গল্প
ছবি: এ আই প্রণীত
খেলতে খেলতে দুপুর গড়িয়ে গেলো।
আজকের দিনটা টুলুর কাছে অদ্ভুত লম্বা মনে হচ্ছিল। রাস্তায় বটগাছের পাশে খেলতে গিয়ে কাঠি দিয়ে মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে একসময় সে নিজেই বলল—
“একলা খেলতে কি আর ভালো লাগে!”
এজন্য অসহ্য লাগছে।
আজ খেলার সাথী কেউই আসেনি।
বুলু, মোহর, জসিম, আরাফাত, আবির—সবাই নাকি ঈদের জামা কিনতে গেছে।
হারুন আর আছিয়া তো গতকালই কিনে ফেলেছে। ওর আব্বার ইজিবাইক নিয়ে ফিরে গেলে আছিয়া কত কী দেখিয়ে গেছে—চুড়ি, ফিতা, ক্লিপ! সবকিছু।
টুলু চুপচাপ শুনেছে। কিছু বলেনি।
আরাফাত বলছিল—
—“লাল্টুদের মামা মালয়েশিয়া থেকে সব পাঠাইছে!
দারুণ জামা রে!”
আব্বাস সঙ্গে সঙ্গে বলল—
—“সত্যি, একদম মন্টুদের টিবির সিনেমার দৃশ্যের মতো!”
সবার চোখে অন্য আলোর ঝিলিক কাড়ে।
কিন্তু কারও কারও চোখের কোণে একটু অন্যরকম কিছু চিকচিক করে —যা সবাই দেখে না।
টুলু জানে, তার ঈদটা কেমন হবে এবার।
একবার ফুটবল কেনার সময় টাকা দিতে পারেনি বলে কত কথা শুনতে হয়েছিল নয়নের কাছে। খেলার মাঠের সেই কষ্টটা এখনও বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে আছে।
তাই সে নিজের মনে হিসাব করে রেখেছে—
“যদি এই পুরোনো জামাটা ধুয়ে পরে নিই…
তাহলেই তো হয়!” আরে যা, ভাবটা এমনই!
রাতে শুয়ে শুয়ে সে বাবার কথা শুনছিল।
বাবা বলছে—
—“রাহেলা, এ মাসের বেতনটা পাইছো?”
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে—
—“কই আর?
মোস্ত সাহেব বলছে ঈদের আগের দিন দিবে…”
বাবা তার ভাঙা পায়ের দিকে তাকিয়ে চুপ করে থাকেন।
টুলু বালিশে মুখ গুঁজে ভাবতে থাকে—
চোখ ভিজে যায়।
পরদিন দুপুরে বটগাছের পাশে বসে ছিল সে।
হঠাৎ দূর থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ—
—“এই টুলু!”
চমকে উঠে তাকায় সে—
—“তরু মামা!” সেই ইউটিউব মামা।
ক্যামেরা, স্ট্যান্ড আর একজন সহকারী নিয়ে এগিয়ে এলেন তরু মামা।
—“কী রে, বইগুলো পড়া হলো?”
—“প্রথম দিনই শেষ, মামা!”
—“সব?”
—“হ্যাঁ, মামা!”
তরু একটু অবাক হয়। এই কাঁদামাখা ছেলেটার ভেতরে অন্যরকম একটা আলো আছে।
সে মোবাইল বের করে পুরোনো ভিডিও দেখায়—
টুলু কাদায় আটকে নাচছে, কাঁদায় আটকে রাবারের ঢিলা প্যান্ট খুলে যাওয়ার উপক্রম!
সবাই হেসে ওঠে হো হো করে।
টুলুও হাসে তা দেখে।
কিন্তু হাসির ভেতরেই কোথাও একটু লজ্জা,
একটু কষ্ট লুকিয়ে থাকে।
এইটুকু মানুষ কান্না ঢাকতে শিখে গেলো?
