টিবিএস
ছবি: সংগৃহীত
নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিধি দ্রুত বাড়াতে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য দেশের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ খাত উন্মুক্ত করছে সরকার। এর মাধ্যমে আগামী এক বছরের মধ্যে ছাদভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে ৪,০০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
গত ১৯ আগস্ট বিদ্যুৎ বিভাগে অনুষ্ঠিত এক সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ বা ৫,৫০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের যে বৃহৎ পরিকল্পনা রয়েছে, এই উদ্যোগ তারই অংশ।
পরবর্তীতে ২৫ আগস্ট বেসরকারি সোলার কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আয়োজিত পৃথক এক সভায় ৪,০০০ মেগাওয়াটের এই লক্ষ্যমাত্রা কত দ্রুত অর্জন করা যায়, সে বিষয়ে খাতসংশ্লিষ্টদের কাছে মতামত ও পরামর্শ চেয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
উক্ত সভায় উপস্থিত একটি সোলার কোম্পানির জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা টিবিএসকে জানান, ব্যবসাটিকে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে প্রথম ছয় মাসের জন্য বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার আভাস দিয়েছে সরকার।
তিনি বলেন, "যারা আগামী ছয় মাসের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন সম্পন্ন করবেন, তারা উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরকারের কাছে লাভজনক মূল্যে বিক্রি করার সুযোগ পাবেন। এ বিষয়ে শিগগিরই পরিপত্র জারির মাধ্যমে বিস্তারিত নির্দেশিকা প্রকাশ করা হবে।"
প্রচলিত সরকারি অর্থায়নের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর মতো না হয়ে এই ছাদভিত্তিক কর্মসূচিটি পরিচালিত হবে ‘অপারেটিং এক্সপেন্ডিচার’ (ওপেক্স) মডেল বা পরিচালন ব্যয় মডেলের অধীনে। এর আওতায় বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনাগুলোতে নিজস্ব অর্থায়নে এই পদ্ধতি স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবেন, আর গ্রাহকরা উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন।
নতুন এই মডেলের অধীনে বাসা-বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পকারখানার জন্য সোলার প্যাকেজ তৈরি করতে বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে 'সার্ভিস প্রোভাইডার' বা সেবাদাতা হিসেবে তালিকাভুক্ত করবে সরকার।
এই মডেলের ফলে কারখানা, অফিস ও অন্যান্য ভবনের মালিকদের নিজস্ব মূলধন বিনিয়োগ করতে হবে না। তারা তাদের ভবনের ছাদ সোলার বিনিয়োগকারীদের কাছে কার্যকরভাবে ভাড়া দিতে পারবেন।
বেসরকারি খাতের সোলার স্থাপনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, সরকারের এই সমন্বিত উদ্যোগটি বাংলাদেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের দ্রুত বিস্তার এবং শিল্প খাতে নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি সময়োপযোগী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ।
সুপারস্টার রিনেবলসের প্রধান নির্বাহী তোফায়েল আহমেদ এই পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ছাদভিত্তিক সোলার সম্প্রসারিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে গুণগত মান বজায় রাখার জন্য দেশজুড়ে যোগ্য সেবাদাতা নিয়োগ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
তবে তিনি উল্লেখ করেন, জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের চেয়ে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা যদি সহজ ও সাশ্রয়ী হয়, তবেই কেবল গ্রাহকরা এতে আগ্রহী হবেন।
