Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

সাগরদাঁড়ির মসজিদ থেকে মধুসূদনের দ্বিতীয় ভাষার গোড়া পত্তন

আবু মুয়াজ মাসুম বিল্লাহ আবু মুয়াজ মাসুম বিল্লাহ
প্রকাশ : রবিবার, ২৫ জানুয়ারি,২০২৬, ১২:৫৬ এ এম
আপডেট : রবিবার, ২৫ জানুয়ারি,২০২৬, ০১:৪৬ এ এম
সাগরদাঁড়ির মসজিদ থেকে মধুসূদনের দ্বিতীয় ভাষার গোড়া পত্তন

যশোরের সাগরদাঁড়ির মসজিদ থেকে মধুসূদনের দ্বিতীয় ভাষার গোড়া পত্তন হয়েছিল। বাংলার পাশাপাশি প্রথম ফার্সিতে তিনি অবগাহন করেছিলেন।

যশোর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রাম ছিল উনিশ শতকের বাংলার এক উজ্জ্বল জনপদ। শস্যভরা মাঠ, ছায়াঘেরা পথ, পাখির কলরব আর পাশ দিয়ে বয়ে চলা কপোতাক্ষ নদ,এই সবকিছু মিলেই শিশু মধুসূদনের মননে তৈরি হয়েছিল এক অনন্য সংবেদনশীলতা।
১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি এই গ্রামেই জন্ম নেন বাংলা সাহিত্যের সেই অমর বিপ্লবী, যিনি পরবর্তীকালে বাংলা কাব্যকে মধ্যযুগীয় আবরণ ভেঙে আধুনিকতার আলোয় দাঁড় করান। পিতা রাজনারায়ণ বসু ছিলেন শিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান ব্যক্তি, আর মাতা জাহ্নবী দেবী ছিলেন সন্তান লালনে যত্নবান ও স্নেহশীলা। পরিবার, প্রকৃতি ও পরিবেশ, এই তিনের সম্মিলিত প্রভাবে গড়ে উঠছিল এক অসাধারণ মননশীল প্রতিভা।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের শিক্ষাজীবনের শুরু কোনো বিলিতি স্কুলে নয়, বরং ঘরোয়া পরিবেশে। শৈশবে মায়ের কাছেই তার লেখাপড়ার হাতেখড়ি। কিন্তু খুব অল্প বয়সেই তিনি যে শিক্ষার পথে প্রবেশ করেন, তা ছিল তৎকালীন বাংলার সমাজ কাঠামোর তুলনায় কিছুটা ব্যতিক্রমী।

কথিত আছে সাগরদাঁড়ির অদূরে অবস্থিত শেখপুরা জামে মসজিদই তার জীবনের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকেন্দ্র। এখানকার ইমাম ও শিক্ষক ছিলেন একজন বিদগ্ধ আলেম, যিনি ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি ভাষা শিক্ষাকেও গুরুত্ব দিতেন। এই ইমামের তত্ত্বাবধানেই মধুসূদন শেখেন, আরবি ও ফার্সি।

এটি নিছক কোনো সাধারণ শিক্ষা ছিল না। উনিশ শতকের বাংলায় ফারসি ছিল প্রশাসন, সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অন্যতম ভাষা। ফারসি ভাষার কাব্যিক ভঙ্গি, উপমা ও রূপকের গভীরতা এবং বাক্যগঠনের সৌন্দর্য শিশুমনে গভীর ছাপ ফেলে।
এটা বলা ভালো, শেখপুরা জামে মসজিদ এটি বাংলার ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ি ইউনিয়নের শেখপুরা গ্রামে অবস্থিত এই মসজিদটি মুঘল আমলের স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন।

প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, মসজিদটি সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে নির্মিত। তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই স্থাপনা মুঘল স্থাপত্যরীতির নিখুঁত উদাহরণ। পূর্বদিকে ছিল চার স্তম্ভের ওপর দাঁড়ানো বারান্দা, যার ধ্বংসাবশেষ আজও ইতিহাসের স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে নথিভুক্ত করে। লোককথা ও স্থানীয় ইতিহাস বলছে,এই মসজিদেই মাইকেল মধুসূদন দত্ত ফারসি ভাষার প্রাথমিক পাঠ গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি তিনি সাগরদাঁড়ি থেকে পায়ে হেঁটে এই মসজিদে আসতেন ভাষা শেখার জন্য।

এই দৃশ্য কল্পনা করলেই বোঝা যায়,এক কিশোর, হাতে বই, মনে কৌতূহল, ইতিহাসের এক প্রাচীন মসজিদে বসে শিখছে ভাষার রহস্য। হয়তো বা এখানেই বোনা হচ্ছিল ভবিষ্যৎ মহাকাব্যের বীজ।

শেখপুরা জামে মসজিদে শেখা ফার্সি ভাষা মধুসূদনের কাছে শুধু শব্দভাণ্ডার বাড়ানোর মাধ্যম ছিল না। ফার্সি তাকে শিখিয়েছে অনেক কিছু। তবে তিনি কখনও ফার্সিতে বুৎপত্তি অর্জন করে ওই ভাষার শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য ফেরদৌসির শাহানামা পড়েছেন কি না- এ তথ্য আমাদের সামনে নেই।

১৩ বছর বয়সে মধুসূদন সাগরদাঁড়ির মায়া কাটিয়ে পাড়ি জমান কলকাতায়। প্রথমে কিছুদিন স্থানীয় এক স্কুলে পড়াশোনা করার পর তিনি ভর্তি হন তৎকালীন প্রখ্যাত হিন্দু কলেজে বর্তমান প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পড়েন, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য ও সংস্কৃত।

ইংরেজি সাহিত্য তাকে পাশ্চাত্যের ভাবধারার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, আর ফারসি ও সংস্কৃত তার প্রাচ্য ভিত্তিকে আরও মজবুত করেছে বোধ করি। সম্ভত এই ত্রয়ী ভাষার সম্মিলনেই তৈরি হয় মধুসূদনের অনন্য সাহিত্যিক স্বর।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যে যা করেছেন, তা কেবল প্রতিভার ফল নয়,এটি দীর্ঘ ভাষা-চর্চার ফসল।
তার উল্লেখযোগ্য রচনাসমূহ-

মেঘনাদবধ কাব্য (১৮৬১) বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক মহাকাব্য শর্মিষ্ঠা, বাংলা নাটকে ট্র্যাজেডির সূচনা বীরাঙ্গনা, নারীর কণ্ঠে বীরত্বের প্রকাশ কৃষ্ণকুমারী, পদ্মাবতী, মায়াকানন নাট্যসাহিত্যে নতুন আঙ্গিক সনেট, বাংলা কাব্যে ইউরোপীয় ছন্দের প্রবর্তন।
এই সব রচনার ভেতরে কোথাও ফারসি কাব্যের গাম্ভীর্য, কোথাও ইংরেজি ট্র্যাজেডির কাঠামো, আবার কোথাও সংস্কৃত মহাকাব্যের গৌরব সব মিলিয়ে এক বহুভাষিক সাহিত্যিক বিস্ময়।

মধুসূদন দত্তের জীবন আমাদের শেখায়, মহত্ত্বের শুরু অনেক সময় হয় খুব সাধারণ জায়গা থেকে। সাগরদাঁড়ির এক প্রাচীন মসজিদ, এক আলেম ইমাম, কিছু ভাষার পাঠ, এই সামান্য মনে হওয়া বিষয়গুলোই পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস বদলে দিয়েছে।

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)