খাইরুল ইসলাম
খাইরুল ইসলাম ছবি: ধ্রুব নিউজ
বাংলাদেশের একমাত্র মানসিক হাসপাতালটি হেমায়েতপুর, পাবনায় অবস্থিত। ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত; বর্তমানে সরকারি তথ্য অনুযায়ী এখানে ৫০০টি শয্যা রয়েছে। গেল ২৬ আগস্ট পাবনা মানসিক হাসপাতালে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। হাসপাতালে প্রবেশের সময় ৫০০ টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু সেদিনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল টাকা দিয়ে কোনো সেবা নেওয়া নয়; বরং হাসপাতালের ভেতরে থাকা মানসিক রোগীদের কাছাকাছি গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলা এবং তাদের জীবনকে কিছুটা অনুভব করার সুযোগ। তাদের অনেকের পরনে ছিল মলিন পোশাক, কারও চেহারায় ছিল দীর্ঘদিনের অবহেলার ছাপ। কেউ নিজের মনে কথা বলছিলেন, কেউ অকারণে হাসছেন, আবার কেউ নীরব হয়ে বসে আছেন। প্রথম দেখায় হয়তো তাদের আচরণ আমাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়। কাছে গিয়ে কথা বলতেই মনে হলো—তারাও মানুষ, তাদেরও অনুভূতি আছে, কষ্ট আছে, ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার আছে।
কথা বলতে বলতে মনে হলো, সমাজের এই মানুষগুলোকে আমরা কত সহজেই ‘পাগল’ বলে দূরে সরিয়ে দিই। অথচ তারা কেউ ইচ্ছা করে এমন অবস্থায় আসেননি। অসুস্থতা, পারিবারিক অবহেলা, দারিদ্র্য কিংবা নানা প্রতিকূলতা তাদের জীবনকে এমন অবস্থায় নিয়ে এসেছে।
হাসপাতালের ভেতরে ঢোকার পর চারপাশের পরিবেশ গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে।
আমি তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললাম। তাদের প্রশ্ন আপনার বাড়ি কোথায়? তাদের কথার ভেতরে মাঝে মাঝে অসংলগ্নতা, হাসি, আবার কখনো এমন কিছু কথা—যা শুনে মনে হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের পেছনে রয়েছে একটি করে গল্প। কেউ হয়তো কোনো এক সময় একটি পরিবারকে নিয়ে স্বাভাবিক জীবন কাটিয়েছেন, কেউ ছিলেন কর্মজীবী, কেউ ছিলেন কারও প্রিয় সন্তান, স্বামী, বাবা কিংবা ভাই।
আমরা অনেক সময় কাউকে সহজেই ‘পাগল’ বলে ডেকে দূরে সরিয়ে দিই। কিন্তু সেদিন তাদের পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়েছে—তারা ‘পাগল’ নন, তারা মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষ। তাদের ভালোবাসা দরকার, সম্মান দরকার, চিকিৎসা দরকার এবং সবচেয়ে বেশি দরকার একজন মানুষ হিসেবে তাদের গ্রহণ করা।
আমরা সুস্থ শরীর ও স্বাভাবিক জীবন পেয়েও কত অভিযোগ করি, কত ছোটখাটো বিষয় নিয়ে হতাশ হই। অথচ সেখানে থাকা অনেক মানুষ হয়তো শুধু একটু আপনজনের স্নেহ কিংবা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগটুকুই চান।
মানসিক হাসপাতালে একজন রোগীর সঙ্গে কথা বলছিলাম। কথা বলতে বলতে তিনি আমাদের কাছে কিছু টাকা চাইলেন। আমরা বললাম, “টাকা দেওয়া নিষেধ।”
তখন তিনি খুব সরল অথচ গভীর একটি প্রশ্ন করলেন—
“আপনারা তো হাসপাতালে ঢোকার সময় ৫০০/১,০০০ টাকা দেন, সেটা নিষেধ না? আমরা টাকা চাইলে নিষেধ? আইন কি শুধু পাগলের বেলায়। কথাটা ভুইফোড় না, এর শেকড়-বাকড় আছে।
একজন মানসিক রোগী হয়তো তার অসুস্থতার কারণে কথাগুলো এলোমেলো বলে, কিন্তু তার প্রশ্নে সমাজের প্রতি একটি বড় প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। হাসপাতালের প্রবেশপথে দর্শনার্থীর কাছ থেকে যদি নির্দিষ্ট ফি নেওয়া হয়, তাহলে একজন অসহায় রোগী কারও কাছে দু-এক টাকা চাইলে সেটিই কেন অপরাধ ?
অবশ্যই হাসপাতালের নিয়ম-শৃঙ্খলা থাকতে হবে। রোগীদের নিরাপত্তা, চিকিৎসার পরিবেশ এবং হাসপাতালের নিয়ম মানা জরুরি। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে—মানসিক রোগীরাও মানুষ। তাদেরও অনুভূতি আছে, অভাব আছে, চাওয়া-পাওয়া আছে।
সবচেয়ে বড় কথা, আইন ও নিয়ম সবার জন্য সমান হওয়া উচিত।
হয়তো ওই রোগীর কথার মধ্যে যুক্তির চেয়ে অসুস্থতার ছাপ বেশি ছিল। কিন্তু তার একটি প্রশ্ন আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো—
“আপনাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া বৈধ, আর আমরা টাকা চাইলে নিষেধ—তাহলে আইন কি শুধু পাগলের ?”
সেদিন হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার সময় মনে হচ্ছিল, ৫০০ টাকা দিয়ে হাসপাতালে প্রবেশ করলেও আমি এমন কিছু শিক্ষা নিয়ে বের হয়েছি, যার মূল্য টাকায় পরিমাপ করা যায় না।
পাবনা মানসিক হাসপাতালের সেই মানুষগুলোর সঙ্গে কিছু সময়ের কথোপকথন আমাকে একটি বিষয় শিখিয়েছে—
মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মানসিক অবস্থা নয়, তার মানবিক অস্তিত্ব।
তাই মানসিক রোগীদের নিয়ে উপহাস নয়, অবহেলা নয়; তাদের প্রতি দরকার সহমর্মিতা, চিকিৎসা ও ভালোবাসা।
২৬ আগস্টের দিনটি হয়তো আমার জীবনের ক্যালেন্ডারে একটি সাধারণ দিন। কিন্তু পাবনা মানসিক হাসপাতালের সেই মানুষগুলোর সঙ্গে কাটানো সময়টি আমার মনে অনেকদিন বেঁচে থাকবে।
লেখক: ব্যাংকার