বজলুর রহমান
পত্রিকার পাতা খুললেই এখন আর শুধু খবরের খবর থাকে না; থাকে কোনো না কোনো মা-বাবার কোল খালি হওয়ার মর্মান্তিক গল্প। কোনো তরুণ স্বপ্ন দেখার বয়সে মারা যাচ্ছে বেপরোয়া বাসের নিচে পিষ্ট হয়ে, কেউবা সহপাঠী কিংবা সমবয়সীদের হিংস্রতার শিকার হয়ে, আবার কেউবা শিকার হচ্ছে তথাকথিত 'গণপিটুনি' নামক সামাজিক মব জাস্টিসের। অতি সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া তিনটি পৃথক কিন্তু চরম উদ্বেগজনক ঘটনা আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা, মূল্যবোধ এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কঙ্কালসার রূপটিকে আবারও নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
প্রথম ঘটনাটি কুমিল্লার। গত ১৮ সেপ্টেম্বর (২০২৬) শুক্রবার বিকেল চারটা থেকে পাঁচটার মধ্যে অষ্টম শ্রেণির ১৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীমকে টিকটক ও ছবি তোলার প্রলোভন দেখিয়ে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলে ডেকে নিয়ে যায় তার পরিচিত তুহিনসহ কয়েকজন তরুণ। উদ্দেশ্য ছিল অপ্রতীমের মায়ের দামি আইফোনটি ছিনতাই করা। নির্জন বনে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বিকেল আনুমানিক সাড়ে পাঁচটার দিকে বাঁশের শক্ত লাঠি দিয়ে অপ্রতীমের মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং লাশ গুম করার চেষ্টা চালানো হয়। পরবর্তীতে ১৯ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে অভিযান চালিয়ে পুলিশ তুহিনের নিজ বাসা থেকে সেই আইফোনটি উদ্ধার করে এবং পাহাড়ের জঙ্গল থেকে শিশুটির লাশ উদ্ধার করা হয়। একটি যন্ত্র বা সামান্য বস্তুগত লোভের জন্য একজন কিশোরকে এভাবে খুন করতে পারে তার পরিচিতরা? এই চরম নির্মমতা আমাদের ভাবিয়ে তোলে। আমাদের কিশোরদের মূল্যবোধের চর্চা আজ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ফ্যান্টাসি, তথাকথিত 'কিশোর গ্যাং' সংস্কৃতি এবং তাৎক্ষণিক বস্তুগত তৃপ্তির উন্মাদনা আজ আমাদের কোমলমতি সন্তানদের ভেতরে কতটা হিংস্রতার বীজ বুনে দিচ্ছে, অপ্রতীমের হত্যাকাণ্ড তারই এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা।
দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে খুলনায়। গত ১৮ সেপ্টেম্বর (২০২৬) শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ৩০ মিনিটের দিকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর সংলগ্ন গল্লামারি এলাকার একটি ছাত্র মেসে নর্থ-ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির প্রথম বর্ষের ছাত্র মো. আজমুল হোসেনকে চুরির অপবাদ দিয়ে অমানুষিক নির্যাতন ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়। মেসের তৃতীয় ও চতুর্থ তলা এবং ছাদে নিয়ে চুরির অভিযোগে তাকে মারধর করা হয়, যার একপর্যায়ে আজমুল ছাদ থেকে নিচে পড়ে যান এবং রাতে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই যে সংস্কৃতি এবং তুচ্ছ কোনো অভিযোগে বিচার ছাড়াই মানুষকে হত্যা করার মানসিকতা তা কোনো সুস্থ ও সভ্য সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। কোনো অভিযোগ থাকলে অপরাধীকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়াই সভ্য আইনি নিয়ম। কিন্তু বারবার গণপিটুনি ও মব জাস্টিসের ঘটনা প্রমাণ করে যে, সমাজে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা দিন দিন ক্ষীণ হচ্ছে এবং মানুষের সহনশীলতার মাত্রা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। একজন উদীয়মান বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রকে সন্দেহের বশে পিটিয়ে মেরে ফেলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক আইনের শাসন ও সামাজিক অবক্ষয়ের এক করুণ প্রতিফলন
