❒ পান্তা ভাতে ঘি!
সিদ্দিকা লাকী
শহরের অন্যতম সেরা একটি সুপারশপে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস অনলাইনে অর্ডার দিয়েছিলাম। সময়টা ছিল ভোর রাতের দিকে। তাই আমি তাদের ১ম স্লট অর্থাৎ সকাল ১০-০১ টার মধ্যে ডেলিভারি টাইম পেয়ে যাই।
দিনটি ছিল ছুটির দিন। সাপ্তাহিক ছুটির এই কর্মহীন দিনে আমি নরমালি সংসার কর্মযজ্ঞ পালন করি। এটা সেটা খুঁটি নাটি নিয়ে দিন কেটে যায়।এদিকে সময়মত ডেলিভারি না পাওয়ায় বাড়তি চিন্তা করি। অপেক্ষার এক পর্যায়ে হটলাইনে ফোন করি।আমি কখনোই আমার ব্যক্তিগত প্রয়োজনে পরিচয় দিয়ে কথা বলতে অভ্যস্ত নই।বরং কেউ জেনে গেলে সেল্ফ ডিফেন্স নেবার চেষ্টা করি।যাক সে কথা। আমি ২য় স্লটেও জিনিস না পাওয়ার বিষয়টিতে তারা খুব দুঃখ প্রকাশ করে এবং আমাকে আশ্বস্ত করে যে আমি ১ ঘন্টার মধ্যে কাঙ্খিত ডেলিভারি পেয়ে যাবো। যেই কথা সেই কাজ।ডেলিভারি বয় হাজির।এবার দেখি আরেক কান্ড।একই ওর্ডারের জিনিসগুলো কিন্তু আংশিক পেলাম।নরমালি জিনিস দিতে না পারলে তাদের রিফান্ড অপশন থাকে যা আমার কার্ডে জমা হয়ে যায়। ইজি ম্যাথ। কিন্তু তারা তো সেটা ও বলে নি। এবার ভাবলাম, থাক আর ফোন না করি। কিছুক্ষণের মধ্যে আবার ডেলিভারি বয় হাজির। সরি বলে বাকি জিনিসগুলো দিয়ে গেল।
করিম তাঁতীর সততার কথা মনে পড়ে গেল। আমার সহকারীর মুখখানা বেজায় খুশিতে ভরে গেল।
এর একটা বিরাট কারণ আছে। আমি তাকে যাপিত জীবনের সবটুকু পরিচর্যা করতে চেষ্টা করি। এই জিনিসগুলোর বেশিরভাগই মূলত তার ১ মাসের বাজার বলা যায়।
ইতিমধ্যে আবার সেই কলসেন্টারের ফোন। সরি বলে বিনীতভাবে প্রশ্ন করে, জিনিসগুলো পেয়েছি কি না। আমি ইতিবাচক জবাব দিয়ে পাল্টা ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন রাখি। তারা বলে, যে এটা তাদের একটা মিসকমিউনিকেশন।
ঘটনার তিনদিন পেরিয়ে আজ রুটিন ব্যস্ততায় মধ্যদুপুরে সেমিনার, মিটিং, আর দাপ্তরিক কাজের ক্লান্তি আর কিছুটা ক্ষুধার জ্বালায় আমি যখন চৌঁচির তখন বডিগার্ডকে বলি,যা আছে তা খেতে দিতে। আমি তার আসমানসমান আন্তরিকতায় সাদামাটা লাঞ্চ তৃপ্তির সাথে উদরপূর্তি করতেই আবার সেই কল সেন্টারের ফোন। একটা মিসকল। এটা ২য় চেষ্টা। ফোন রিসিভ করতেই ও প্রান্ত থেকে এক ভদ্রমহিলা নিজেকে এক্সিকিউটিভ পরিচয় দিয়ে আবার অনুশোচনা করে সরি বলে। আমি তাকে আশ্বস্ত করি যে আমি জিনিসগুলো ঠিকমতোই পেয়েছি, আর আমার কোন অভিযোগ নেই। আর এটাও বলি, যে আমি তাদের রেগুলার ক্লায়েন্ট অনলাইন অফলাইন বোথ। ভদ্রমহিলা যেন আমাকে খুশি করতে পেরে নিজেকে অপরাধবোধ থেকে মুক্ত করলেন।
ঘটনাটি আপনাদের কাছে খুব স্বাভাবিক মনে হতে পারে। আমার কাছে এ ঘটনা থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। কারো সম্মানে আঘাত লাগলে আমাদের কিছুই করার থাকে না।
একটি নামকরা প্রতিষ্ঠান তাদের ভোক্তাদের কতটা কেয়ায় করে এবং কাস্টমার সেটিসফেকশন্ তাদের কাছে যে দেবতুল্য তা ভাববার মতো বিষয়। টুকটাক ভুলভ্রান্তি তাদের হতেই পারে, কিন্তু তারা সেটা সেটেল করার জন্য যে চেষ্টা করে তা অনুকরণীয়।
এবার বলি,আমাদের পাবলিক সেক্টরের সার্ভিসের মান নিয়ে কথা। বলা হয় আমরা জনগণের চাকর।অ্যাট লিস্ট সংবিধান তাই বলে। আমরা কি কখনও আমাদের যারা ক্লায়েন্ট,অর্থাৎ এদেশের আপামর জনতা, সে যেই হোক না কেন, তার কাস্টমার সেটিসফেকশ নুন্যতম কেয়ার করি?
