ড. মো. মেসবাহ উদ্দীন
রায়সিনা হিলসের চূড়া থেকে যমুনার শান্ত প্রবাহ—লুটিয়েন্স দিল্লির স্থাপত্যশৈলীতে যে আপাত স্থিরতা চোখে পড়ে, তার ঠিক উল্টো চিত্র আজকের ভারতের মূলধারার রাজনীতিতে। বহুজাতিক পুঁজির চকচকে আবরণ আর বিশ্বমঞ্চে উদীয়মান অর্থনৈতিক ক্ষমতার আলো ঝলমলে বিজ্ঞাপনের আড়ালে ভারতের রাজনীতির অন্দরমহলে এখন গভীর অস্থিরতা। দিল্লির সংসদ ভবনের উচ্চকণ্ঠ বিতর্ক থেকে শুরু করে রাজধানীর তপ্ত রাজপথ—সবখানেই আজ সামাজিক মেরুকরণ, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এবং আদর্শিক দ্বন্দ্বে চরম উত্তাপ। যে দেশকে দীর্ঘদিন ধরে 'বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র' হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, তার রাজপথ আজ একের পর এক প্রতিবাদের ঝড়ে কেন এত অশান্ত? কোন অনিশ্চিত কিংবা অজানা গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলেছে ১৩০ কোটি মানুষের এই বিশাল রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ?
মূলত, দিল্লির রাজপথের এই অস্থিরতা কেবল সাময়িক কোনো দলীয় সংঘাত নয়; এটি ভারতের দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক মূল্যবোধ, প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাতন্ত্র্য এবং সামাজিক বুননের ওপর তৈরি হওয়া এক গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ। একচ্ছত্র ক্ষমতার লিপ্সা, বিরোধী কণ্ঠ দমনের প্রবণতা এবং ধর্মীয় কার্ড খেলে জনমতকে বিভক্ত রাখার রাজনীতির বিপরীতে দাঁড়িয়েছে সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির লড়াই, বেকারত্ব আর ক্ষোভ। একদিকে শাসকদলের উগ্র জাতীয়তাবাদী বয়ান, অন্যদিকে সংবিধান রক্ষা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা প্রতিবাদের ঝড়—এই দুইয়ের মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে দিল্লির রাজপথ আজ এক ঐতিহাসিক চৌরাস্তায় উপনীত। ভারতের রাজনীতি কি তার মূল বহুত্ববাদী ও গণতান্ত্রিক চেতনায় ফিরে আসবে, নাকি এক অজানা কর্তৃত্ববাদী অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে—সেই উত্তরের সন্ধানেই আজ উত্তাল ভারতের কেন্দ্রস্থল।
দিল্লির রাজপথ অশান্তের নেপথ্যে কারণ
১. রামরাজ্যের রূপকল্প বনাম সামাজিক বাস্তবতার সংঘাত :
ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) তাদের দ্বিতীয় মেয়াদ পেরিয়ে তৃতীয় মেয়াদে প্রবেশ করলেও আগের সেই একক আধিপত্য বা 'একচ্ছত্র সংখ্যাগরিষ্ঠতার' স্বর্ণযুগ এখন খানিকটা টালমাটাল। একদিকে অযোধ্যার রাম মন্দির নির্মাণ এবং হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদের উত্থানকে বিজেপি তাদের আদর্শিক বিজয়ের চূড়ান্ত রূপ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিল। অন্যদিকে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার ধাক্কায় সেই বয়ান আজ রাজপথে এসে আছড়ে পড়ছে।
দিল্লির রাজপথ বিগত কয়েক বছরে একের পর এক অভূতপূর্ব আন্দোলনের সাক্ষী থেকেছে। বিতর্কিত কৃষি আইন বিরোধী অভূতপূর্ব কৃষক আন্দোলন থেকে শুরু করে সিএএ-এনআরসি (CAA-NRC) বিরোধী নাগরিক বিক্ষোভ, কিংবা সম্প্রতি বেকারত্ব ও মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ যুবসমাজের আন্দোলন—প্রতিটি স্ফুলিঙ্গই প্রমাণ করে যে, কেবল ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ দিয়ে কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবিকার জ্বালা ঢাকার দিন শেষ হয়ে আসছে। দিল্লির প্রবেশমুখগুলোতে কৃষকদের অবস্থান ধর্মঘট শুধু এক নীতিগত প্রতিবাদ ছিল না, তা ছিল কর্পোরেট-বান্ধব কেন্দ্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর বিরুদ্ধে প্রান্তিক ভারতের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