তৃতীয় মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে বরিশালের উজিরপুরে, গত ২৮ সেপ্টেম্বর (২০২৬) সোমবার সন্ধ্যা ৬ টার দিকে। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের আটিপাড়া এলাকায় ঢাকাগামী 'সুরভী পরিবহনের' একটি দ্রুতগতির যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মোটরসাইকেলে থাকা তাওহীদ, সৌরভ ও মুস্তাকিন এই তিন বন্ধু ও শিক্ষার্থী ঘটনাস্থলেই মারা যায়। তিনটি তাজা প্রাণ মুহূর্তেই পিষ্ট হয়ে গেল মহাসড়কের পিচঢালা রাস্তায়। একদিকে মহাসড়কে বাসের বেপরোয়া গতি ও ফিটনেসবিহীন ড্রাইভিং ব্যবস্থা, অন্যদিকে অনূর্ধ্ব-বয়সী কিশোরদের হাতে বেপরোয়া মোটরসাইকেল তুলে দেওয়ার পারিবারিক অসচেতনতা এই দুইয়ের প্রাণঘাতী সংমিশ্রণে অকালে ঝরে গেল তিনটি তাজা প্রাণ। মহাসড়ক গুলোকে আমরা কি শুধুই মৃত্যুর ফাঁদ বানিয়ে রাখব? পরিবহন খাতের বিশৃঙ্খলা ও নজরদারির অভাব আমাদের দেশের সড়ক গুলোকে প্রতিনিয়ত রক্তে রঞ্জিত করছে, অথচ এর কোনো স্থায়ী সমাধান দৃশ্যমান হচ্ছে না।
এই তিনটি ঘটনা প্রথম দর্শনে ভিন্ন মনে হলেও এদের অন্তর্নিহিত বার্তা একই: আমাদের তরুণ ও শিশু-কিশোরেরা আজ কোথাও নিরাপদ নয়। না মহাসড়কে, না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে, আর না নিজেদের পরিচিতদের চক্রে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ খোঁজা এখন আর বিলাসের বিষয় নয়, এটি সময়ের দাবি।
১. পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা: সন্তানদের শুধু দামি গ্যাজেট বা যানবাহন কিনে দিলেই অভিভাবকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তারা কার সাথে মেলামেশা করছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কী ধরনের কনটেন্ট গ্রহণ করছে এবং তাদের ভেতরে নৈতিকতার চর্চা হচ্ছে কি না তা গভীরভাবে তদারকি করতে হবে।
২. কিশোর গ্যাং ও অপরাধ দমন: কিশোর অপরাধ ও গ্যাং কালচার রোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কঠোর হতে হবে। অপরাধী কিশোর বা তরুণ হলেও বিচারে ছাড় দেওয়া যাবে না, তবে তাদের অপরাধ চক্র থেকে বের করে আনার জন্য সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থাও করতে হবে।
৩. আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা: গণপিটুনি ও মব জাস্টিসের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। আইন হাতে তুলে নেওয়া প্রতিটি অপরাধীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় এনে আইনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
৪. সড়ক নিরাপত্তায় কঠোরতা: বেপরোয়া ড্রাইভিং, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের যানবাহন চালানো বন্ধে ট্রাফিক পুলিশ ও মহাসড়ক কর্তৃপক্ষকে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।
আমরা কি প্রতিদিনই এভাবে পত্রিকার পাতায় নতুন কোনো অপ্রতীম, আজমুল বা তৌহিদদের অকালমৃত্যুর খবর পড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাত গুটিয়ে বসে থাকব? কোনো রাষ্ট্র বা সমাজ তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এভাবে অকালে ঝরে যেতে দেখতে পারে না। যদি এখনই আইন, সমাজ ও পরিবার এক হয়ে এই সংকট মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপে না নামে, তবে এই অবক্ষয়ের আগুন একদিন প্রতিটি ঘরেই পৌঁছাবে। আমাদের সন্তানদের বাঁচার মতো নিরাপদ সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদেরই।
লেখক: ব্যাংকার ও কলামিস্ট
*মতামত লেখকের নিজস্ব