু কালাম দাঁড়িয়েই থাকে।
তখন কালামের মাকে ফাহিম বলে, ‘খালাম্মা, আপনি ওকে বলুন না এটা পরে আসতে। আমি আম্মাকে বলেছি, আমার বন্ধু যদি নতুন জামা না পরে, তাহলে আমি একা নতুন জামা পরে তো আনন্দ হবে না। তাইতো আম্মু এটা দিয়ে পাঠিয়েছেন।’
কালামের মা কালামকে পাঞ্জাবি-পাজামা পরতে বলেন। ঘরে গিয়ে পাঞ্জাবি-পাজামা পরে বাইরে আসে কালাম। তার চোখে অশ্রু-মুখে হাসি। বাইরে এসে ফাহিমকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে কালাম। ফাহিমের চোখ দিয়েও গড়িয়ে পড়ে পানি। কালামের চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে ফাহিম বলে, ‘ধুর বোকা, ঈদের দিনে কাঁদতে আছে? চল্, আমরা ঘুরতে যাব।’
সকাল থেকে মুখ লুকিয়ে থাকা সূর্যও যেন এই খুশিতে জেগে ওঠে। মেঘের পর্দা সরিয়ে উঁকি দিয়ে ঝলমল করে হেসে ওঠে, কিন্তু সেই হাসিও ফাহিম-কালামের হাসির কাছে মলিন মনে হয়!