Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

সিজোফ্রেনিয়া, অনন্যা ও সম্মিলিত উন্মাদনা

হাবিবুর রহমান রিপন হাবিবুর রহমান রিপন
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই,২০২৬, ০৯:৫৬ পিএম
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই,২০২৬, ১০:৪২ পিএম
সিজোফ্রেনিয়া, অনন্যা ও সম্মিলিত উন্মাদনা

হাবিবুর রহমান রিপন ছবি: ধ্রুব নিউজ

শোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলাম রসুল এখন দেশব্যাপী আলোচিত নাম। তাকে জড়িয়ে সংঘটিত একটি ঘটনা সারাদেশকে তোলপাড় করেছে। ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে তার মেয়ে অনন্যা। যে কী না সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত। তাদের বাড়ির সামনে একটি কওমি মাদ্রাসা, যেখানে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত ছোট শিশুরা লেখা-পড়া করে। মাদ্রাসার নিজস্ব কোনো খেলার মাঠ নেই।শিশুরা গলির রাস্তায় চলাফেরা করে, আর তাদের মায়েরা গলির একপাশে চেয়ার নিয়ে বসে থাকেন।

এমপি কন্যা অন্যন্যার বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ—তিনি এসব শিশুকে একেবারেই সহ্য করতে পারেন না এবং বাড়ির ছাদ থেকে শিশুদের গায়ে গরম পানি ঢেলে দেন। তবে এই অভিযোগ ও গুঞ্জনের আড়ালে যে ঘটনার প্রেক্ষাপটে তোড়পাড় হয়েছিল দেশ সেটা  ঘটেছিল এই গলিরাস্তাতেই, মাদ্রাসার ছাত্র শিক্ষক অভিভাবককে কেন্দ্র করে।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে তথ্য ও ভিডিও চিত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায় ঘটনার বাস্তবতা এই রকম-

সেদিন গলিরাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় মাদ্রাসার এক শিক্ষক বাইসাইকেল চালিয়ে এসে এমপি কন্যাকে ধাক্কা দেন।সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত এমপি কন্যা অনন্যা এতে উত্তেজিত হয়ে সাইকেলটি ফেলে দেন। এই নিয়ে রাস্তায় বসে থাকা অভিভাবকদের সাথে তার কথা-কাটাকাটি হয় এবং একপর্যায়ে অভিভাবকরা তার ওপর চড়াও হন। ভয়ে ও মানসিক উত্তেজনায় মেয়েটি রাস্তার ওপর পড়ে গড়াগড়ি খেতে থাকেন। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি শান্ত করে।

পরদিন ওই শিক্ষক সাইকেল ভাঙার নালিশ নিয়ে সংসদ সদস্যের কাছে যান। বাবার সামনে এই অভিযোগ শুনে অনন্যা তীব্রভাবে প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি ছুটে মাদ্রাসার ভেতরে ঢুকে এলোমেলো আচরণ করতে থাকেন। সেখানে উপস্থিত অভিভাবকরা তাকে মারধর করতে লাগলে তার মা-বাবা ছুটে এসে সন্তানকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। বাবার পেছনে লুকিয়ে পড়েন অন্যন্যা। ঠিক সেই মুহূর্তে কয়েকজন নারী ছুটে এসে তাকে চড়-থাপ্পড় মারতে থাকেন। চরম উত্তেজনা ও মানসিক অসুস্থতার একপর্যায়ে অনন্যা সামনে থাকা মাদ্রাসার সেই শিক্ষক যে সাইকেলে ধাক্কা দিয়েছিল তাকে একটি চড় মারেন। এ সময় ঘটনার আকস্মিকতায় গেটের তালা ছুড়ে অভিভাবকদের দিকে মারলে এক নারীর মাথা কেটে যায়।

