ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
বামপাশে লেখক ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন, ডানপাশে নিহত ১৩ বছরের কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের প্রতিকৃতি। ছবি: সংগৃহীত
কৈশোর শব্দটির সাথে যুক্ত থাকে রঙিন স্বপ্ন, কৌতূহল, অফুরন্ত প্রাণচাঞ্চল্য এবং আগামীর সম্ভাবনার আলো। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে ‘কৈশোর’ শব্দটির সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে এক নতুন আতঙ্ক—‘কিশোর গ্যাং’। গলির মুখ থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভার্চুয়াল জগত পর্যন্ত এই গ্যাং কালচারের যে বিষাক্ত থাবা বিস্তৃতি লাভ করেছে, তা আজ সমাজদেহে এক সামাজিক ম্যালিগন্যান্ট টিউমারের রূপ নিয়েছে।
সম্প্রতি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ও সংলগ্ন এলাকায় ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সমাজকে নতুন করে নাড়িয়ে দিয়েছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের সন্তান অপ্রতিমের নৃশংস হত্যাকাণ্ড কেবল একটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, বরং এটি আমাদের মুখের ওপর কড়া এক সামাজিক বাস্তবতা ও সতর্কবার্তা ছুড়ে দিয়েছে। অপ্রতিমের এই চলে যাওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি মূলত দিন দিন বেপরোয়া হয়ে ওঠা কিশোর অপরাধ ও গ্যাং কালচারের এক করুণ ও রক্তঝরা পরিণতি।
অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড : আমাদের বিবেকের অসহায় আর্তনাদ
একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের সন্তানের নিরাপদ প্রাঙ্গণেই যদি সুরক্ষা না থাকে, তবে সাধারণ নাগরিকের সন্তানরা কতটা নিরাপদ? অপ্রতিম হত্যার নির্মমতা আমাদের আবারো মনে করিয়ে দেয়, কিশোর অপরাধীরা আজ কতটা দুর্ধর্ষ, দুঃসাহসী ও সহানুভূতিহীন হয়ে উঠেছে। তুচ্ছ ঘটনা, ব্যক্তিগত শত্রুতা, প্রভাব বিস্তার কিংবা আধিপত্য জাহিরের মতো অকিঞ্চিৎকর কারণে আজ সহপাঠী বা সমবয়সীদের প্রাণ কেড়ে নিতে তারা দ্বিধা করছে না।
যে বয়সে হাতে বই, খেলার মাঠ বা নতুন কোনো সৃষ্টির আনন্দ থাকার কথা, সেই বয়সে কিছু কিশোরের হাতে উঠছে ধারালো অস্ত্র, দেশীয় চকচকে চাপাতি কিংবা মাদক। অপ্রতিমের পরিবার আজ যে শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, সেই ক্ষতি কোনো বিচারের বিনিময়েই পুরণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অপ্রতিমদের কেন বলির পাঁঠা হতে হবে? আমরা কি কেবল বিচার চেয়ে এবং পত্রিকায় কলাম লিখেই দায়িত্ব শেষ করবো, নাকি সমস্যার গভীরে গিয়ে দেখবো সমস্যার কোন প্রকৃত সমাধান আছে কিনা !
সামাজিক ও পারিবারিক ব্যবস্থার অবক্ষয় : যেখানে শিকড়ে ঘুণ ধরেছে
কৈশোর হলো জীবন গড়ার ও আদর্শ তৈরির সময়। অথচ আজকের বাংলাদেশের কিশোররা চারপাশের সামাজিক অবকাঠামো থেকে সেই সুরক্ষা ও যথার্থ দিকনির্দেশনা পাচ্ছে না। এর গুরুত্বপূর্ণ তিনটি কারণ-
১. পরিবারের নিয়ন্ত্রণহীনতা ও যোগাযোগের অভাব :
একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে একক পরিবার গঠনের ফলে সন্তানদের ওপর পারিবারিক নজরদারি কমেছে। বাবা-মা দুজনেই কর্মব্যস্ত থাকায় সন্তানদের সময় দিতে পারছেন না। ফলে কিশোর-কিশোরীরা মানসিক একাকীত্বে ভুগছে। এই শূন্যতা পূরণে তারা বাইরে এমন সমবয়সী দল বা ‘গ্যাং’ খুঁজছে, যেখানে তারা নিজেদের একটি কৃত্রিম ‘পাওয়ার’ বা গ্রহণযোগ্যতা পায়।
২. সামাজিক সুরক্ষা বলয় বিনষ্ট ও বিনোদনের সংকট :
একসময় পাড়ায় খেলাধুলার মাঠ ছিল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল (যেমন: স্কাউট, লাইব্রেরি, কিশোর ক্লাব)। এখন মাঠ দখল হয়ে গেছে, ক্লাবগুলো বিলুপ্ত। কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম নেই। সুস্থ বিনোদনের অভাব তাদের ঠেলে দিচ্ছে ভয়াবহ গ্যাং কালচারের দিকে।
৩. ডিজিটাল ডিভাইসের অপব্যবহার ও সাইবার ফ্যান্টাসি :
