রেজাউর রহমান
প্রয়াত শিল্পী তরুণ ঘোষ ও তাঁর হাতে আঁকা আনন্দ শোভাযাত্রার পোস্টার ছবি: লেখক
"জীবন খোঁজার তাড়না যারা অনুভব করেন তারাই শিল্প অনুভব করেন "
- শিল্পী তরুণ ঘোষ।
জীবন কে কিভাবে খুঁজতে হয়? অনুভব করতে হয়? আছে কি তার কোন বিদ্যালয় বা পাঠ্যপুস্তক। বোধকরি নেই। এর জন্ম হয় পারিপার্শ্বিকতার মধ্যদিয়ে। মানুষের জন্মস্থান, আশপাশ এবং সময় হয়তো জীবন কে চিনতে শেখায় অনেকংশে। সমাজের বিশেষ কিছু বোধসমৃদ্ধ মানুষ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে জীবনকে চিনিয়ে দেন, কারণ আমাদের এই বিশেষ চেতনার ঘাটতি থাকে বলে।চিত্রশিল্পী, লেখক, সাহিত্যিক, অভিনেতা ও গল্পকাররা সারা জীবনই “জীবন আসলে কী”- তার খোঁজ করে থাকেন, তাদের সৃষ্টির মধ্যদিয়ে জীবনটা শেষও করেন বিশেষ বোধ অর্জনের মাধ্যমে।

শিল্পী তরুণ ঘোষ বাংলাদেশের চিত্রকলার এক ধ্রুবতারা। তিনি ঢাকা চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে শিল্পশিক্ষা শেষ করেন, কিন্তু তার স্মৃতি কথাই উঠে আসে সমৃদ্ধ শৈশবের কথা, যে শৈশব তাকে জীবনবোধের পাঠশালার ছাত্র বানিয়ে ছিল। তিনি ১৯৫৩ সালে রাজবাড়ী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন, এবং দুরন্ত এক পিতৃহহীন শৈশব জীবন কাটান। রাজবাড়ীর বিভিন্ন সমৃদ্ধ শিল্প সম্ভার যা ওই সময় তাকে আলোড়িত করত, যেমন লক্ষীকুল পরিত্যাক্ত রাজবাড়ী। যার গায়ে আঁকা বিচিত্র সব ছবি এবং নিস্তব্ধতা তরুণ ঘোষকে এক কল্পনার জগতে নিয়ে যেত। মূলত ওই কল্পনা প্রবণতা থেকেই জীবন খোঁজার শুরু। রাজবাড়ীতে তরুণ ঘোষ বন্ধুদের সাথে রাজনীতিতে যুক্ত হন। গান করেছেন নাটক এবং ডিজাইনও করেছেন তরুণ বয়সেই।

তরুণ ঘোষ কৈশোরেই পরাধীন ভূ-খণ্ড দেখেছেন এবং তা মুক্ত হবার জন্য প্রতিরোধযুদ্ধ চোখের সামনে অবলোকন করেছেন-যা তার চিত্রকলায় উঠে এসেছে পরবর্তীতে। একজন শিল্পীর মননে প্রয়োজন হয় জীবনকে ভিন্নআঙ্গিক থেকে দেখার। তরুণ ঘোষের শৈশব কৈশোর যদি দেখি- তাহলে দেখব তিনি আসলে শিল্পের অনুষঙ্গগুলো নিয়েই বেড়ে উঠেছেন। শিল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাঁকে সমৃদ্ধ করেছে, তবে শিল্পের ভাষা তিনি নিজেই রপ্ত করেছেন। তাঁর "বেহুলা " শিরোনামের ধারাবাহিক চিত্রকর্ম দেখলে বোঝা যায়, রেখা ও অবয়ব নির্ভরতা আবার নিরীক্ষাধর্মিতা তো আছেই।

তরুণ ঘোষ মনে করতেন একাডেমি হয়তো তুলি ধরতে শেখায় কিন্তু বিষয়টা তার নিজস্ব জগত। শিল্পী তরুণ ঘোষ ভারতে উচ্চ শিক্ষা নিয়েছেন এবং ফিরে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন। শিল্পী নিজেকে শিল্পের একটি শাখায় সিমাবদ্ধ রাখেন নাই। চলচ্চিত্রে শিল্প নির্দেশনা দিয়েছেন, ফ্যাশন ডিজাইনার ছিলেন, মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রথম পোস্টার ডিজাইনটা তিনিই করেন। ছিলেন মুখোশ ডিজাইনার। মটির ময়না এবং কীর্তনখোলার মত গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রে তিনি শিল্প নির্দেশনা দিয়েছেন। বেহুলা শিরোনামের চিত্রকর্ম তাঁকে বিশেষ সম্মাননা এনে দেয় এশিয়ায় বিয়েনালের আসরে।

সমাজকে ভিন্নভাবে দেখা ও জীবনকে অনুভব করা শিল্পী তরুণ ঘোষ না ফেরার দেশে পাড়ি জমান গত ৮ এপ্রিল ২০২৬। শিল্পের মৃত্যু হয় না, মৃত্যু হয় না শিল্পীর। জীবন দেখার অসংখ্য নির্দেশনা রেখে গেছেন শিল্পী তরুণ ঘোষ। তিনি আমাদের চারপাশে আছেন, ছিলেন, থাকবেন শিল্পের ভাষায় ও কথায় আমাদের মাঝে। তরুণ দাকে ভোলা যাবে না কখনই।
লেখক : চিত্র শিল্পী ও ফিল্মমেকার