ধ্রুব ডেস্ক
যশোর-ঝিনাইদহ সড়কের মডেল ছবি: সংগৃহীত
প্রকল্প বাস্তবায়নে চরম ধীরগতি, জমি অধিগ্রহণে বছরের পর বছর বিলম্ব এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার অভাবে কার্যত ভেস্তে যেতে বসেছে বহুল আলোচিত যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প। পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর এই প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের বরাদ্দ করা মোট ঋণের প্রায় ৬৭ শতাংশই বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। বাতিলকৃত এই অর্থের পরিমাণ ৩৩৫.৩৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৪ হাজার ১২৪ কোটি টাকা। ফলে দেশের পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির গতি ফেরাতে নেওয়া বড় এই অবকাঠামো বিনির্মাণ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
পদ্মা সেতু প্রকল্প কেন্দ্রিক টানা এক দশকের জটিলতা কাটিয়ে ২০২০ সালে দেশের সড়ক খাতে ফের বড় বিনিয়োগ নিয়ে এসেছিল বিশ্বব্যাংক। ‘ওয়েস্টার্ন ইকনোমিক করিডর অ্যান্ড রিজিয়নাল এনহান্সমেন্ট প্রোগ্রাম’ বা উইকেয়ার শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় যশোর-ঝিনাইদহ করিডরসহ আঞ্চলিক সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে ৫০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ অনুমোদন দেয় সংস্থাটি। ৭৫৮.২০ মিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল যশোর থেকে ঝিনাইদহ পর্যন্ত ৪৮ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ককে ধীরগতির যানবাহনের আলাদা লেনসহ আধুনিক চার লেনে রূপান্তর করা। পাশাপাশি ৬১১ কিলোমিটার গ্রামীণ সংযোগ সড়ক উন্নয়ন, ৩২টি বাজার ও পণ্য পরিবহনকেন্দ্র তৈরি এবং আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থার অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। তবে অনুমোদনের পর ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও বিশ্বব্যাংকের ছাড় করা অর্থের পরিমাণ ছিল মাত্র ১১৬ মিলিয়ন ডলার, যা প্রকল্প বাস্তবায়নে চরম দীর্ঘসূত্রতারই প্রমাণ দেয়।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রকল্প শুরুর আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিতে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। বিশেষ করে নতুন করে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা এবং সামাজিক পুনর্বাসন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতেই প্রায় দুই বছর পার হয়ে যায়। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া তড়িঘড়ি উদ্যোগ নেওয়ায় শুরুতেই বড় জটে পড়ে পুরো কাজ। জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে অতিরিক্ত সময় লাগার পাশাপাশি বাস্তবায়নে জড়িত সংস্থাসমূহের সক্ষমতার ঘাটতিও প্রকট হয়ে ওঠে। এর মধ্যে মহাসড়ক অংশের কাজের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সংকট ও মাঠে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবল না থাকা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। যৌথ উদ্যোগের কাজ করা প্রতিষ্ঠান আবদুল মোনেম লিমিটেড নির্ধারিত সময়ে কাজ এগোতে না পারায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে নোটিশও দেওয়া হয়। এর সঙ্গে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রকল্প পরিচালক ও ব্যবস্থাপনায় বারবার পরিবর্তন আসায় সমন্বয়হীনতা চূড়ান্ত রূপ নেয়।
অর্থ বাতিলের কারণে প্রকল্পের মূল সড়ক ও গ্রামীণ অবকাঠামোর বড় অংশই এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। দুই দফায় এই অর্থ বাতিল করে বিশ্বব্যাংক—২০২৫ সালের মে মাসে ৫০ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২৬ সালের মে মাসে ২৮৫.৩৩ মিলিয়ন ডলার। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের জন্য নির্ধারিত ৩১৪.২০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের মধ্যে ২৬৬.৩৩ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৮৫ শতাংশ অর্থই বাতিল হয়ে গেছে। ফলে মহাসড়কের মূল অংশের কাজ এবং অপটিক্যাল ফাইবার বসানোর পরিকল্পনা শুরুই করা যায়নি। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের ১৭১ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ থেকে বাতিল করা হয়েছে ৬৯ মিলিয়ন ডলার, যা মোট বরাদ্দের প্রায় ৪০ শতাংশ। এর ফলে ৬১১ কিলোমিটার গ্রামীণ সংযোগ সড়ক উন্নয়নের মূল লক্ষ্য কমিয়ে এখন ৩৮৭ কিলোমিটারে নামিয়ে আনতে হয়েছে।
সার্বিক পারফরম্যান্স বিবেচনায় বিশ্বব্যাংক প্রকল্পটিকে ‘মধ্যম মাত্রায় অসন্তোষজনক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং প্রকল্পের মেয়াদের সময়সীমা ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর জন্য সরকারের করা আবেদনটি নাকচ করে দিয়েছে। ফলে পূর্বনির্ধারিত ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যেই প্রকল্পটির ঝুলন্ত রূপের ওপর ভিত্তি করে সমাপ্তি টানতে হচ্ছে। এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রধান কবির আহমেদ জানান, প্রস্তুতিহীনতা, কেনাকাটার জটিলতা, জমি অধিগ্রহণে দেরি এবং ঠিকাদারদের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণেই বিশ্বব্যাংক এই অর্থ প্রত্যাহার করেছে। তবে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেম জানিয়েছেন, সরকারের আবেদনের ভিত্তিতে বাতিল হওয়া এই অর্থ অন্য কোনো নতুন বা জরুরি প্রকল্পে ব্যবহার করার সুযোগ থাকবে। বর্তমানে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ প্রকল্পের বাকি কাজগুলোর দ্রুত ইতি টেনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্পটি গুটিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
সূত্র : কালেরকণ্ঠ