তরু মামা হঠাৎ জিজ্ঞেস করে—
—“তোর বাবার পায়ের অবস্থা এখন কেমন?”
—“ভালো না, মামা… আগের মতোই।”
তরু কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর বলে—
—“আচ্ছা, যাই রে আজ।”
চলে যায় সে।
টুলু আকাশের দিকে তাকায়।
মেঘগুলো ভেসে যাচ্ছে…
আজকে তরু মামার চলে যাওয়ার পর মেঘলা আকাশে
উড়ে যাওয়া মেঘের মধ্যে একটুকরো আশা শেষ হয়ে যাওয়ার লক্ষণ পেলো টুলু।
একটা দীর্ঘশ্বাস আসতে গিয়ে ও এলো না।
নিজে নিজে রাস্তায় উঠে এসে বলল-
"চল পটলা যাই",
তারপর হনহন করে ওদের বেড়ার দিকে এগিয়ে চললো টুলু।
পেছন থেকে পটলা এতো ডাকলো, "এই টুলু, আয়, আরেকটু খেলি। আয় না।"
অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। দিনের আলো শেষে রাতের হাতছানি সময়ের ব্যাপার। এমন সন্ধ্যা নেমে এসেছে।
সেই সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ হৈচৈ—
—“চাঁদ উঠছে! ঈদের চাঁদ!”
রাস্তা দিয়ে কারা যেন সবাই দৌড়াচ্ছে। একযোগে।
টুলুর কোনো আগ্রহ নেই। যাক না। তাতে তার কি?
ঠিক তখনই বাইরে থেকে ডাক—
—“এই টুলু! কই তুই?” কই রে?
রাস্তা থেকে আবির ও নয়ন চেঁচাচ্ছে।
—“মামা আইছে! তরু মামা!”
টুলু দৌড়ে বেরিয়ে আসে।
দেখে—তরু মামা দাঁড়িয়ে। হাতে কয়েকটা ব্যাগ।
—“এই ফিঙ্গে!” (হেসে) তরু মামা ডাকে এই নামে ওকে।
—“দেখ, চিনতে কষ্ট হলো কিন্তু!”
মায়ের হাতে সেমাই, চিনি আর কাপড় তুলে দিয়ে বলে—
—“এই নেন, আপা।”
তারপর টুলুকে বলে—
—“দেখ তো, জামাটা পছন্দ হয় কি না?”
সে ধীরে মাথা নাড়ে—
—“খুব পছন্দ, মামা…”
—“জুতোটা পর!”
পায়ে দিয়ে দেখে—একদম ঠিক।
তরু হেসে বলে—
—“দারুণ লাগছে তোকে!”
টুলু কিছু বলে না।
শুধু তাকিয়ে থাকে।
হঠাৎ সে এগিয়ে এসে তরু মামাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে—
—“মামা…”
তারপর হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে।
তরু মামা প্রথমে বুঝতেই পারে না কী করবে।
ধীরে ধীরে টুলুর মাথায় হাত রাখে।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নয়ন চুপ করে যায়। যে বেশি খোটা দেয়, তোর প্যান্টের রাবার কিন্তু ঢিলা হচ্ছে রে!
আবিরও আর কিছু বলে না আজ।
বেড়ার ফাঁক দিয়ে টুলুর মা চুপচাপ চোখ মোছে।
সেদিন রাতে নতুন জামা গায়ে দিয়েই ঘুমিয়ে পড়ে টুলু।
মুখে হালকা হাসি জমে থাকে।
কিন্তু ঘুমের ভেতরেও সে যেন কেঁদে ওঠে—
খুব আস্তে, কেউ শুনতে পায় না।
কারণ সে জানে—
একটা ঈদের আনন্দ পেলেও
তার বাবার পা এখনও ভালো হয়নি,
মায়ের চিন্তা এখনও কমেনি।
আর এই ছোট্ট সুখের ভেতরেই
একটা বড় দুঃখ চুপচাপ বেঁচে থাকে।