ওমেরা সোলারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদুর রহিম বলেন, "৪,০০০ মেগাওয়াটের লক্ষ্য অর্জনে ওপেক্স প্রকল্পগুলোর ব্যাংকিং অর্থায়নযোগ্যতা নিশ্চিত করা, সহজ ও দ্রুততম সময়ে স্বল্পসুদে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি, উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ ক্রয়ের জন্য একটি স্পষ্ট ও আকর্ষণীয় ট্যারিফ ব্যবস্থা গঠন এবং নেট মিটারিংয়ের জন্য দ্রুত ওয়ান-স্টপ অনুমোদন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।"
একই সঙ্গে জেলাভিত্তিক সেবাদাতা নির্বাচন এবং মান নিয়ন্ত্রণে একটি স্বচ্ছ স্বীকৃতি প্রক্রিয়া বা অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন বলে তিনি জানান।
রহিম আরও বলেন, "আমরা বিশ্বাস করি, এই বিষয়গুলো দ্রুত চূড়ান্ত করে একটি পূর্বাভাসযোগ্য নীতি কাঠামো ও গতিশীল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দাঁড় করানো গেলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ লক্ষণীয়ভাবে বাড়বে, যা এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী ৪,০০০ মেগাওয়াটের লক্ষ্যকে বাস্তবে রূপ দেবে।"
সভাটিতে প্রস্তাবিত বিজনেস মডেল নিয়ে বেশ কিছু উদ্বেগের কথাও তুলে ধরেছে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। যার মধ্যে ছিল আমদানিকৃত সোলার যন্ত্রপাতির শুল্ক কাঠামো, মার্চেন্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য হুইলিং চার্জ এবং ওপেক্স মডেলের অধীন কোনো কারখানা বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে গেলে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি ও স্পষ্টতার বিষয়সমূহ।
এমন এক সময়ে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যখন বাংলাদেশ তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি। গ্যাসের ঘাটতির কারণে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ চাপের মুখে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতা দেশের জ্বালানি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তিনটি মডেলের প্রস্তাব
বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের তিনটি মডেল প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রথম মডেল অনুযায়ী, গ্রাহকরা এই ব্যবস্থার মাধ্যমে উৎপাদিত সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ নিজেরা ব্যবহার করবেন এবং এটি অফ-গ্রিড ভিত্তিতে পরিচালিত হবে।
দ্বিতীয় মডেলে, গ্রাহকরা তাদের প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন এবং অতিরিক্ত অংশ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবেন। এ ক্ষেত্রে ছাদ ব্যবহারের জন্য আলাদা কোনো ভাড়া দেওয়া হবে না।
তৃতীয় মডেলের অধীনে, গ্রাহকরা বিদ্যুতের একটি অংশ ব্যবহার করবেন এবং উদ্বৃত্ত অংশ গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। আর ছাদে সোলার প্যানেল বসাতে দেওয়ার বিনিময়ে ভবন মালিক নির্দিষ্ট পরিমাণ ছাদভাড়া পাবেন।
তৃতীয় এই মডেলটি প্রয়োগ করা হলে কারখানা, অফিস ও অন্যান্য ভবনের মালিকদের প্রাথমিক মূলধন বিনিয়োগ না করেই বিনিয়োগকারী কোম্পানিগুলো সেখানে সোলার সিস্টেম বসাতে পারবে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেবাদাতারা সোলার সেচ, সৌরবিদ্যুৎ চালিত কোল্ড স্টোরেজ, ইলেকট্রিক যানবাহন চার্জিং স্টেশন, ভাসমান সোলার এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য প্রযুক্তি প্যাকেজও তৈরি করতে পারবেন।
সহজ হচ্ছে নেট-মিটারিং বিধিমালা
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, তুলনামূলক বড় পরিসরের ছাদভিত্তিক ব্যবস্থা স্থাপন সহজ করতে ‘নেট মিটারিং গাইডলাইন ২০২৫’ সংশোধনের পরিকল্পনা করছে সরকার।
