এম এ আজীম
মানব সভ্যতার ইতিহাস কেবল উন্নতি ও অগ্রগতির ধারাবিবরণী নয়; এটি একই সঙ্গে পতন, বিভ্রান্তি ও আত্মবিনাশেরও দীর্ঘ উপাখ্যান। যুগে যুগে দেখা গেছে, যখন কোনো সভ্যতার বুকে সত্যের আলো ম্লান হয়ে আসে এবং তার স্থান দখল করে নেয় মিথ্যা, গুজব ও ছলনার অন্ধকার, তখন সেই সভ্যতা ধীরে ধীরে নিজের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়। সভ্যতার পতন তখন আর কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা থাকে না; তা হয়ে ওঠে এক অনিবার্য পরিণতি।
সত্য হলো সমাজের নৈতিক মেরুদণ্ড। এর উপর ভর করেই বিশ্বাস, ন্যায়বোধ ও মানবিকতা গড়ে ওঠে। কিন্তু যখন সত্যের পরিবর্তে মিথ্যা হয়ে ওঠে ক্ষমতার হাতিয়ার, তখন সমাজের ভেতরকার সম্পর্কগুলো বিষাক্ত হয়ে যায়। মানুষ আর মানুষের উপর আস্থা রাখতে পারে না, কথার আর মূল্য থাকে না, আর নৈতিকতা পরিণত হয় সুবিধাবাদের মুখোশে। এই অবস্থায় সভ্যতা বাহ্যিকভাবে যতই সমৃদ্ধ হোক না কেন, তার আত্মা তখন ক্ষয়ে যেতে থাকে।
দার্শনিক দৃষ্টিতে মিথ্যা একধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা। ব্যক্তি যেমন নিজেকে মিথ্যার দ্বারা সাময়িক সান্ত্বনা দিতে পারে, সভ্যতাও তেমনি মিথ্যার উপর দাঁড়িয়ে নিজেকে শক্তিশালী ভাবতে শুরু করে। কিন্তু এই শক্তি কাচের মতো ভঙ্গুর। সময়ের এক পর্যায়ে সেই মিথ্যার স্তূপ ভেঙে পড়ে, আর তার নিচে চাপা পড়ে যায় সভ্যতার অর্জন, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধ।
অনেকে বলেন, তখন প্রকৃতি সেই সভ্যতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়—ভূমিকম্প, বন্যা, খরা, মহামারির মতো দুর্যোগ নেমে আসে। কিন্তু প্রকৃতি কি সত্যিই বৈরি হয়? নাকি মানুষই প্রকৃতির সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে বিকৃত করে তোলে? লোভ, ভোগবাদ ও অসংযমের মাধ্যমে মানুষ যখন প্রকৃতিকে শোষণ করে, তখন প্রকৃতির প্রতিক্রিয়াকে আমরা ভুল করে “প্রকৃতির রোষ” বলে চিহ্নিত করি। আসলে তা মানুষেরই কর্মফল, যা সময়ের ব্যবধানে ভয়াবহ রূপ নেয়।
তবুও ইতিহাস সম্পূর্ণ হতাশার কথা বলে না। এক সভ্যতার পতনের পর দীর্ঘ অন্ধকার যুগ পেরিয়ে আবার নতুন আলো জ্বলে ওঠে। ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়েই জন্ম নেয় নতুন চিন্তা, নতুন মূল্যবোধ, নতুন সভ্যতা। এই পুনর্জন্মের কেন্দ্রে থাকে একটাই বিষয়—সত্যের পুনরাবিষ্কার। মানুষ আবার শিখে নেয় সত্যকে সম্মান করতে, প্রশ্ন করতে, দায়িত্ব নিতে।
আজকের পৃথিবী কি সেই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে? হয়তো আমরা এক গভীর দার্শনিক সন্ধিক্ষণে রয়েছি। তথ্যের ভিড়ে সত্য হারিয়ে যাচ্ছে, গুজব হয়ে উঠছে বাস্তবের চেয়েও শক্তিশালী। এই মুহূর্তে আমাদের সামনে এক মৌলিক প্রশ্ন দাঁড়িয়ে—আমরা কি মিথ্যার আরামে চোখ বুজে থাকব, নাকি অস্বস্তিকর হলেও সত্যের পথ বেছে নেব?
সভ্যতার ভবিষ্যৎ কোনো অদৃশ্য শক্তির হাতে নয়; তা নির্ধারিত হচ্ছে আমাদের প্রতিদিনের চিন্তা, কথা ও কর্মের মাধ্যমে। সত্যকে আঁকড়ে ধরাই হয়তো ধ্বংস এড়ানোর একমাত্র উপায়—না হলে ইতিহাস আবার নিজেকে নির্মমভাবে পুনরাবৃত্তি করবে।