আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বাবা প্রিন্স লরাঁর সঙ্গে ক্লেমঁ ভানদেনকার্কহোভ ছবি: ইনস্টাগ্রাম
সাধারণ এক গাড়ির বিক্রেতা থেকে রাতারাতি রাজপরিবারের সদস্য—সত্যিই যেন কোনো রূপকথার গল্প! দীর্ঘ পথপরিক্রমা ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে বেলজিয়ামের রাজপরিবারে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন ২৬ বছর বয়সের যুবক ক্লেমঁ ভানদেনকার্কহোভ। ডিএনএ (DNA) পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে, বেলজিয়ামের বর্তমান রাজা ফিলিপের ছোট ভাই প্রিন্স লরাঁই ক্লেমঁর জন্মদাতা বাবা।
ঘটনার সূচনা ২০০০ সালের আগস্টে। বেলজিয়ামের খ্যাতিমান গায়িকা আইরিস ভানদেনকার্কহোভ (মঞ্চনাম ওয়েন্ডি ভান ওয়ানটেন)-এর কোলে জন্ম নেন ক্লেমঁ। ১৯৯০-এর দশকে প্যারিসের একটি ফ্যাশন শোতে প্রিন্স লরাঁর সঙ্গে আইরিসের পরিচয় ও গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। কিন্তু সেই সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
ক্লেমঁর বয়স যখন ১৬, তখন তার মা প্রথমবারের মতো প্রকাশ করেন এক বিশাল সত্য—তার বাবা আর ১০ জন সাধারণ মানুষের মতো নন, তিনি বেলজিয়ামের রাজপুত্র লরাঁ। এ তথ্য জানার পর নিজের পরিচয় নিয়ে ক্লেমঁর মনে তোলপাড় শুরু হলেও রাজকীয় স্বীকৃতি পেতে তাকে আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হয়। ২০ বছর বয়সে পৌঁছানোর পর ক্লেমঁ নিজেই উদ্যোগী হয়ে বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। দুই পক্ষের সম্মতিতে সম্পন্ন হয় পিতৃত্ব পরীক্ষা। ডিএনএ রিপোর্টে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যায় তাদের রক্ত সম্পর্কের কথা।
ডিএনএ ফল আসার পর আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি সুরাহা হতে কিছুটা সময় লাগে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রিন্স লরাঁ প্রকাশ্যে ক্লেমঁকে নিজের সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এরপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এক নিভৃত অনুষ্ঠানে দেশটির সিভিল রেজিস্ট্রিতে আইনগতভাবে পিতৃত্বের স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়, যা অতি সম্প্রতি প্রকাশ্যে এসেছে।
আইনি স্বীকৃতির মাধ্যমে রাজপরিবারের সন্তান হিসেবে গণ্য হলেও ক্লেমঁর জন্য সব রাজকীয় দুয়ার খুলে যাচ্ছে না। তিনি প্রিন্স লরাঁর অন্য তিন সন্তান—প্রিন্সেস লুইস, প্রিন্স নিকোলাস ও প্রিন্স আয়মেরিকের মতোই পিতার ব্যক্তিগত সম্পদের সমান ভাগের আইনি অধিকার পেয়েছেন। তবে তিনি কোনো সরকারি রাজকীয় ভাতা পাবেন না কিংবা রাজপরিবারের হয়ে কোনো দাপ্তরিক দায়িত্বও পালন করবেন না। সবচেয়ে বড় বিষয়, বেলজিয়ামের রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকার তালিকায় তার নাম থাকবে না।
ইচ্ছা করলে ক্লেমঁ বাবার রাজকীয় পদবি ‘সাক্স-কোবুর্গ’ গ্রহণ করতে পারেন। তবে মায়ের স্মৃতি ও তার ত্যাগের প্রতি সম্মান জানিয়ে নিজের বর্তমান পদবি ‘ভানদেনকার্কহোভ’ ধরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। ক্লেমঁর কথায়, কোনো রাজকীয় খেতাব বা ক্ষমতার চেয়ে এতদিন পর নিজের বাবাকে কাছে পাওয়াটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
বেলজিয়ামের রাজপরিবারে এমন নাটকীয় ঘটনা অবশ্য এবারই প্রথম নয়। প্রিন্স লরাঁর বাবা, সাবেক রাজা দ্বিতীয় আলবের্তও বহু বছর আইনি লড়াইয়ের পর ২০২০ সালে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন যে, তার একটি বিবাহবহির্ভূত কন্যা রয়েছে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে সেই কন্যাসন্তান ডেলফিন বোয়েল রাজকীয় মর্যাদা লাভ করেছিলেন।
১৬ বছর বয়সে সত্য জানার পর থেকে ২৬ বছরে রাজপুত্রের স্বীকৃতি পাওয়া—ক্লেমঁর এই ১০ বছরের যাত্রা রাজপ্রাসাদের চাকচিক্যকে ছাড়িয়ে পরিচয় খোঁজার এক মানবিক গল্প হিসেবেই সাধারণ মানুষের মন ছুঁয়ে গেছে।