২. প্রতিষ্ঠানগুলোর অবক্ষয় ও ক্ষমতার অতি-কেন্দ্রিকতা :
ভারতের শাসনব্যবস্থার মূল শক্তি ছিল এর সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাতন্ত্র্য। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দিল্লির রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ইডি (ED), সিবিআই (CBI), কিংবা নির্বাচন কমিশনের মতো নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর চরম রাজনৈতিক ব্যবহার। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ—গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যত ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে।
একদিকে মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে শীর্ষস্থানীয় বিরোধী নেতাদের গ্রেপ্তার ও তদন্তের মুখোমুখি করা, অন্যদিকে দল ভাঙানো ও অর্থবলে সরকার ফেলার 'অপারেশন পদ্ম' রাজনীতিকে এক অনৈতিক জায়গায় নিয়ে ঠেকিয়েছে। আদালতের ভূমিকা নিয়েও জনমনে নানা সংশয় ও প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে। বিচার বিভাগ যখন নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় হিমশিম খায়, তখন রাজপথই হয়ে ওঠে অসন্তোষ প্রকাশের একমাত্র উন্মুক্ত ক্ষেত্র।
আরও পড়ুন-
ফেসবুক ও টিকটক আসক্তি থেকে বের হবার পথ কী
৩. বিরোধী 'ইন্ডিয়া' জোট ও রাজনীতির পুনর্মিলন :
দিল্লির রাজনীতিকে এতদিন বিজেপি বনাম এক খণ্ডিত বিরোধীদের লড়াই বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে ভারতের রাজনৈতিক সমীকরণ এক নতুন মোড় নেয়। কংগ্রেসের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা 'ইন্ডিয়া' (INDIA) জোট ক্ষমতার ভারসাম্যকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে। প্রধান বিরোধী দল হিসেবে কংগ্রেস এবং বিরোধী দল নেতা হিসেবে রাহুল গান্ধীর উত্থান দিল্লির রাজনীতিতে এক নতুন ধারার জন্ম দিয়েছে।
'ভারত জোড়ো যাত্রা'র মাধ্যমে যে সামাজিক সংযোগ তৈরির চেষ্টা হয়েছিল, তা ভারতীয় রাজনীতির মূল আলোচনাকে ধর্মীয় মেরুকরণ থেকে সরিয়ে 'জাতিগণনা' (Caste Census), সামাজিক ন্যায়বিচার ও সংবিধান রক্ষার দিকে ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে দিল্লি আজ কেবল একপাক্ষিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্র নয়, বরং তীব্র রাজনৈতিক লড়াইয়ের এক যুদ্ধক্ষেত্র।
৪. অর্থনৈতিক বৈষম্য ও যুবসমাজের হতাশা :
ভারত বিশ্বের দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর একটি—এ কথা আন্তর্জাতিক পরিসরে বারবার উদযাপিত হলেও, ঘরের ভিতরের ছবিটা ভিন্ন। ধনকুবেরদের সম্পদের পাহাড় বৃদ্ধির বিপরীতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