প্রস্তাবিত পরিবর্তন অনুযায়ী, সংশোধিত নিয়ম কার্যকর হলে গ্রাহকরা তাদের অনুমোদিত বিদ্যুতের লোডের চেয়ে সোলার সক্ষমতা বেশি হলেও সংশ্লিষ্ট বিতরণ অফিসের অনুমোদন সাপেক্ষে ১০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত সোলার সিস্টেম স্থাপন করতে পারবেন। সরকার আশা করছে, এই পরিবর্তনের ফলে আরও বেশি গ্রাহক বড় আকারের সিস্টেম বসাতে এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করতে উৎসাহিত হবেন।
গত ১২ জুলাই মন্ত্রিসভায় ‘রিনেবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট স্ট্র্যাটেজি ২০২৬-২০৩০’ অনুমোদনের পর এই উদ্যোগ নেওয়া হলো।
২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জনে এই কৌশলে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫,৫০০ মেগাওয়াট এবং গ্রাউন্ড-মাউন্টেড বা ভূমিতে স্থাপিত সোলার থেকে ৪,৫০০ মেগাওয়াটের পাশাপাশি বায়ু, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এলাকাভিত্তিক সেবাদাতা নির্বাচন
বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে ভৌগোলিক এলাকাভিত্তিতে বেসরকারি সেবাদাতাদের নির্বাচন করা হবে।
ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) ঢাকার নিজস্ব এলাকাগুলো পরিচালনা করবে, আর ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) তাদের নিজ আওতাধীন এলাকা পর্যবেক্ষণ করবে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) ঢাকা বিভাগ ও রংপুর বিভাগের সিংহভাগ এলাকা দেখভাল করবে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগ; নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) রাজশাহী বিভাগ; এবং ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) খুলনা ও বরিশাল বিভাগ তদারকি করবে।
বিতরণ কোম্পানিগুলো গতকাল থেকেই সেবাদাতাদের তালিকাভুক্তির কাজ শুরু করেছে।
মূল্যায়ন কমিটিতে সংশ্লিষ্ট বিতরণ কোম্পানি, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ এবং ন্যাশনাল লোড ডেসপ্যাচ সেন্টারের প্রতিনিধিরা থাকবেন।
সুবিধা পাবে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো
নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যে জেলায় সেবা দিতে ইচ্ছুক, সেই জেলায় কর্মরত কোম্পানিগুলোকে অগ্রাধিকার বা বিশেষ পয়েন্ট দেওয়া হচ্ছে।
আবেদনকারী কোম্পানি বা তার প্রধান অংশীদার প্রতিষ্ঠান যদি একই জেলায় কর্মরত থাকে, তবে তারা ৪০ পয়েন্ট পাবে। পার্শ্ববর্তী জেলা, একই বিভাগ বা অন্য বিভাগে অবস্থিত আবেদনকারীরা যথাক্রমে ২৫, ১৫ এবং ১০ পয়েন্ট পাবেন।
শ্রেডা (SREDA) বা ইডকলের (IDCOL) সঙ্গে নিবন্ধিত আবেদনকারীরা পাবেন ৫ পয়েন্ট এবং প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতার জন্য সর্বোচ্চ ৩০ পয়েন্ট বরাদ্দ থাকবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে তরুণ উদ্যোক্তা এবং নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে মূল্যায়ন পদ্ধতিতে স্টার্টআপ ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ১৫ পয়েন্ট এবং নারী মালিকানাধীন একক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের জন্য ১০ পয়েন্ট রাখা হয়েছে।
সহজ শর্তে অংশগ্রহণের সুযোগ
আবেদনকারীদের হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন (TIN), সর্বশেষ কর পরিশোধের সনদ এবং সর্বনিম্ন ১০ লাখ টাকার ব্যাংক স্বচ্ছলতা সনদ থাকতে হবে।
পাশাপাশি অন্তত ২ কিলোওয়াট ক্ষমতার সোলার সিস্টেম স্থাপনের পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। অন-গ্রিড বা অফ-গ্রিড উভয় ধরনের অভিজ্ঞতাই যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
কোম্পানিগুলো এককভাবে বা যৌথ উদ্যোগ (জয়েস ভেঞ্চার) গঠনের মাধ্যমে আবেদন করতে পারবে।
নির্বাচিত সেবাদাতাদের তালিকা ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বৈধ থাকবে, তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে কর্তৃপক্ষ তাদের তালিকা থেকে বাদ দিতে পারবে। আবেদন বাবদ ৫০০ টাকা এবং চূড়ান্ত নিবন্ধনের জন্য ৫,০০০ টাকা ফি প্রদান করতে হবে।