স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা কিশোরদের আচরণে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। ভায়োলেন্ট গেমস, সোশ্যাল মিডিয়ায় গ্যাং কালচারের গ্ল্যামারাইজেশন এবং টিকটক-লাইকির মতো প্ল্যাটফর্মে ‘হিরোইজম’ দেখানোর প্রবণতা তাদের অপরাধে উৎসাহিত করছে। অপরাধকে তারা এখন আর অন্যায় মনে করে না; বরং নিজেদের ‘র্যাঙ্ক’ বাড়ানোর উপায় ভাবছে।
রাষ্ট্রযন্ত্রের ভূমিকা : প্রশ্রয়, রাজনৈতিক ব্যবহার ও বিচারহীনতা
সামাজিক অবক্ষয় যদি অপরাধের জমিন তৈরি করে, তবে রাষ্ট্রযন্ত্রের শিথিলতা ও রাজনৈতিক সুবিধাভোগীরা তাকে বিভিন্নভাবে প্রশ্রয় দিয়ে বড় করে তোলে। যেমন-
১. রাজনৈতিক বড় ভাই সংস্কৃতি:
কিশোর গ্যাং রাতারাতি কোনো অদৃশ্য শক্তি থেকে গজিয়ে ওঠে না ! এর পেছনে কাজ করে তথাকথিত ‘রাজনৈতিক বড় ভাই’দের আসকারা। নিজস্ব বলয় ভারী করা, মিছিলে লোক বাড়ানো, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সাইজ করা এবং পাড়া-মহল্লায় দখলদারি বজায় রাখার জন্য কিশোরদের ব্যবহার করা হয়। এই ‘বড় ভাই’দের ছত্রছায়াতেই তারা গ্যাং গড়ে তোলে এবং ক্ষমতার আশ্রয় পেয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
২. আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ও আইনি দুর্বলতা:
অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় থানা বা পুলিশ কর্মকর্তা কিশোর গ্যাংয়ের উপস্থিতির কথা জেনেও কোনো ব্যবস্থা নেন না বা রাজনৈতিক প্রভাবে ব্যবস্থা নিতে পারেন না। তাছাড়া, আমাদের দেশের ‘শিশু আইন, ২০১৩’ এবং শিশু আদালত ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য লঘুদণ্ড ও সংশোধন। কিন্তু গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধীরা বয়সের সুবাদে (১৮ বছরের নিচে) আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে সহজে পার পেয়ে যাচ্ছে, যা নতুন অপরাধীদের উৎসাহিত করছে।
৩. সংশোধনাগারের অপ্রতুলতা ও করুণ চিত্র :
আমাদের কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রগুলো শিশুদের অপরাধ থেকে ফিরিয়ে আনার বদলে উল্টো ‘অপরাধের বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে কাজ করে। সেখানে পর্যাপ্ত স্থান নেই, সঠিক কাউন্সেলিংয়ের অভাব এবং তারা প্রবীণ অপরাধীদের সঙ্গে থাকার কারণে সাধারণ অপরাধে আটক কিশোররাও আরও বড় অপরাধী হয়ে বেরিয়ে আসছে।
সামাজিক অবক্ষয় ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতায় সমন্বিত সংকট
কিশোর গ্যাংয়ের এই ভয়াবহ বিস্তার কোনো একক কারণে ঘটেনি। একে বলা যায় সামাজিক অবক্ষয় এবং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার এক বিষাক্ত মেলবন্ধন।
সামাজিক দিক থেকে পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে কিশোরদের সঠিক মূল্যবোধ দিতে, তাদের একাকীত্ব দূর করতে এবং বিনোদনের পরিবেশ তৈরি করতে।
অন্যদিকে, রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে আইন ও বিচারব্যবস্থার সঠিক প্রয়োগে, রাজনৈতিক ক্যাডার হিসেবে কিশোরদের ব্যবহার বন্ধে এবং সুস্থ সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে।
অতএব, দায়টি কেবল সামাজিক নয়, কিংবা কেবল রাষ্ট্রেরও নয়; বরং রাষ্ট্র যখন তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তখন সামাজিক প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। আবার সমাজ যখন নিশ্চুপ থাকে, রাষ্ট্র তখন অপরাধীদের আড়াল করার সুযোগ পায়।
কিশোর গ্যাং এর অপরাধ প্রবণতার প্রতিবেদন :
বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং (Teen/Juvenile Gangs) সংক্রান্ত অপরাধের বিভিন্ন সরকারি প্রতিবেদন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা (ডিএমপি, র্যাব) ও গবেষণার পরিসংখ্যানসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. গ্যাংয়ের সংখ্যা ও সদস্য :
সারাদেশে বিস্তার : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশে বর্তমানে ২০০টির বেশি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। কেবল রাজধানী ঢাকাতেই গ্যাংয়ের সংখ্যা ১০০ থেকে ১২৭টি।
সদস্য সংখ্যা : ঢাকায় গ্যাং সদস্যের সংখ্যা এলাকাভেদে ৩,০০০ থেকে ৮,০০০ জনের বেশি বলে ধারণা করা হয়।
বয়সসীমা : প্রধানত ১৪ থেকে ২১ বছর বয়সী কিশোর ও তরুণেরা এসব গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।
২. অপরাধের ধরণ ও পরিসংখ্যান :
মারাত্মক অপরাধ : কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে থাকা কিশোরদের তথ্যানুসারে,প্রায় ২০% কিশোর হত্যাকাণ্ডের মামলায় অভিযুক্ত। প্রায় ২৪% কিশোর নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত অপরাধে অভিযুক্ত।
সাধারণ অপরাধসমূহ : এলাকাভিত্তিক প্রভাব বিস্তার, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘাত, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ইভটিজিং এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্যাং হুমকি দেওয়া।
কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে কেবল পুলিশি অভিযান বা ঢালাও গ্রেপ্তার কোনো স্থায়ী সমাধান আনবে না। প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদী ও সমন্বিত কৌশল, যেমন-
১.জিরো টলারেন্স নীতি ও রাজনৈতিক বড় ভাইদের দমন : কিশোরদের পেছনের আসল কারিগর বা তথাকথিত ‘বড় ভাই’দের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি আওতায় আনতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে স্পষ্ট অঙ্গীকার করতে হবে যে তারা কোনো কিশোরকে ক্যাডার হিসেবে ব্যবহার করবে না।
আরও পড়ুন-
৭২ এর সাংবিধানিক গণতন্ত্র ও জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা
২.পারিবারিক সচেতনতা ও কাউন্সেলিং :
প্রতিটি পরিবারে সন্তানের আচরণ ও সঙ্গীদের নিয়ে যথাযথ ও প্রয়োজনীয় নজরদারি বাড়াতে হবে। স্কুল ও কলেজে নিয়মিত 'প্যারেন্টিং কাউন্সিলিং' এবং শিক্ষার্থীদের জন্য মনস্তাত্ত্বিক সহায়তার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৩.কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের আধুনিকায়ন :
কিশোর অপরাধীদের জেলখানায় না পাঠিয়ে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে রেখে প্রকৃত অর্থে সংশোধন করতে হবে। সেখানে বৃত্তিমূলক শিক্ষা, নৈতিক শিক্ষা এবং কাউন্সেলিং জোরদার করতে হবে।
৪.সুস্থ বিনোদন ও খেলার মাঠ পুনঃরুদ্ধার :
পাড়ায় পাড়ায় খেলার মাঠ উন্মুক্ত করা, পাঠাগার ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে সক্রিয় করতে হবে, যাতে তরুণ প্রজন্ম ইতিবাচক কাজে তাদের শক্তি ব্যবহার করতে পারে।
৫.সাইবার মনিটরিং :
সোশ্যাল মিডিয়া ও সাইবার স্পেসে কিশোর গ্যাংয়ের গ্যাং-ওয়ার সংক্রান্ত পোস্ট, গ্রুপ ও কনটেন্ট নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে এবং যথাযথ দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
উপসংহার - কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সন্তান অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড আমাদের জন্য কেবল শোকের বিষয় নয়, এটি জাতির জন্য একটি চরম সতর্কবার্তা। আজকের যেসব কিশোর অপরাধের পথ বেছে নিচ্ছে, তারাও মূলত এই সমাজেরই সৃষ্টি। আমরা যদি সময় থাকতে আমাদের পারিবারিক ব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক ন্যায়বিচার পুনরুদ্ধার না করতে পারি, তবে আরও বহু অপ্রতিমকে এভাবে অকালে প্রাণ দিতে হবে।
আমরা কি একজন অপ্রতিমের মৃত্যুতে কিছুদিন শোক প্রকাশ করে আবার সব ভুলে যাব, নাকি এই ঘটনার ওপর দাঁড়িয়ে গ্যাং কালচারের শিকড় উপড়ে ফেলার দৃঢ় অঙ্গীকার করব? সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজের অভিভাবকরা যদি এখনই কঠোর ও সঠিক পদক্ষেপ না নেন, তবে কাল হয়তো অন্য কারো অথবা আপনার নিজের সন্তানের জন্য একই ভয়াবহ পরিণতি চোখের সামনে দেখার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে।
লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা
*মতামত লেখকের নিজস্ব