বজলুর রহমান
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি আজ তার পথচলার ৪৩তম বছরে পদার্পণ করছে। এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই দেশের সর্বস্তরের নাগরিকবৃন্দ, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা আমাদের প্রবাসী গ্রাহকবৃন্দ এবং ব্যাংকের সকল স্তরের দক্ষ ও যোগ্য এক্সিকিউটিভ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের। ৪৩ বছরের এই পথচলা কেবল একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নয়, বরং এটি বাংলাদেশে শরিয়াহভিত্তিক আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সফল রূপায়ণের এক মহাকাব্য।
অর্জনের ৪৩ বছর ও প্রতিকূলতা জয়
১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ অবধি ইসলামী ব্যাংককে পাড়ি দিতে হয়েছে কণ্টকাকীর্ণ পথ। হাজারো ষড়যন্ত্র, অপপ্রচার এবং অসংখ্য প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে এই ব্যাংক আজ যে অবস্থানে দাঁড়িয়েছে, তাকে এক অভাবনীয় সাফল্য বলা চলে। এই সাফল্যের মূল ভিত্তি হলো—সততা, স্বচ্ছতা এবং শরিয়াহর সঠিক পরিপালন। একটি সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামোয় বিকল্প হিসেবে ইসলামী ব্যাংকিংকে জনপ্রিয় করা ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ, যা এই প্রতিষ্ঠান সফলভাবে সম্পন্ন করেছে।
অর্থনীতি ও দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগ থেকে শুরু করে বৃহৎ শিল্পায়ন—সবক্ষেত্রেই রয়েছে এই ব্যাংকের পদচিহ্ন। বিশেষ করে-
দারিদ্র্য বিমোচন: ইসলামী ব্যাংকের দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রম বিশ্বজুড়ে একটি রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃত। বিশেষ করে ব্যাংকের 'পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প' বা আরডিএস (RDS) এর মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ ভূমিহীন ও প্রান্তিক মানুষকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আনা হয়েছে। এটি কেবল ঋণদান কর্মসূচি নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনমান উন্নয়ন প্রক্রিয়া। শরিয়াহসম্মত ক্ষুদ্র বিনিয়োগের মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদের ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সঞ্চয়ী মনোভাব তৈরি করা হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় সদস্যরা তাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে আজ স্বাবলম্বী। প্রান্তিক কৃষকদের কৃষি উপকরণ সরবরাহ থেকে শুরু করে হস্তশিল্প ও ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের প্রসারে ইসলামী ব্যাংক যে ভূমিকা রেখেছে, তা দেশের দারিদ্র্যের হার হ্রাসে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। আজ কয়েক লক্ষ পরিবারের মুখে হাসি ফুটেছে এই ব্যাংকের মানবিক ব্যাংকিং দর্শনের কারণে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি: দেশের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব দূরীকরণে ইসলামী ব্যাংক গত ৪৩ বছরে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। ব্যাংকটি কেবল সরাসরি কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেনি, বরং এর বিনিয়োগের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে লক্ষ লক্ষ পরোক্ষ কর্মসংস্থান। ব্যাংকের শিল্প বিনিয়োগ কর্মসূচি (IIP) এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) বিনিয়োগের ফলে দেশে অসংখ্য কল-কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক শিল্প, আবাসন এবং পরিবহন খাতের বিকাশে ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ কয়েক মিলিয়ন শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেছে। এছাড়াও, স্ব-কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে তরুণ উদ্যোক্তাদের বিশেষ জামানতবিহীন বিনিয়োগ সুবিধা প্রদান করে ব্যাংকটি উদ্যোক্তা সংস্কৃতিকে বেগবান করেছে। শিক্ষিত বেকার যুবকদের কারিগরি প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে তাদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা ইসলামী ব্যাংকের এক নিরন্তর প্রচেষ্টা।
মানবকল্যাণ: ইসলামী ব্যাংকের ব্যাংকিং কার্যক্রমের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে নিঃস্বার্থ মানবকল্যাণ। ব্যাংকের করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি (CSR) বা সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রম কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি আত্মিক অঙ্গীকার। শিক্ষা ক্ষেত্রে মেধা বৃত্তি প্রদান, দুস্থ শিক্ষার্থীদের সহায়তা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাংকটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। স্বাস্থ্য সেবায় ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে পরিচালিত হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো সুলভ মূল্যে আধুনিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মহামারীর সময়ে ত্রাণ বিতরণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে ইসলামী ব্যাংক সবসময় প্রথম সারিতে থাকে। এছাড়াও গৃহহীনদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানির জন্য নলকূপ স্থাপন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মতো টেকসই উন্নয়নমূলক কাজগুলো এই ব্যাংকের মানবিক চেহারার প্রতিফলন। ইসলামী ব্যাংক বিশ্বাস করে, মুনাফা অর্জনই শেষ কথা নয়; বরং মানুষের সেবা ও সামাজিক কল্যাণই প্রকৃত সার্থকতা।
রেমিট্যান্স ও প্রবাসীদের আস্থা
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। আর এই রেমিট্যান্স আহরণে ইসলামী ব্যাংক বছরের পর বছর ধরে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাদের কষ্টার্জিত অর্থ দেশে পাঠানোর জন্য ইসলামী ব্যাংককে বেছে নেন এর বিশ্বস্ততা এবং দ্রুত সেবার কারণে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে এই ব্যাংকের অবদান অনস্বীকার্য।
নেপথ্যের কারিগর: গ্রাহক ও জনবল
এই গৌরবোজ্জ্বল অর্জনের পেছনে রয়েছে দেশের সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন এবং গ্রাহকদের অটুট আস্থা। একইসঙ্গে আমি শ্রদ্ধা জানাই আমাদের প্রবাসী গ্রাহকদের, যারা বিদেশের মাটিতে থেকে দেশের অর্থনীতিতে অমূল্য অবদান রাখছেন।
তবে এই সাফল্যের সবচেয়ে বড় দাবিদার হলেন ব্যাংকের সকল স্তরের এক্সিকিউটিভ কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ। তাদের সততা, ন্যায়পরায়ণতা, নিষ্ঠা এবং দিনরাত নিরলস প্রচেষ্টা ইসলামী ব্যাংককে আজকের এই অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। তাদের পেশাদারিত্ব এবং সেবার মানসিকতাই আমাদের বড় সম্পদ।
আগামীর প্রত্যাশা
গৌরবের ৪৩ বছর পেরিয়ে আমরা যখন সামনের দিকে তাকাই, তখন আমাদের সামনে আরও বড় দায়িত্ব। ইসলামী ব্যাংক কেবল একটি ব্যাংক নয়, এটি কোটি মানুষের আস্থার প্রতীক। "আস্থার অবিচল অঙ্গীকার" নিয়ে এই ব্যাংক ভবিষ্যতেও দেশ ও জাতির কল্যাণে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত গ্রাহকসেবা এবং শরিয়াহর কঠোর নীতি অনুসরণ করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি—দেশ ও মানুষের সেবায় নিবেদিত এক অতন্দ্র প্রহরী।
লেখক: ইসলামী ব্যাংক পিএলসি'র যশোর শাখায় কর্মরত।