দিল্লির মসনদ সবসময়ই যুবশক্তির সমর্থনের ওপর ভর করে টিকে থাকে। কিন্তু বর্তমানে ভারতের শিক্ষিত বেকারের হার এবং সরকারি চাকরির নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা তরুণ সমাজকে তীব্র হতাশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। 'অগ্নিবীর' প্রকল্পের মতো প্রতিরক্ষা নিয়োগের স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা যুবসমাজ সহজভাবে মেনে নেয়নি। রাজপথে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের স্লোগান স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, 'ডিজিটাল ইন্ডিয়া'র উজ্জ্বল বিজ্ঞাপনের পেছনে এক বিশাল অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা লুকিয়ে রয়েছে।
৫. অহিংসার ঐতিহ্য বনাম উগ্র মেরুকরণ :
ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার মূল ভিত্তি—'বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য' (Unity in Diversity)—আজ মারাত্মক হুমকির মুখে। উগ্র গোষ্ঠীগুলোর উত্থান, সংখ্যালঘুদের প্রতি অবমাননা এবং প্রতিনিয়ত বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বা 'হেট স্পিচ' সমাজের সামাজিক বুনন নষ্ট করে দিচ্ছে। দিল্লিতে ২০২০ সালের দাঙ্গার ক্ষত এখনো শুকায়নি। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকাশ্য বা পরোক্ষ মেরুকরণ নীতি ভারতের সমাজকে সামাজিকভাবে এমন এক খণ্ডে বিভক্ত করেছে, যা থেকে ফিরে আসা অত্যন্ত কঠিন।
অজানা গন্তব্যের পথরেখা
ভারতের রাজনীতি এখন এক ঐতিহাসিক চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে। এখান থেকে রাজনীতি কোনো দিকে যাবে, তা নির্ভর করছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তরের ওপর:
প্রথমত, ভারতের বহুদলীয় গণতন্ত্র কি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে, নাকি তা কার্যত একদলীয় বা কর্তৃত্ববাদী শাসনের কাঠামোয় রূপ নেবে?
দ্বিতীয়ত, ভারতের রাজনীতি কি আগামী দিনে কেবল হিন্দুত্ব বনাম ধর্মনিরপেক্ষতার পুরনো দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি অর্থনৈতিক বৈষম্য ও কর্মসংস্থানের মৌলিক প্রশ্নগুলো রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে আসবে?
তৃতীয়ত, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের যে চরম অবনতি ঘটছে এবং দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সাথে দিল্লির যে দূরত্বের সৃষ্টি হচ্ছে, তা ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে কোনো বড় সংকটে ফেলবে কি না?
দিল্লির রাজপথের বর্তমান অশান্তি কেবল সাময়িক কোনো রাজনৈতিক উত্তেজনা নয়; এটি ভারতের আত্মপরিচয়ের গভীর সংকটের লক্ষণ। বিশ্বমঞ্চে ভারত নিজেকে 'গ্লোবাল সাউথ'-এর নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে, কিন্তু অভ্যন্তরীণ সামাজিক সংহতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ছাড়া এই নেতৃত্ব টেকসই হওয়া অসম্ভব।
ইতিহাস সাক্ষী, দিল্লির রাজপথ বহু রাজবংশের পতন দেখেছে, বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী থেকেছে। কোনো শক্তিই সেখানে চিরস্থায়ী হয়নি। ভারত আজ তার স্বাধীনতার আট দশকের কাছাকাছি পৌঁছে যে মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে পেছানোর কোনো পথ নেই। অনাগত দিনে ভারতের রাজনীতি কোনো সংঘাতময় কর্তৃত্ববাদের দিকে যাবে, নাকি তা আবার তার মূল গণতান্ত্রিক, বহুত্ববাদী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনায় ফিরে আসবে—দিল্লির অশান্ত রাজপথই হয়তো খুব শিগগিরই তার চূড়ান্ত রায় দেবে।
লেখক: গবেষক, বিশ্লেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা
আরও পড়ুন-
কীভাবে নষ্ট হচ্ছে কর্মজীবী নারী-পুরুষের মূল্যবান কর্মঘণ্টা