যারা করেন তারা নিশ্চয়ই ধন্যবাদ-এর দাবিদার। কিন্তু যারা করেন না, অর্থাৎ তদবির না করলে মেওয়া জুটবে না, এরকম মনোভাব শো করেন,তাদের প্রতি আমার প্রশ্ন থেকেই গেল। একটি অফিসে সাপোর্ট সার্ভিস শাখা বা লজিস্টিকস্ শাখায় যদি কেউ তার ব্যবহৃত জিনিসটি মেরামত বা মতামতের জন্য দেয়,তাহলে লজিস্টিকস্ শাখার স্বয়ংক্রিয় কাজ হবে একটি নির্দিষ্ট সময় পরে তাকে ফিডব্যাক দেওযা, সেটা পজিটিভ বা নেগেটিভ দুটোই হতে পারে।
কিন্তু আমরা কী করি? ঘাপটি মেরে বসে থাকি, কে আগে গরজ দেখায়, দেখি না, আমার কি ঠ্যাকা পড়ছে, এটা আমার কাজ না, আরও কত কী!
হ্যা, ভাই/বোন,গরজটা আপনারই। আপনি তার সেবা দিতে প্রস্তুত হলে কিংবা তার জিনিসটির একটা কিছু উপায় হলে তাকে জানিয়ে দিন, বাকিটা না হয় তার উপর ছেড়ে দিলেন। নিজের বেলায় এটি ভাবুন, তিনি লজিস্টিকস্ আর আপনি কাস্টমার। এমপ্যাথি (সমানুভূতি) টেস্ট করুন। দেখবেন আপনিও তার কাছ থেকেই কলটি আশা করবেন।
এবার বলি, আক্রান্ত বা সাহায্যপ্রার্থী বা ভিকটিম ব্যক্তিদের কথা। আমরা কি তাদের যথাযথ লিসেনিং দেই? আমরা কি তার রেখে যাওয়া সমস্যার উপায় বের করে, উপযুক্ত সমাধান তার হাতে তুলে দেই? না, দেই না।
সেই সাথে আছে ব্যক্তিগত বা পজিশনগত অসততা। কিছুদিন আগে আমার আরেক সহকারীকে একটি বিষয়ে পরিস্থিতির শিকার হয়ে ক্ষমতাপ্রাপ্ত একজনের হাতে টাকা তুলে দিয়ে কাজ সেরে আসতে হয়েছে। খেয়াল করুন, এই টাকা কিন্তু রসিদ ছাড়া এবং ভীতিপ্রদর্শন পূর্বক সংগৃহীত, না সে মানি রিসিট পেল ,না সদাশয় সরকারের ঘরে টাকা গেল। অর্থাৎ,ওই যে দুর্নীতিবাজ ক্ষমতাপ্রাপ্ত অসৎ লোকটি, আমার কষ্টের টাকা গেল তার পকেটে।
এই লোকগুলোর আবার লাইফ স্টাইল এমন করে বেড়ায় যে, তাদের পরিবারের সদস্যরা বলে বেড়ায়, তীর ছাড়া আমার চলেই না (বিজ্ঞাপন) অর্থাৎ অপথে কুপথে কামাই রোজগার করে বলে বেড়াবে যে, সন্তান অমুক জায়গায় পড়ে, তমুক গাড়িতে চড়ে, ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলে, আমরা পেশাদারিত্ব চর্চায় খুব গরীব। হতদরিদ্র বলা যায়। সততা, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, নৈতিকতা এসবের বিপরীত শব্দগুলো আমাদেরকে যেন গ্রাস করে ফেলেছে।
আমার গল্পের মূল মেসেজ একটাই, আমরা যে যেখানেই কাজ করি না কেন, ভোক্তা কিন্তু সত্যিই আমাদের চরম শ্রদ্ধীয়। নিজের কাজ দিয়েই নিজেকে পেশাদার প্রমাণ করতে হবে, আর থাকতে হবে ভোক্তার সন্তুষ্টি পাবার আরাধনা।
চেষ্টা করুন, কমপক্ষে দুর্নীতি আপনাকে ছুঁয়ে যাবে না।
লেখক: কবি, গদ্যকার ও মোটিভেশনাল স্পিকার। অতিরিক্ত ডিআইজি হিসাবে সিআইডিতে কর্মরত।