ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
একটি মহীরুহ যেমন ঝড়-বৃষ্টি সহ্য করে দীর্ঘকাল ধরে ছায়া দিয়ে যায়, প্রবীণরা ঠিক তেমনি আমাদের জীবন ও সমাজের ছায়াবৃক্ষ। ১লা অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস’। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১ বিলিয়ন, যা ২০৫০ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে ২.১ বিলিয়নে পৌঁছাবে।
বাংলাদেশেও এই চিত্র স্পষ্ট; বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে প্রবীণের সংখ্যা দেড় কোটিরও বেশি, যা আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ সাড়ে চার কোটিতে গিয়ে ঠেকবে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে সত্য, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—আমাদের জীবনযাত্রার আধুনিকতা কি প্রবীণদের মানসিকভাবে বেঁচে থাকার উপযুক্ত পরিবেশ দিতে পারছে? জীর্ণ দেহের এই মানুষগুলো আজ প্রায়শই অবহেলা, একাকীত্ব আর ‘পরিবারের বোঝা’ হওয়ার গ্লানি নিয়ে দিন কাটান। অথচ সত্য হলো—তারা কোনো বোঝা নন, বরং জীবনের নানা ঝড়-ঝাপটা পার হয়ে আসা একেকটি অভিজ্ঞতার অমূল্য বাতিঘর।
এই বৃহৎ জনগোষ্ঠী দেশের কোনো বাড়তি আর্থিক বা সামাজিক ভার নয়, বরং এক বিশাল অমূল্য সম্পদ। একজন প্রবীণ ব্যক্তি তার কর্মজীবনে যেসব সংকট ও প্রতিকূলতা অতিক্রম করেছেন, তা কোনো বই বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেখাতে পারে না। পরিবার ও সমাজে কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের একটি দিকনির্দেশনামূলক পরামর্শ বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে পারে। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পারিবারিক মূল্যবোধের প্রধান ধারক ও বাহক তারাই।
বাস্তবতার কাঠগড়ায় প্রবীণ সমাজ
কিন্তু বাস্তব চিত্রটি সর্বদা সুখকর নয়। বাংলাদেশে যৌথ পরিবার প্রথা ভেঙে একক পরিবারের বিস্তার ঘটছে। জীবিকা ও উন্নত জীবনের খোঁজে তরুণ প্রজন্ম শহরমুখী বা বিদেশমুখী হওয়ায় প্রবীণরা চরম একাকীত্ব, মানসিক বিষণ্নতা ও অবহেলায় দিন কাটাচ্ছেন। এছাড়া বার্ধক্যজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা, চিকিৎসার উচ্চ ব্যয় এবং আর্থিক নিরাপত্তার অভাব তাদের জীবনকে দুর্বহ করে তোলে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশে ‘পিতা-মাতা ভরণ-পোষণ আইন’ প্রণয়ন করা হলেও সচেতনতার অভাবে এবং সামাজিক জটিলতায় বহু প্রবীণ আজও তাদের ন্যায্য অধিকার ও প্রাপ্ত সম্মান থেকে বঞ্চিত।
একটি প্রবীণবান্ধব এবং মানবিক সমাজ গঠনে করণীয়
১.সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন : প্রবীণদের করুণা নয়, তাদের প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পরিবার ও সমাজের প্রতিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
২.স্বাস্থ্য ও মানসিক সেবা : সরকারি হাসপাতালে প্রবীণদের জন্য পৃথক কাউন্টার ও চিকিৎসার সুব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি পরিবারে তাদের সঙ্গে সময় কাটানো ও মন খুলে কথা বলার পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।

৩.আর্থিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ: বয়স্ক ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি এবং তা যেন প্রকৃত প্রবীণদের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছায় তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণদের অভিজ্ঞতাকে পরামর্শক হিসেবে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করা।
৪.আইনের কঠোর প্রয়োগ: ‘পিতা-মাতা ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’-এর বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং এর সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
৫. ধর্মীয় অনুশাসন যথাযথভাবে মেনে চলা : পৃথিবীতে বিদ্যমান সকল ধর্মই পিতা-মাতা সহ সকল প্রবীনদেরকে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দেয়ার কথা বলে থাকে। বিশেষ করে আল কোরআনে পিতা-মাতার সম্মান এবং মর্যাদার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর হওয়ার ব্যাপারে মহানবী হযরত সাঃ পরামর্শ দিয়েছেন ও মহান আল্লাহ তায়ালা কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। এজন্য জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে নিজ নিজ ধর্মীয় অনুশাসন অনুযায়ী পিতা-মাতা ও প্রবীনদেরকে যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান দেয়া প্রয়োজন।
আজকের তরুণ কিংবা মধ্যবয়সী ব্যক্তিটি প্রবীণদের প্রতি যে আচরণ করছেন, তাকে মনে রাখতে হবে—আগামীকালের বার্ধক্য তার জন্যও অপেক্ষা করছে। প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা ও দায়িত্বশীলতা দেখানো কোনো দয়া নয়, এটি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি দৃষ্টান্ত।
আরও পড়ুন-
৭২ এর সাংবিধানিক গণতন্ত্র ও জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা
বার্ধক্য কোনো রোগ বা অপরাধ নয়, এটি মানবজীবনের এক অনিবার্য ও স্বাভাবিক নিয়তি। আজকের যে তরুণ বা প্রৌঢ় ব্যক্তিটি প্রবীণদের অবহেলা করছেন, সময় চক্রে কাল সকালে বার্ধক্য কিন্তু তার দুয়ারেও কড়া নাড়বে—এই পরম সত্যটি ভুলে গেলে চলবে না। ২০১৩ সালে আমাদের দেশে ‘পিতা-মাতা ভরণ-পোষণ আইন’ পাস হলেও কেবল আইনের শক্তিতে প্রবীণদের মুখে হাসি ফোটানো সম্ভব নয়; তার জন্য প্রয়োজন পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন। প্রবীণদের প্রজ্ঞা ও তরুণদের কর্মশক্তির সুন্দর মেলবন্ধনই পারে একটি জাতিকে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিতে। আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—অভিজ্ঞতার এই বাতিঘরগুলোকে আমরা একাকীত্বের আঁধারে তলিয়ে যেতে দেব না। তাদের জীবন-সায়াহ্নকে ভরিয়ে তুলব পরম শ্রদ্ধা, স্নেহ, সুরক্ষা ও ভালোবাসার মিষ্টি আলোয়।
লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা