Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

মানবতার দস্তরখান: মডেল মসজিদে শত মানুষের ইফতারি

শেখ জালাল শেখ জালাল
প্রকাশ : রবিবার, ১৫ মার্চ,২০২৬, ০৯:০১ পিএম
আপডেট : রবিবার, ১৫ মার্চ,২০২৬, ০৯:৩৮ পিএম
মানবতার দস্তরখান: মডেল মসজিদে শত মানুষের ইফতারি

দস্তরখানায় ইফতার নিয়ে বসে আছেন রোজাদাররা ছবি: ধ্রুব নিউজ

"সারাদিন রোজা রাইখে রিকশা চালাই। ডানে-বামে তাকানোর সময় পাই না। কিন্তু ইফতারির আজান হওয়ার আগেই আমি এই মসজিদে চইলে আসি। এখানে সবার সাথে এক কাতার হয়ে বসলে মনে হয় না আমি একা, মনে হয় আমরা সবাই এক পরিবারের।" এভাবেই নিজের অনুভূতির কথা বলছিলেন রিকশাচালক আবদুল জলিল (আসল নাম নয়)। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে কোথাও দাঁড়িয়ে দুমুঠো মুখে দেবেন, সেই ফুরসতটুকুও হয়তো তার জোটে না। কিন্তু যশোর রেলগেট মডেল মসজিদে ইফতার করা তার কাছে কেবল ক্ষুধা নিবারণ নয়, বরং এক পরম শান্তির বিষয়। তার মতো শত শত শ্রমজীবী মানুষের আস্থার ঠিকানা হয়ে উঠেছে এই মসজিদ।

সূর্য হেলে পড়ার সাথে সাথে যশোরের ব্যস্ততম রেলগেট এলাকা তখন ভিন্ন এক রূপ নেয়। চারিদিকে ক্লান্ত শ্রমজীবী মানুষের ভিড়, রিকশার টুংটাং শব্দ আর ব্যস্ত পথচারীদের ঘরে ফেরার তাড়া। কিন্তু এই ব্যস্ততার মাঝেও এক প্রশান্তির ঠিকানা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যশোর জেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। পবিত্র রমজান মাসে এই মসজিদের তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় প্রতিদিন ফুটে ওঠে এক অনন্য মানবিক দৃশ্য—যেখানে আভিজাত্য আর দারিদ্র্য একাকার হয়ে যায় এক বাটি মুড়ি আর একটি খেজুরের সখ্যে।

যশোর শহরের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত রেলগেট এলাকাটি সবসময়ই জনাকীর্ণ। এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের যাতায়াত। রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর থেকে শুরু করে দূরপাল্লার যাত্রী—সবারই মিলনস্থল এই মোড়। রমজানে কাজের চাপে বা যানজটে পড়ে অনেকেই সময়মতো ঘরে ফিরতে পারেন না। আবার সমাজের এক বিশাল অংশ এমনও আছেন, যাদের ঘরে পর্যাপ্ত ইফতারি আয়োজনের সংগতি নেই। সেই সব নিভৃতচারী ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য এক পরম আশ্রয়ের নাম হয়ে উঠেছে এই মডেল মসজিদ।

মসজিদ কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, প্রতিদিন এখানে গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন মানুষ একত্রে ইফতার করেন। বিকেল চারটা বাজার পর থেকেই মসজিদের ভেতরে শুরু হয় এক মহাযজ্ঞ। স্বেচ্ছাসেবকদের কেউ মুড়ি আর ছোলার মিশ্রণ তৈরিতে ব্যস্ত, কেউ বা ফল কাটছেন। সারিবদ্ধভাবে সাজানো হয় বড় বড় 'খাঞ্চা' বা প্লেট। প্রতিটি প্লেটে থাকে খেজুর, ছোলা, মুড়ি, জিলাপি, বেগুনি এবং টাটকা ফল। কোনো কোনো দিন বিশেষ মেনু হিসেবে থাকে গরম গরম খিচুড়ি বা তেহারি। ইসলামিক ফাউন্ডেশন যশোরের উপপরিচালক বিল্লাল বিন কাশেম বলেন, "আমরা কেবল একটি মসজিদের দায়িত্ব পালন করছি না, বরং একটি মানবিক মিলনমেলা গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। সমাজের বিত্তবান মানুষ এবং বিভিন্ন দাতাদের সহযোগিতায় এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হচ্ছে। অনেকেই তাঁদের প্রয়াত বাবা-মায়ের আত্মার শান্তির জন্য বা ব্যবসার কল্যাণ কামনায় এই আয়োজনে শরিক হন।"

