Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

❒ ট্রাইব্যুনালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের গুমজীবন

৬১ দিন বন্দিশালায়, তারপর শিলং

ধ্রুব ডেস্ক ধ্রুব ডেস্ক
প্রকাশ : রবিবার, ৩০ আগস্ট,২০২৬, ০১:৩৭ পিএম
৬১ দিন বন্দিশালায়, তারপর শিলং

২০১৫ সালের ১১ মে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের রাজধানী শিলংয়ে পাওয়া যায় সালাহউদ্দিন আহমদকে। পুলিশ তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে। সে সময় এই ছবি প্রকাশিত হয় ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে। ছবি: সংগৃহীত

বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদকে ঢাকা থেকে তুলে নেওয়ার পর ৬১ দিন র‍্যাবের টিএফআই সেলের মত একটি গোপন বন্দিশালায় আটকে রাখা এবং পরে ভারতের শিলংয়ে নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার তথ্য ভারতে তার বিরুদ্ধে করা মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণেও উঠে এসেছে বলে দাবি করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম।

তার ভাষ্য, সালাহউদ্দিন যে স্বেচ্ছায় ভারতে যাননি, বরং তাকে বাংলাদেশ থেকে অপহরণ করে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, ভারতে তার বিরুদ্ধে করা ফরেনার্স অ্যাক্টের মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যেও তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।

আমিনুল ইসলাম বলেন, সালাহউদ্দিনের গুমের অভিযোগের তদন্তে ভারতের ওই মামলার নথি, সাক্ষীদের জবানবন্দি, জেরা ও রায়ের কপি সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করতে গিয়ে এসব তথ্য মিলেছে।

“ভারতীয় পুলিশের সাক্ষ্য এবং উনার (সালাউদ্দিন) পক্ষের সাক্ষ্য, অর্থাৎ উভয় সাক্ষ্যতেই প্রমাণিত হয়েছে যে তিনি সেখানে স্বেচ্ছায় যান নাই, বরং তাকে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অপহরণ করে ওই দেশে নিয়ে তাকে ছেড়ে দিয়েছে।”

কী ঘটেছিল?

২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাতে সরকারবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে নিখোঁজ হন বিএনপির তৎকালীন যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমদ।

তার স্ত্রী হাসিনা আহমেদ এবং বিএনপির পক্ষ থেকে তখন অভিযোগ করা হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে সাদা পোশাকের লোকজন তাকে তুলে নিয়ে গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে সেই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছিল।

১১ বছর আগের সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ করে সালাহউদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, “উত্তরার একটি বাসা থেকে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে সাদা পোশাকে অস্ত্রধারীরা তুলে নিয়ে যায়…কালো কাপড়ে চোখ বেঁধে ফেলে, হাত বেঁধে ফেলে। তারপরের ঘটনাগুলো আরও ভয়ংকর।”

তিনি বলেছিলেন, “আমাকে রেখেছিল পাঁচ ফিটের একটি কুঠরিতে। ৬১ দিন। এই ৬১টি দিন কখন রাত, কখন দিন— কিছুই আমি জানতে পারিনি।”

তার ভাষ্য, বন্দিশালার দরজার নিচ দিয়ে খাবার দেওয়া হত এবং তাকে প্রায় কখনোই কক্ষের বাইরে নেওয়া হয়নি।

সালাহউদ্দিন আরও বলেছিলেন, “এখন যে আয়নাঘরের বর্ণনা গণমাধ্যমে বেরিয়ে আসছে, আমার সেই বন্দিজীবন তার চেয়ে কঠিন অবস্থার।”

ভারতের পুলিশের হাতে বন্দি হওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেছিলেন, “যে দিন আমাকে আয়নাঘর থেকে বের করে নিয়ে গেল, সেদিন দীর্ঘ একটা যাত্রা। চোখ বেঁধে, হাত বেঁধে…তারপর শিলংয়ের একটি জায়গায়, এটাকে গলফ মাঠ বলা হয়। সেখানে আমাকে ছেড়ে দিয়ে বলা হয়, ‘ইউ আর ফ্রি নাও’।

২০১৫ সালের ১১ মে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের রাজধানী শিলংয়ে সালাহউদ্দিনকে পাওয়া যায়। স্থানীয় লোকজন তাকে দেখে পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়।

ভারতীয় আদালতের নথি থেকে পাওয়া তথ্যের বরাতে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, "শিলংয়ে উদ্ধারের সময় সালাহউদ্দিন ট্রমাটাইজড অবস্থায় ছিলেন। ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট চাওয়া হলে সালাহউদ্দিন পুলিশকে জানান, তিনি কীভাবে ভারতে এসেছেন তা জানেন না। তাকে বাংলাদেশে অপহরণ করা হয়েছিল।"

বৈধ ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট না থাকায় পরে সালাহউদ্দিনের বিরুদ্ধে ভারতের ফরেনার্স অ্যাক্টের ১৪ ধারায় মামলা করে মেঘালয় পুলিশ।

ভারতের আদালতে বিচারে যা হয়েছিল

শিলংয়ে ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন মেঘালয় পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর পি. লামারে। ২০১৫ সালের ৩ জুন তিনি অভিযোগপত্র দেন।

সেখানে বলা হয়, বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিনের আকস্মিকভাবে ভারতে চলে আসার ঘটনাটি ছিল ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’।

বাংলাদেশে একাধিক মামলার ‘বিচার এড়াতেই’ তিনি ভারতে এসেছিলেন বলে অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়।

২২ জুলাই চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কে এম এল নংব্রির আদালতে অভিযোগ গঠন করা হয়। পরে ফার্স্ট ক্লাস জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ডি জি খারশিয়িংয়ের আদালতে মামলার বিচার চলে।