সংসদ সদস্য পিতার পেছনে আশ্রয় নেন অন্যন্যা       ছবি সংগৃহীত

পরবর্তীতে উদ্ভুতঘটনা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে, এরপলে প্রকৃত সত্যটি ঢাকা পড়ে যায়। এলাকার ও বাইরের লোকজন যেভাবে পারে ক্ষোভ উগরাতে থাকে। যুক্ত হয় ভিউ বাণিজ্যের ফেসবুকার ও ইউটিউবাররা। পিছিয়ে থাকনেনি  স্বার্থান্বেষী সংবাদকর্মীরাও। আসল ঘটনার পেছনে না ঘুরে  কেউ মেয়েটিকে ‘নেশাসক্ত’ বলে গালি দেয়, কেউ মেয়েটি মদ খান বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে অগত্যা একজন সংসদ সদস্য  পিতা হয়েও সামাজিক মাধ্যমে লাইভে এসে মেয়ের মানসিক অসুস্থতার প্রেসক্রিপশন ও চিকিৎসার কাগজপত্র দেখাতে বাধ্য হন। তিনি সবাইকে বোঝানোর আকুল চেষ্টা চালান, কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। বরং অসুস্থ মেয়েটির বিরুদ্ধে বিষোদাগার আরও বাড়ে; প্রশ্ন ওঠে ‘পাগল কীভাবে ডাক্তারি পড়ে’ ইত্যাদি। পরবর্তীতে জনরোষের নামে যা ঘটে তা আরও ভয়াবহ।খবরান্তে প্রকাশ, সংসদ সদস্যের পরিবারকে দীর্ঘ ১২ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখা হয়, ইট-পাটকেল মারা হয়, এমনকি ড্রিল মেশিন দিয়ে বাড়ির গেট ভাঙার চেষ্টাও চালানো হয়।

প্রশ্ন হলো, সংসদ সদস্য ক্ষমতার অপব্যবহার করেননি বলেই কি তার এবং তার অসুস্থ সন্তানের সাথে সমাজ এমন মারমুখী আচরণ করতে পারল? এটা হয়তো ক্ষমতার সমীকরণের বিষয় হতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে বড় এবং ভাবনার বিষয় হলো—অনন্যার মতো একজন মানসিক রোগীকে সমাজ হিসেবে আমরা কেন মেনে নিতে পারি না? তার বা তাদের মতো মানুষদের প্রতি আমাদের আচরণ কেন সামান্যতম নরম হয় না?

অন্যন্যার এই অস্বাভাবিক আচরণের মূলে রয়েছে সিজোফ্রেনিয়া নামের একটি জটিল মানসিক রোগ। এতে আক্রান্ত মানুষের চিন্তাভাবনা, অনুভূতি এবং আচরণের ওপর নিজের স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ থাকে না। একজন সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত মাঝেমধ্যেই বাস্তবে নেই এমন কিছু শুনতে পান বা দেখতে পান, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে 'হেলুসিনেশন' বলা হয়। এছাড়া তাদের মনে তৈরি হয় তীব্র ভ্রান্ত বিশ্বাস—যেমন মেয়েটি হয়তো মনে করেছিলেন আশেপাশের সবাই তার ক্ষতি করতে চাইছে। এই তীব্র নিরাপত্তাহীনতা থেকেই তিনি হুজুরকে চড় মারা বা তালা ছুড়ে মারার মতো চরম আক্রমণাত্মক আচরণ করেছিলেন। এটি তার কোনো খারাপ ব্যবহার বা ইচ্ছা করে করা অপরাধ নয়; বরং মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যের চরম গোলযোগের ক্রিয়া-বিক্রিয়া। অথচ আমাদের সমাজ এই বৈজ্ঞানিক সত্যকে না বুঝে চিকিৎসাধীন অনন্যাকে দাগিয়ে দিয়েছে ‘পাগল’ কিংবা ‘নেশাসক্ত’ হিসেবে।

সম্ভত মেয়েটির এই করুণ পরিস্থিতি আসলে দেশের সামগ্রিক মানসিক স্বাস্থ্য সংকটেরই এক জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি প্রকাশ করেছে। আমাদের দেশে অনন্যার মতো লাখ লাখ মানুষ মানসিক কষ্টে আছেন, কিন্তু সমাজ তা স্বীকারই করতে চায় না। সম্প্রতি সংসদে দেওয়া তথ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১৬.৮ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের প্রায় ১২.৬ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, অনন্যা চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সুযোগ পেলেও দেশের ৯২ শতাংশের বেশি মানুষ কোনো ধরনের চিকিৎসা সেবা পানই না। অথচ দেশে প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ১.১৭ জন।

এই হিসাবটাও প্রায় সাত বছর আগের। এর মধ্যে সামাজিক ও পারিবারিক টানাপোড়েন, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং অবিশ্বাসের কারণে হতাশা ও বিষণ্নতা বহুগুণ বেড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছে—২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বজুড়ে সুস্থ জীবনযাপনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা।

অনন্যার বাবা প্রেসক্রিপশন দেখিয়েও মানুষকে যেভাবে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছেন, তার কারণ আমাদের সমাজে মানসিকস্বাস্থ্য নিয়ে জড়িয়ে থাকা শতাব্দী প্রাচীন কিছু ভুল ধারণা ও কুসংস্কার:

প্রথমত, আমাদের সিংহভাগ মানুষ বিশ্বাসই করতে চান না যে 'মনের অসুখ' বলে সত্যি কিছু আছে। তাই অনন্যার অসুস্থতাকে মানসিক রোগ না ভেবে মানুষ ভাবল ‘নেশাজাতীয় আচরণ’।

দ্বিতীয়ত, আজও অনেকে মনে করেন মানসিক স্বাস্থ্য মানেই পাগলের চিকিৎসা। ফলে ডাক্তারের কাছে যাওয়া অনন্যাকে দেখে মানুষ প্রশ্ন তুলেছে "পাগল আবার ডাক্তারি পড়ে কীভাবে!"