আজানের ১৫-২০ মিনিট আগে থেকেই হলঘর পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। রিকশা চালিয়ে আসা ক্লান্ত আব্দুল জলিলের মতো অনেকেই যখন নিজেদের যানবাহনটি মসজিদের নিচে রেখে তিনতলায় উঠে বসেন, তখন তাদের পাশে হয়তো এসে বসেন কোনো বড় ব্যবসায়ী বা পথচারী। এখানে কেউ ছোট নয়, কেউ বড় নয়—সবার পরিচয় তারা রোজাদার। ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে তৈরি হয় এক পিনপতন নীরবতা। যখন মুয়াজ্জিনের সুমধুর আজান ধ্বনিত হয়, তখন শত শত মানুষ একসাথে রোজা ভাঙেন। এই দৃশ্য যেন মনে করিয়ে দেয় ইসলামের সেই আদি শিক্ষার কথা—"মানুষ মানুষের জন্য"।

এই যে প্রতিদিন শত শত মানুষের মুখে ইফতার তুলে দেওয়া হচ্ছে, এর পেছনে রয়েছে সমাজের একদল সংবেদনশীল মানুষের নিরলস সমর্থন। কেউ বড় অংকের অনুদান দিচ্ছেন, আবার কেউ হয়তো সামর্থ্য অনুযায়ী সামান্য কিছু দিয়েই এই 'মানবতার দস্তরখান' সমৃদ্ধ করছেন। এখানে দান কেবল অর্থের নয়; এখানে দান হচ্ছে সহমর্মিতার। আবদুল জলিল বা দিনমজুর আব্দুল রফিকের তৃপ্ত হাসির পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো এক নাম না জানা দাতার অবদান। এই আয়োজন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলো একত্রিত হলে কত বড় সামাজিক পরিবর্তন আনা সম্ভব। আপনিও আপনার পরিবারের কোনো সদস্যের স্মরণে বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে এই উদ্যোগে শরিক হতে পারেন। আপনার দেওয়া এক বাটি ফল বা এক বেলা ইফতারের খরচ হয়তো কোনো একজন নিরন্ন মানুষের সারাদিনের উপবাসের পর সবচেয়ে বড় উপহার হয়ে উঠতে পারে।

এই বিশাল আয়োজনের নেপথ্য কারিগর একদল নিবেদিতপ্রাণ তরুণ ও স্বেচ্ছাসেবী। তারা কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই প্রতিদিন বিকেলের সময়টুকু ব্যয় করেন মানুষের সেবায়। তাদের এই নিঃস্বার্থ সেবার কারণেই প্রতিদিন এত বড় একটি অনুষ্ঠান সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। যশোর রেলগেট মডেল মসজিদের এই ইফতার আয়োজন এখন একটি মানবিক আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে সমাজে এখনো অনেক মানুষ আছেন যারা নিঃস্বার্থভাবে অন্যের পাশে দাঁড়াতে চান। রমজানের পবিত্র সময়ে এই উদ্যোগ মানুষের হৃদয়ে সহমর্মিতা, ভালোবাসা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলছে।

ইফতার শেষে যখন সবাই তৃপ্তির ঢেকুর তুলে মোনাজাত ধরছেন, তখন এক কোণে চোখ মুছছিলেন দিনমজুর সোলেমান মিয়া। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বলছিলেন, "সকাল থেকে পেটে দানা-পানি পড়ে নাই। পকেটেও টাকা ছিল না যে ভালো কিছু কিনে খাব। কিন্তু এই মসজিদে এসে যখন পেট ভরে ইফতারি করলাম, তখন মনে হইলো আল্লায় আমারে ভোলে নাই। এখানে বড়লোক-গরিব বলে কিছু নেই, সবাই আমরা এক সমান।" সোলেমান মিয়ার এই স্বস্তির বাণীই যেন প্রমাণ করে—যশোরের এই মডেল মসজিদ কেবল ইফতার বিতরণ করছে না, বরং মানুষের মাঝে ভ্রাতৃত্ব আর সাম্যের এক নতুন বীজ বপন করছে। আসুন, এই রমজানে আমরাও সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর এই মহৎ কাজে শরিক হই।

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)