Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুবছর পূর্তি : রক্তে লেখা ইতিহাসের দায়

ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
প্রকাশ : বুধবার, ৫ আগস্ট,২০২৬, ১২:২৯ এ এম
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুবছর পূর্তি : রক্তে লেখা ইতিহাসের দায়


২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রৌদ্রকরোজ্জ্বল ও রক্তঝরা দিনগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরতরে এক নতুন রেখাপাত করে গেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানার থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ যখন গোটা দেশের জনাবেগে পরিণত হলো, তখন পতন ঘটেছিল ১৬ বছরের পরাক্রমশালী এক কর্তৃত্ববাদী শাসনের। তরুণ প্রজন্মের অকুতোভয় আত্মত্যাগ এবং মেহনতী জনতার সর্বাত্মক অংশগ্রহণে অর্জিত হয়েছিল এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন—যে স্বপ্ন গড়ে উঠেছিল সমতা, সামাজিক বিচার এবং সর্বগ্রাসী বৈষম্যহীনতার শক্ত ভিত্তির ওপর।

আজ, ২০২৬ সালের আগস্টে এসে সেই রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হলো। দুই বছর একটি জাতির রূপান্তরের জন্য খুব দীর্ঘ সময় না হলেও, একটি অন্তর্বর্তীকালীন সংস্কার যাত্রা ও রাজনৈতিক পুনর্গঠনের পথরেখা মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট। এই মাইলফলকে দাঁড়িয়ে দেশবাসীকে প্রশ্ন করতে হচ্ছে: জুলাই অভ্যুত্থান যে সুবিশাল প্রত্যাশার আকাশ তৈরি করেছিল, গত দুই বছরে আমাদের প্রাপ্তির ঝুলি কতটা পূর্ণ হলো? প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধান কি আমরা কমিয়ে আনতে পেরেছি, নাকি দূরত্ব আরও বেড়েছে?

 জুলাইয়ের মূল চেতনা

জুলাই আন্দোলনের মূল সুর কেবল একটি নির্দিষ্ট সরকারের পতন বা ক্ষমতার অদলবদল ছিল না। রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল সংস্কারই ছিল জনতার মূল দাবি। গণ-অভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া প্রধান প্রত্যাশাগুলোকে কয়েকটি স্তম্ভে ভাগ করা যায়:

১. স্বৈরাচারী কাঠামোর বিলোপ ও গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন :
কোনো ব্যক্তি বা দল যেন পুনরায় রাষ্ট্রকে বন্দি করতে না পারে, সেজন্য নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইনসভার ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করা।
২. বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান :
আন্দোলনকালে নিহত ছাত্র-জনতার সুনির্দিষ্ট বিচার এবং বিগত দেড় দশকের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অপরাধের সঠিক জবাবদিহিতা।
৩.প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও সুশাসন :
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), নির্বাচন কমিশন, পুলিশ এবং আমলাতন্ত্রকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে জনবান্ধব সংস্থায় রূপান্তর।
৪. অর্থনৈতিক মুক্তি ও সাম্য :
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতের সংস্কার, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।
৫. মতপ্রকাশ ও নাগরিক স্বাধীনতার নিশ্চয়তা :
ডিজিটাল বা সাইবার নিরাপত্তার নামে করা সব ধরনের কালো আইন বাতিল করে গণমাধ্যম ও নাগরিকের স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ সুনিশ্চিত করা।

দুই বছরের অগ্রগতি ও অর্জনের ক্ষেত্র 

বিগত দুই বছরে সবকটি ক্ষেত্র হতাশায় ডুবে গেছে—এমন বলা অনুচিত হবে। কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ও সংস্কারের উদ্যোগ দেখা গেছে-
ক. প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ভিত্তি স্থাপন :
বিগত দুই বছরে গঠিত একাধিক সংস্কার কমিশন (সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, বিচার প্রশাসন ও পুলিশ সংস্কার কমিশন) তাদের বিস্তারিত রূপরেখা প্রকাশ করেছে। রাষ্ট্র সংস্কারের একটি আইনি ও রাজনৈতিক খসড়া তৈরি হতে পেরেছে।
খ. মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বৃদ্ধি :
ভয় ও আতঙ্কের আবহ অনেকটাই কেটে গেছে। গণমাধ্যম এবং সাধারণ নাগরিকরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্মুক্তভাবে সরকার, নীতি ও রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করতে পারছেন।
গ.আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া :
গণহত্যা ও রাষ্ট্রীয় বর্বরতার দায়ে সংশ্লিষ্ট মূল অভিযুক্তদের বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ অন্যান্য আইনি মাধ্যমে সচল করা হয়েছে, যা অপরাধীদের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
ঘ.নির্বাচনী ব্যবস্থার পুনর্গঠন :
একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রযাত্রা সাধিত হয়েছে।

প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান 

অর্জন যতটুকু হয়েছে, তার তুলনায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও কাঠামোগত বাস্তবতায় প্রত্যাশার ফারাকটি রয়ে গেছে বেশ প্রকট।
১. মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক দুর্ভোগ
সাধারণ জনগণের কাছে আন্দোলনের অন্যতম বড় প্রত্যাশা ছিল অর্থনৈতিক স্বস্তি। কিন্তু গত দুই বছরেও বাজার সিন্ডিকেট পুরোপুরি ভাঙা সম্ভব হয়নি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য, জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ এবং মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ ও নিম্নবিত্ত মানুষের জীবন কাটছে চরম নাভিশ্বাসে। ব্যাংক খাতের সংস্কার শুরু হলেও পাচার হওয়া অর্থ দ্রুত ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি দীর্ঘসূত্রতায় আটকে গেছে।

২. আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা
অভ্যুত্থানের পর পুলিশের কাঠামোগত মনোবল ভেঙে পড়েছিল। দুই বছর পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পুরোপুরি সক্রিয়, দক্ষ এবং জনবান্ধব করে তোলার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়ে গেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে দেখা দেওয়া অস্থিরতা, মব জাস্টিস (Mob Justice) বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা এবং রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তার অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
৩. রাজনৈতিক সংস্কৃতির রূপান্তরে ধীরগতি
ব্যক্তি বা দলের পরিবর্তন হলেও রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত পরিবর্তন কতটুকু হয়েছে—তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন রয়েছে। দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের পুরোনো রাজনীতি কেবল এক হাত থেকে অন্য হাতে স্থানান্তরিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যে রাজনৈতিক বন্দোবস্তের পরিবর্তনের স্বপ্ন তরুণরা দেখেছিল, তা এখনও দলীয় স্বার্থের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে।
৪. কর্মসংস্থান ও তরুণদের ভবিষ্যৎ
ছাত্রসমাজ এই আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিল। কিন্তু নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে রূপান্তরটি বেশ ধীরগতির। ফলে তরুণদের মধ্য থেকে হতাশা পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয়নি।
প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান : নেপথ্যে কারণ
কেন তৈরি হলো এই প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান ? বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি মূল কারণ চিহ্নিত করা যায়-

১.আমলাতান্ত্রিক জটিলতা :
রাষ্ট্রযন্ত্রের গভীরে গেঁথে থাকা পুরোনো আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা ও কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সংস্কারের গতিকে পদে পদে বাধাগ্রস্ত করেছে।
২. রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যের অভাব :
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের চেয়ে দ্রুত ক্ষমতায় যাওয়ার প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর অতিরিক্ত মনোযোগ জাতীয় ঐক্যকে শিথিল করে দিয়েছে।
৩. বাস্তবতার সাথে আবেগের সংঘাত :
অভ্যুত্থানের আবেগ থেকে তৈরি হওয়া তাৎক্ষণিক আমূল পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় আইনি বা অর্থনৈতিক জটিলতার বাস্তবতার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
ভবিষ্যতের পথরেখা : বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন রক্ষা
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কেবল একটি ইতিহাস নয়, এটি একটি জীবন্ত অঙ্গীকার। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির এই ব্যবধানকে যদি আমরা সময়মতো পুষিয়ে নিতে না পারি, তবে তা জাতির মধ্যে চরম নৈরাশ্যের জন্ম দেবে, যা ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক যাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে। এই দূরত্ব কমাতে হলে যা করা জরুরি:
১.জাতীয় ঐকমত্য বজায় রাখা :
মৌলিক সংস্কারের প্রশ্নে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নূন্যতম একটি জাতীয় ঐকমত্য ধরে রাখতে হবে।
২.অর্থনৈতিক স্বস্তি অগ্রাধিকার দেয়া :
দ্রুততম সময়ে বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলা, যুব সমাজের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই হতে হবে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন রক্ষার প্রধান কাজ।
৩.আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা :
মব কালচার কঠোরভাবে দমন করে আইনের অনুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে দেশের সাধারন নাগরিকরা সর্বত্র নিরাপদ বোধ করেন।
৪.সংস্কার বাস্তবায়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ :
শুধু কাগজে-কলমে কমিশন গঠন নয়, সংস্কারের দৃশ্যমান প্রতিফলন নিশ্চিত করতে হবে এবং একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনের মাধ্যমে জাতিকে একটি চিন্তিত জায়গায় পৌঁছে দিতে হবে, যাতে কোনদিন নির্বাচন নিয়ে আর কোন তাল বাহানা কেউ করতে না পারে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আমাদের শিখিয়েছে—শোষণের ভিত্তি যত শক্তিশালীই হোক না কেন, গণমানুষের ইস্পাতকঠিন ঐক্যের সামনে তা ভেঙে পড়তে বাধ্য। কিন্তু ইতিহাস এ-ও মনে করিয়ে দেয় যে, আন্দোলন করা যত কঠিন, আন্দোলনের অর্জন ধরে রাখা এবং তা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া তার চেয়েও কঠিন।
দুই বছর পূর্তির এই ক্ষণে দাঁড়িয়ে আমাদের আত্মোপলব্ধি প্রয়োজন। প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার ব্যবধান আছে সত্যি, কিন্তু সেই ব্যবধান দূর করার সুযোগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। হাজারো শহীদের রক্ত আর হাজার হাজার আহত বীরের পঙ্গুত্বকে অর্থবহ করতে হলে আমাদের জুলাইয়ের মূল চেতনা—'বৈষম্যহীনতা ও ইনসাফ'—কে কোনো অবস্থাতেই ভুলে গেলে চলবে না। কোনো দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থে যেন এই মহান অর্জন মলিন না হয়, সেই সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।

লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

 

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)