তৃতীয়ত, এ সমাজে এক অদ্ভুত ধারণা আছে যে, নারী এবং শিশুদের আবার কিসের মানসিক চাপ বা রোগ?

চতুর্থত, অনেকেই মনে করেন মনের রোগের মূল কারণ ‘জিনে ধরা’ বা ‘বাতাসের আসর’।

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দীন আহমেদ জানান, সিজোফ্রেনিয়া বা তীব্র বিষণ্নতার চিকিৎসায় রোগীকে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে এটি অত্যন্ত কার্যকর। অর্থাৎ অনন্যাদের যদি সমাজের মানুষ চড়-থাপ্পড় বা ইট-পাটকেল না মেরে একটু সহমর্মিতা দেখাতো তাহলে কোনো ঘটনাই ঘটতো না বরং সুস্থতার ধারায় ফিরতো তারা।

এই কুসংস্কারের মাশুল অনন্যার পরিবার যেমন অবরুদ্ধ হয়ে গুণল, তেমনি সমাজের আরও অনেক মানুষকে জীবনের বিনিময়ে তা দিতে হচ্ছে। সঠিক সময়ে মানসিক রোগের স্বীকৃতি না পাওয়ায় দেশে বাড়ছে সহিংসতা ও আত্মহত্যা। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় এক হাজার থেকে চৌদ্দশত মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

যেমন সালমার (ছদ্মনাম) গল্পটি ধরা যাক। ১৫-১৬ বছর বয়সে সালমার মধ্যে সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে পরিবার তাকে ‘বেয়াদব’ মনে করে চিকিৎসা দেয়নি। ফলে ২১ বছর বয়সে সালমা ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেন। অনন্যা এবং সালমা—দুটোই একই কুসংস্কারের পরিণতি। সালমার বেলা সমাজ তাকে ঠেলে দিয়েছে আত্মহত্যার দিকে, আর অনন্যার বেলায় অসুস্থতা প্রকাশ পাওয়ায় সমাজ মেতে উঠেছে উন্মাদনা ও সহিংসতায়।

অধিকাংশ মানুষ মানসিক রোগকে পাত্তা দেয় না বলেই রোগী চূড়ান্ত উন্মাদ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি উপেক্ষিত থাকে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মেখলা সরকার লিখেছেন, ‘শারীরিক রোগকে আমরা স্বাভাবিকভাবে দেখলেও মানসিক সমস্যাকে বাংলাদেশে আজও ঠাট্টা, বিদ্রুপ বা হালকা বিষয় হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া হয়।ঠিক যেমনটা অনন্যার বাবা আকুতি জানানোর পরও মানুষ ঘটনাটিকে গুরুত্ব না দিয়ে বিদ্রুপ করেছে।’

এমনকি শারীরিক পরীক্ষা করালেও অনেক সময় মানসিক রোগের মূল কারণ ধরা পড়ে না, কারণ স্নাতক পর্যায়ের সাধারণ চিকিৎসাবিদ্যায় মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি উপেক্ষিত থাকে।বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্কদের বিষণ্নতায় ভোগার হার ৬.৭ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত হওয়ার হার ৫.১ শতাংশ। অথচ এত বড় সংকটের পরও মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ০.৪৪ শতাংশ দেওয়া হয় মানসিক স্বাস্থ্য খাতে।

প্রকৃতবিষয় হলো, অনন্যাদের মতো রোগীদের সুস্থ করে তুলতে কেবল ওষুধ বা চার দেয়ালের চিকিৎসা যথেষ্ট নয়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এখন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ‘সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং’ বা সামাজিক নিরাময় ব্যবস্থার ওপর। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দীন আহমেদ জানান, সিজোফ্রেনিয়া বা তীব্র বিষণ্নতার চিকিৎসায় রোগীকে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে এটি অত্যন্ত কার্যকর। অর্থাৎ অনন্যাদের যদি সমাজের মানুষ চড়-থাপ্পড় বা ইট-পাটকেল না মেরে একটু সহমর্মিতা দেখাতো তাহলে কোনো ঘটনাই ঘটতো না বরং সুস্থতার ধারায় ফিরতো তারা।

লেখক: ধ্রব নিউজের সম্পাদক

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)