সালাহউদ্দিনের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন এস পি মহন্ত ও অনিল আগরওয়াল। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন পাবলিক প্রসিকিউটর আই সি ঝা।

বিচার চলাকালে সালাহউদ্দিন নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তিনি বলেন, তাকে ‘জোর করে’ ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

আমিনুল ইসলামের ভাষ্য, পুলিশের তদন্তের পর অভিযোগপত্র দেওয়া হলেও বিচারপর্বে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যে সালাহউদ্দিনের বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, “মজার ব্যাপার হইল যে পুলিশের দায়েরকৃত যে মামলা, অর্থাৎ প্রসিকিউশন কেসেও এই জিনিসটা প্রমাণিত হয় এবং আসামিপক্ষের সাফাই সাক্ষীতেও প্রমাণিত হয়।”

সালাহউদ্দিন ‘ট্রমাটাইজড’ ছিলেন এবং তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল—এমন তথ্য রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যেও পাওয়ার কথা বলেন প্রধান কৌঁসুলি।

তিনি বলেন, “সেখানে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীও ডিফেন্সের, অর্থাৎ আসামিপক্ষের বক্তব্য কিছুটা সমর্থন করে বক্তব্য দেয়।”

সালাহউদ্দিন নিজেও আদালতে জবানবন্দি দেন। কীভাবে তাকে ‘অপহরণ’ করা হয়েছিল, বাংলাদেশে কোথায় ও কতদিন রাখা হয়েছিল এবং পরে কীভাবে ভারতে নিয়ে শিলংয়ে ফেলে রাখা হয়—এসব বিবরণ সেখানে উঠে আসে বলে জানান আমিনুল ইসলাম।

খালাসের রায়, আপিলেও বহাল

দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ২০১৮ সালের ২৬ অক্টোবর শিলংয়ের আদালত ফরেনার্স অ্যাক্টের মামলায় সালাহউদ্দিন আহমদকে খালাস দেয়।

আমিনুল ইসলাম বলেন, “ভারতীয় কোর্ট সালাহউদ্দিন সাহেবের অপহরণ করে শিলংয়ে ফেলে রাখার বক্তব্যটা গ্রহণ করে এবং পাশাপাশি অন্যান্য সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে কোর্ট এটা নিশ্চিত হন যে তিনি অপহৃত হয়েছিলেন এবং তাকে মেঘালয়ের শিলংয়ে ফেলে রেখে আসা হয়। পরে তাকে খালাস দেয়।"

এরপর ভারত সরকার ওই খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শিলংয়ের জেলা ও দায়রা জজ আদালত ওই আপিল নিষ্পত্তি করে নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখে। এর মধ্য দিয়ে এই মামলা থেকে চূড়ান্তভাবে অব্যাহতি পান সালাহউদ্দিন আহমদ।

আপিলের সঙ্গে বিগত সরকারের সংশ্লিষ্টতার দাবি

ভারতে সালাহউদ্দিনের বিরুদ্ধে চলা মামলার আপিলের সঙ্গে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে অভিযোগ করেন আমিনুল ইসলাম।

তার দাবি, নথিপত্রের প্রাথমিক পর্যালোচনায় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার ‘প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতার’ বিষয়টি উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ থেকে একজন বিএনপি নেতাকে অপহরণ করে দীর্ঘদিন টিএফআই সেলে আটকে রাখার পর অন্য দেশে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে দুই দেশের সরকারের মধ্যে কোনো ‘গোপন প্যাক্ট’ না থাকলে তা কীভাবে সম্ভব—সে প্রশ্ন তোলেন আমিনুল ইসলাম।

তিনি বলেন, “তৎকালীন সরকারপ্রধান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং র‍্যাবের যারা দায়িত্বশীল ব্যক্তি, যারা অপহরণ করেছে—তাদের এটা একটা মেটিকুলাস প্ল্যান অনুযায়ী হয়েছে এবং তারা একে অপরের কোলাবোরেশন করেই এই কাজটা করেছে।”

তাদের মধ্য থেকে অনেককে সালাহউদ্দিনের মামলায় আসামি করা হয়েছে জানিয়ে ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি বলেন, প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট অন্যদেরও মামলায় আসামি করা হবে।

দেশে ফিরে গুমের অভিযোগ

ভারতীয় আদালতে খালাস পাওয়ার পরও ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট ও সংশ্লিষ্ট আনুষ্ঠানিকতার কারণে সালাহউদ্দিনের দেশে ফিরতে দীর্ঘ সময় লাগে বলে জানান আমিনুল ইসলাম।

নিখোঁজ হওয়ার প্রায় নয় বছর পর ২০২৪ সালের ১১ অগাস্ট দেশে ফেরেন সালাহউদ্দিন। দেশে ফিরে নিজের গুমের ঘটনায় বিচার চেয়ে ২০২৫ সালের জুনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেন তিনি। এরপর ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা তদন্ত শুরু করে।

সেই তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে জানিয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, সাক্ষী ও ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করে গুমের ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে আরও তথ্য উদ্‌ঘাটনের চেষ্টা চলছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ প্রস্তুত করা হবে।

এ মামলায় সাবেক মেজর জেনরালে জিয়াউল আহসান ছাড়াও ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পুলিশের সাবেক দুই মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ ও এ কে এম শহীদুল হক, ডিএমপির সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া এবং এসবির সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলামসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের কৌঁসুলি এস এম তাসমিরুল ইসলাম বলেন, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বিষয়টি নিয়ে ০৩/২০২৬ নামে নতুন করে মিসকেস (বিবিধ মামলা) ওপেন হয়েছে। এ মামলায় জিয়াউল আহসানকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে বলে আশা করছি।”

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)