বিশেষ প্রতিবেদক
যশোরে সার ডিলার তালিকায় এখনো বহাল আছে সাবেক সংসদ সদস্য রনজিত কুমার রায়, সাবেক সংসদ সদস্য এনামুল হক বাবুল, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শাহ ফরিদ জাহাঙ্গীর, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মেহেদী মাসুদ চৌধুরীসহ অনেকেই। তালিকায় রয়েছেন ১৬ বছর আগে মারা যাওয়া এক বিএনপি নেতার নামও।
দেশের বিভিন্ন জেলায় যখন নতুন করে সার ডিলার নিয়োগ কার্যক্রম চলছে, তখন যশোরে ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগী ও বিতর্কিতদের বহাল রেখেই প্রক্রিয়া চালানো পতিত শেখ হাসিনার আমলে অবৈধ ক্ষমতাবলে ডিলারশিপ পাওয়া এই গোষ্ঠীটি নতুন করে বৈধতা পেতে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি তালিকায় স্থান পেয়েছে মারা যাওয়া ব্যক্তিরাও।
গত ২২ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ফ্যাসিস্ট সরকারের আওয়ামী আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত ডিলারদের বাদ দেওয়ার বিষয়ে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নেবে বলে জানানো হয়। পরবর্তীতে চিফ হুইপ জানান, বিগত আওয়ামী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া সব সার ডিলার বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এছাড়াও নয়া নীতিমালায় বিএডিসি এবং বিসিআইসি-র পৃথক ডিলার প্রথা বিলুপ্ত করে সমন্বিত ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, যেখানে এক ব্যক্তির একাধিক ডিলারশিপের সুযোগ নেই। অথচ যশোরে বর্তমানে ৩০৩ জন ডিলারের মধ্যে ৬১ জনের নামেই দুটি প্রতিষ্ঠানের ডিলারশিপ বহাল রাখা হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় গত ৯ আগস্ট নতুন নীতিমালা জারি করে ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখের মধ্যে পুনর্নিয়োগের আবেদন গ্রহণের সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। অন্যান্য জেলায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হলেও যশোর জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি আপাতত নতুন নিয়োগের দিকে না গিয়ে আগের তালিকায় রেখেই ফাইল মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।
তালিকা অনুযায়ী, চৌগাছার কারাবন্দী আওয়ামী লীগ নেতা মেহেদী মাসুদ চৌধুরী এবং বাঘারপাড়া-অভয়নগর আসনের রনজিত কুমার রায়, এনামুল হক বাবুল ও শাহ ফরিদ জাহাঙ্গীরের ডিলারশিপ এখনো বহাল রয়েছে। এদের মত অনেক আওয়ামী রীগ নেতা, ফূর্ব থেকে সুবিধাভোগীদের নাম বহাল রাখা হয়েছে।
বিএডিসি ও বিসিআইসি ডিলার তালিকায় বহাল থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন—যশোর সদরের মোবারক সরদার, নূর মোহাম্মদ, আব্দুল লতিফ সর্দার, জাহিদ হাসান, সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম; মোহাম্মদ কাওসার আলী, কামাল হোসেন খান, রেজাউল করিম, ফয়জুল ইসলাম; ফরিদা ইয়াসমিন, কাজী সামছুর রহমান, মিজানুর রহমান মুকুল; শাহ জালাল হোসেন, কামরুজ্জামান এবং প্রসীত কুমার সাহা, আবুল হোসেন, মনিরুজ্জামান ও গৌতম কুমার সাহাসহ ৬১ জন।
অন্যদিকে অভয়নগরে মেসার্স এস এম হারুন অর রশিদের মালিক ফরিদা ইয়াসমিন, সদর উপজেলার আরবপুর ইউনিয়নের কে এম শরিফুল ইসলাম (মৃত্যু: ৩০ জানুয়ারি ২০২৫) এবং ২০১০ সালে মারা যাওয়া এক ব্যক্তির নাম ডিলার তালিকায় বহাল রাখা হয়েছে। বসুন্দিয়ায় একই পরিবারের তিনজনের নামে ডিলারশিপ রয়েছে, যার মধ্যে একজন মৃত ব্যক্তিও রয়েছেন। যশোর বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা যিনি ১৬ বছর আগে মারা গেছেন তার নাম মণিরামপুর উপজেলার একটি ইউনিয়নে রাখা হয়েছে।
যশোরের মনিরামপুর উপজেলার ঝাঁপা গ্রামের কৃষক আবদুল মান্নান ও খলিলুর রহমান বলেন, বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী আমাদের এক গ্রামের তিনটি ওয়ার্ডের জন্য একজন ডিলার নিয়োগ দেওয়ার কথা। আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম অভয়নগর উপজেলার সার শাহ ফরিদ জাহাঙ্গীরকে ডিলার হিসেবে দেয়া হয়েছে। তিনি এলাকায় আছেন না পালিয়ে গেছেন তা আমরা জানিনা। এত জানিননা সময়মত সার পাব কিনা।
এ বিষয় যশোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর অতিরিক্ত উপপরিচালক আবুল হোসেন সংবাদ মাধ্যমকে জানান, এই মুহূর্তে যশোরে কোন নতুন করে ডিলার নিয়োগ হচ্ছে না। নতুন নীতিমালায় যে কয়েকজন ডিলার প্রয়োজন সে কয়েকজন বর্তমানে রয়েছে। নতুন নীতিমালায় এক পরিবারের একাধিক ব্যক্তি ডিলার হওয়ার সুযোগ নেই। আমরা ফাইল মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। যাদের নাম দুই তালিকায় আছে মন্ত্রনালয় থেকে হয়তো তারা বাদ পড়বেন।
নতুন নীতিমালার আলোকে যশোর জেলা নতুন করে ডিলার নিয়োহ হচ্ছে কি না? এমন প্রশ্নে জেলা প্রশাসক ও জেলা সার বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আশেক হাসান গণমাধ্যমে বলেন বলেন,এই মুহুর্তে আমরা নিয়োগ প্রক্রিয়ার দিকে যাচ্ছি না। নতুন নীতিমালার আলোকে আমরা একটি পর্যালোচনা সভা করেছি। এই নীতিমালায় আমাদের কাছে কিছু অস্পষ্ট পরিলক্ষিত হয়েছে। আমরা সেগুলো মন্ত্রণলয়ে পাঠিয়েছি, সেখান থেকে স্পষ্ট আকারে আমাদের আসলে আমরা সেই অনুযায়ী ডিলার নিয়োগ কার্যক্রমের দিকে যাবো। শুধু যশোর না, পাশের অনেক জেলাও ডিলার নিয়োগ কার্যক্রমের দিকে যায়নি।